একাকি জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই কি রিয়াজের শ্বশুরের আত্মহত্যা ?

0
810
একাকি জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই কি রিয়াজের শ্বশুরের আত্মহত্যা ?
রিয়াজের শ্বশুর

নুরুজ্জামান ফারুকী,বিশেষ প্রতিনিধিঃ  একাকি জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই কি রিয়াজের শ্বশুরের আত্মহত্যা ? না কি অন্য কোন কারণে আত্মহত্যা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মাস দুয়েক আগে থেকেই আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চিত্রনায়ক রিয়াজের শ্বশুর আবু মহসিন খান। বাসা থেকে প্রাপ্ত সুইসাইড নোট ও জব্দকৃত অন্যান্য নথিপত্র দেখে এমন ধারণা করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া সংবাদ মাধ্যমকে জানান, “বাসার ভেতর থেকে বেশ কিছু কাগজপত্র ও সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। কার সঙ্গে কী দেনা-পাওনা, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, জরুরি সব ফাইল, সব চাবি গুছিয়ে এক জায়গায় রেখে গেছেন। সব বিষয় নিয়ে তার চিন্তাভাবনার বিষয় নিজে ল্যাপটপে টাইপ করেছেন। কোন চাবি কোন আলমারির সেটাও লিখে রেখেছেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছে, অন্তত দুই মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। পুরো বাসাটি অত্যন্ত গোছানো ছিল। মৃত্যুর পর দরজা খুলতে যাতে কোনো সময় ব্যয় না হয়, এ জন্য দরজার বাইরে একটি চিরকুট সাঁটিয়ে গেছেন। সেখানে লেখা ছিল,“মামা, দরজা খোলা আছে।“

তিনি আরও বলেন, ক্ষোভ, অনুশোচনা, নীতি-আদর্শ ও পরিবার এবং সমাজ নিয়ে মহসিন তার বিশ্বাসের কথাগুলো খোলামেলাভাবেই বলে গেছেন।

গত বুধবার ২ ফেব্রুয়ারি রাতে ফেসবুক লাইভে এসে নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহননের পথ বেছে নেন রিয়াজের শ্বশুর। আত্মহত্যার আগে ব্যক্তিজীবনের নানা হতাশা ও পরিবার, সমাজ নিয়ে তার মনোভাব তুলে ধরার চেষ্টা করেন লাইভে। মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলে সুইসাইড নোটে লিখে যান তিনি।

এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবারে ৩ ফেব্রুয়ারি রিয়াজ বাদী হয়ে অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় এই মামলা করা হয়।

এদিকে নিহত মহসিন খানের আত্মহত্যার ভিডিওটি ছয় ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন বিজ্ঞ হাইকোর্ট।

পুলিশ বলছে, ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাসার ৫০১ নম্বর এপার্টমেন্টে একাই বাস করতেন ব্যবসায়ী মহসিন খান। তার একমাত্র ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় তার মাকে নিয়ে থাকেন। মেয়ে মডেল মুশফিকা তিনা স্বামী চলচ্চিত্র অভিনেতা রিয়াজের সঙ্গে ঢাকাতেই থাকেন।

জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে মহসিন পুরোপুরি একাকি নিজের ওই ফ্ল্যাটে থাকছেন। নিজেই রান্নাবান্না করতেন। কখনও কখনও বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতেন। বাসায় কোনো গৃহকর্মী ছিল না। ছেলে ও স্ত্রীর কাছে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেও ভিসা জটিলতার কারণে ব্যর্থ হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চেয়েও সফল হননি ক্যান্সার আক্রান্ত মহসিন।

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, মেয়ের জামাই রিয়াজের প্রতি তার এক ধরনের ভালোবাসা ছিল, এটা কাগজপত্র দেখে স্পষ্ট। রিয়াজকে বড় ছেলের মতো জানতেন। কিছু দিন আগে করোনা আক্রান্ত রিয়াজকে দেখতে তার বাসায় যেতে চান মহসিন। তবে তার শারীরিক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বাসায় যেতে তাকে বারণ করা হয়। এ নিয়ে মনোকষ্টে ছিলেন মহসিন।

জানা গেছে, মহসিনের নামে দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল। একটি লাইসেন্স ছিল পিস্তলের। আরেকটি শটগানের। লাইসেন্স করা নিজের পিস্তল মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে মহসিনের আত্মহত্যার ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, কোনো ব্যক্তিকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার পর লাইসেন্স যেমন নবায়ন করা হয়, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময়ে লাইসেন্স নেওয়া ব্যক্তির মানসিক ও পারিবারিক বিষয়টিও যাচাই করা দরকার। কারণ, অস্ত্র যখন কেউ গ্রহণ করেন, তখন তার মানসিক অবস্থা ভালো থাকলেও পরবর্তী সময়ে পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারেন। তখন নিজের জীবনকেই তুচ্ছ মনে হয়। এ সময় নিজেই নিজের ওপর অস্ত্র ব্যবহার করে থাকতে পারেন। যেমনটি হয়েছে মহসিনের ক্ষেত্রে। তিনি নিজেই ফেসবুক লাইভে হতাশার কথা বলেছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার পর প্রতি বছর অথবা একবারে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য নবায়ন করা যায়। এ সময় লাইসেন্স নেওয়া ব্যক্তির বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার কোনো নিয়ম বা বিধিবিধান নেই। তবে পুলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি দেখা হয়। পুলিশের কোনো সদস্য মানসিক সমস্যায় থাকলে কিংবা অসুস্থ থাকলে তাকে অস্ত্র থেকে দূরে রাখা হয়। অস্ত্রের ডিউটিও দেওয়া হয় না তাকে।

ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, রিয়াজ বাদী হয়ে অপমৃত্যু মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়েছে, তার শ্বশুর মহসিন নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। হতাশা থেকেই তিনি নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আবু মহসিনের ফেসবুক লাইভের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলার জন্য নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বিটিআরসিসহ সংশ্নিষ্টদের প্রতি এই নির্দেশ দেন। এ ছাড়া কোনো গণমাধ্যমে ওই ভিডিও প্রচারের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। আদেশ বাস্তবায়ন করে আগামী বুধবার জানাতে বলা হয়েছে।