আমারসিলেট সম্পাদকীয় ডেস্ক: সাংবাদিকতা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের মধ্যে আস্থার অন্যতম ভিত্তি। সত্য উদ্ঘাটন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জনস্বার্থ রক্ষাই এই পেশার মূল লক্ষ্য। কিন্তু যখন সাংবাদিকতার পরিচয় সত্যের অনুসন্ধানের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ, প্রভাব বিস্তার কিংবা অপরাধ আড়াল করার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পেশা নয়; প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানুষের বিশ্বাস।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে যে, কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করছেন চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা অবৈধ প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে। এরা প্রকৃত সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং সাংবাদিকতার মর্যাদা ও মানুষের আস্থাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। ফলে তাদের কর্মকাণ্ডের দায় অন্যায়ভাবে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর বর্তায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর অনেকের মধ্যেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়—রাজনৈতিক ভোল বদলের অসাধারণ দক্ষতা। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তারা দ্রুত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান, পরিচয় এবং আনুগত্য পরিবর্তন করে নতুন প্রভাববলয়ে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। আদর্শ, নীতি কিংবা জনকল্যাণ নয়; বরং ক্ষমতার নিকটবর্তী অবস্থানই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পুঁজি। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় তাদের কাছে বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং আত্মরক্ষা ও প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর কৌশল।
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও কোথাও ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষাসনদ, জাল পরিচয়পত্র, নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে একধরনের কৃত্রিম সাংবাদিক পরিচয় তৈরি করা হয়। পরে সেই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপরও অযাচিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। যদিও প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন, তথাপি এ ধরনের প্রবণতা সমাজে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আরও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো—মূলধারার সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠন কিংবা পরিচিত সামাজিক নেতৃত্বের নাম ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা। অনেক সময় কোনো প্রবীণ সাংবাদিক, সংগঠনের নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে একটি ছবি কিংবা সামান্য পরিচয়কে এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন তারাই সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ও প্রচারণা ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম প্রভাববলয় তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রকৃত সাংবাদিক ও পরিচয়ধারী সুবিধাবাদীদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। এতে শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মূলধারার সাংবাদিকতা এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও।
অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের কিছু চক্র সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করে প্রশাসনের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা যোগাযোগের কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। যদি এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা কেবল সাংবাদিকতার অপব্যবহার নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করারও একটি গুরুতর কারণ।
এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে তথাকথিত ‘ছবি-রাজনীতি’। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা সামাজিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন সেই সম্পর্ক থেকেই বিশেষ ক্ষমতা বা প্রভাব অর্জিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো এসব ছবির ভবিষ্যৎ অপব্যবহারের বিষয়টি উপলব্ধিই করেন না। অথচ পরবর্তীতে সেই ছবিই সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো, নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের প্রচারণার অংশ হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল যুগে এই প্রবণতা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেমন মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি অসাধু ব্যক্তিদের হাতেও তুলে দিয়েছে নতুন অস্ত্র। ভুয়া ছবি, কণ্ঠস্বর বা ভিডিও তৈরি করে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা, ভয় দেখানো কিংবা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। ফলে সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাবের অপপ্রয়োগ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার—এই তিনটি প্রবণতা একত্রিত হলে সমাজের জন্য তা আরও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত সাংবাদিকরা। কারণ কয়েকজন সুবিধাবাদী ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় অনেক সময় পুরো সাংবাদিক সমাজকে বহন করতে হয়। মানুষের মনে সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি হয়, অথচ সত্যের পক্ষে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া অসংখ্য সৎ সাংবাদিকের অবদান আড়ালে পড়ে যায়।
এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো—সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করে একধরনের সমান্তরাল প্রভাববলয় গড়ে তোলার চেষ্টা। বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ পাওয়া যায়, কোনো ঘটনার সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সালিশ, মধ্যস্থতা কিংবা কথিত সমঝোতার নামে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে ব্যক্তিগত লাভবান হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন; তবে এমন প্রবণতা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষ টিম বা উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পরিচয়ের ছদ্মাবরণ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ কিংবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব পরিচয়ের অনেকগুলোরই কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। যদি এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু প্রতারণাই নয়, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বেরও অবৈধ অপব্যবহার।
যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্রবিহীন বা প্রশ্নবিদ্ধ নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়ি ব্যবহার, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের যানবাহন প্রশাসনিক ভয় দেখিয়ে ব্যবহার করার অভিযোগও পাওয়া যায়। অনেক গাড়ির মালিক দাবি করেন, আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা বলে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কেবল ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়, বরং আইন ও নাগরিক অধিকারেরও লঙ্ঘন।
ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তারের ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তথ্য বিনিময়ের শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু একই সঙ্গে এটি অপপ্রচার, চরিত্রহনন ও সংঘবদ্ধ সাইবার হয়রানির ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক সৎ সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা সচেতন নাগরিকের অভিযোগ—অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই সংগঠিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা, বিকৃত তথ্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই—সমালোচনার কণ্ঠস্বরকে ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া।
এই বাস্তবতায় মূলধারার অনেক সাংবাদিকও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক সংঘাত, কুৎসা কিংবা ব্যক্তিগত হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন। এই নীরবতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি এমন একটি পরিবেশের প্রতিফলন, যেখানে অসত্যের বিরুদ্ধে কথা বলাও কখনো কখনো ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আরও একটি বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিষ্ঠিত ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও সুবিধাবাদী আচরণের অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘদিনের পেশাগত প্রভাব, সামাজিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার ঢাল হয়ে যায়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সাংবাদিকতা পেশার জন্য ক্ষতিকর। অনুজদের নৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবর্তে যদি কেউ অনৈতিক চর্চাকে নীরবে প্রশ্রয় দেন, তাহলে অসাধু চক্রগুলো আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
এ কথা স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো সাংবাদিক সমাজকে বিচার করা অন্যায়। আজও অসংখ্য পেশাদার সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধা, নানা চাপ এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি সত্ত্বেও সত্য অনুসন্ধান করে চলেছেন। তাই সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে সাংবাদিকতার বিরোধিতা নয়; বরং প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করা।
সময়ের দাবি হলো, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহারে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভুয়া পরিচয়পত্র ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সদস্যপদ ও পরিচয় কিংবা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও আইনের শাসনভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণই একটি সুস্থ সমাজ ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম গঠনের পূর্বশর্ত। প্রকৃত সাংবাদিকতার শক্তি ক্ষমতার অপব্যবহারে নয়—সত্য, ন্যায়, জবাবদিহি এবং জনগণের বিশ্বাসে।
