ছাত্ররাজনীতির ময়না তদন্ত:প্রতিক্রিয়াশীলতার ছায়া ছাত্রলীগে,ছাত্রদলে নেতৃত্বের মড়ক

    0
    243

    আমারসিলেট24ডটকম,১৬অক্টোবর,আশরাফুল ইসলাম রাসেল:স্বৈরাচার এরশাদ সরকার আমলে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ধারার সাথে যুক্ত ছিল চুনারুঘাটের ছাত্ররাজনীতির প্রবাহ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে জড়িত হয়েছিল স্বেরাচারবিরোধী সকল ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাসের প্রধান নিয়ামক ছাত্ররাজনীতি তখন নিয়ন্ত্রন করত বাংলাদেশের সার্বিক রাজনীতি, তখন মর্যাদাও ছিল। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চুনারুঘাট উপজেলায ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ(জাসদ), ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র সমিতিসহ কয়েকটি বাম-ডানপন্থী ছাত্র সংগঠনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। ১৯৯১ সনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে উধাও হতে থাকে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। অনেকাংশে, বাম ছাত্র রাজনীতির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘ স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশের তরুনরা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য দলবেধে যোগ দিতে থাকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে। আবার ২০০১ সালে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতার স্রোতে ভেসে যায় ছাত্ররাজনীতির প্রবাহ, যে সংগঠনটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রেখেছিল অগ্রনী ভূমিকা।

    সারাদেশের মত চুনারুঘাটেও ভাটা পড়ে বাম-প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে। আজ দুই যুগ পর চুনারুঘাটের রাজনৈতিক অঙ্গনে দেশের প্রধান দুটি দলের ছাত্র সংগঠন টিকে আছে ক্ষমতার অদল-বদলের ধারাবাহিকতায়। উগ্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির, মধ্যপন্থী সংগঠন ইসলামী ছাত্র সেনা ও কমিটি-সর্বস্ব ইসলামী ছাত্র মজলিসের আওয়াজ শুনা গেলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে এদের কোন ভূমিকা নেই। ইসলামী ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাশকতামূলক কার্যক্রমে হতাশ ও উদ্বিগ্ন ছাত্রললীগ নেতা সায়েম তালুকদার বলেন, মনে হয় জামায়াতের ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির ঢাল হিসাবে ব্যবহৃত ছাত্র শিবির সন্ত্রাস ও নাশকতার রাজনীতির মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিকে কলুষিত করছে।” সায়েম ছাত্রশিবিরের অপরাজননৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

    শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির শ্লোগানকে সামনে রেখে বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পরিবেশে চুনারুঘাটের প্রধান ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর অস্তিত্ব নামে মাত্র বিদ্যমান। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লেজুড়ে ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র লীগ হারিয়ে ফেলেছে এর অতীত ঐতিহ্য ও সুনামের ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বেপরোয়া হয়ে উঠে ছাত্রলীগ এবং এরই সূত্র ধরে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ছাত্র সংগঠন থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নেন এবং নিরুৎসাহিত করতে থাকেন। এছাড়াও, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনিিতর কালোছায়া পড়তে থাকে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে। সারাদেশের মত, চুনারুঘাটের ছাত্রলীগেও দেখা যায় স্থবিরতা। শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির মূলনীতি এখন পোষ্টার ও ব্যানারের ভাষা। সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের চুনারুঘাট উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০০৩ সালে- তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দের অধিকাংশের ছিলনা ছাত্রত্ব , আজ তারা বিবাহিত ও পূত্র-কন্যার পিতা এবং অদ্যাবধি ধরে রেখেছেন কমিটির বিভিন্ন পদ। গত ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ এর কাউন্সিল ও সন্মেলনে সাধারন সম্পাদক পদে প্রতিদ্ধন্দিতা করার জন্য ছাত্রলীগের সর্বশেষ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক ছাত্রলীগের পদ থেকে পদত্যাগ করলেও দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। ফলে, ছাত্রলীগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ন পদ দুইটি এখনও খালি। অনেকে মনে করেন, পদ দুটিকে ধরে রাখার হীন কৌশলে তারা পরবর্তী ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক মনোনীত করে যাননি। অন্যদিকে, উদীয়মান নেতৃবৃন্দ ভূগছেন নেতৃত্বহীনতায় ও হতাশায়। স্বাধীনতার স্বপক্ষের ছাত্রসংগঠন হিসাবে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের আগামী নেতৃত্ব কবে নির্ধারিত হবে তা আজো অজানা নতুন নেতা-কর্মীদের। এ প্রসঙ্গে বর্তমান কমিটির সমাজসেবা সম্পাদক মাহবুবুল আলম মিজান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চুনারুঘাটের ছাত্রলীগ একটি পরিত্যক্ত ছাত্রসংগঠনে পরিনত হয়েছে আর এখন ভূগছে অস্তিত্বের সংকটে। তিনি আরো বলেন, আগামী নেতৃত্ব গঠনে জেলা ও কেন্দ্রিয় কমিটি তৎপর থাকলেও এক অজানা কারনে নির্বাচিত করা হচ্ছেনা পরবর্তী কার্যকরী কমিটি। তবে, মাহবুবুল আলম মিজান এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহনে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সভাপতি ডা. ইশতিয়াক আহমেদ রাজ ও সাধারন সম্পাদক মুকিদুল ইসলাম এর বিশেষ হস্তক্ষেপসহ আওয়ামী লীগের সকল সংগঠনের সহযোগিতা কামনা করছেন। আরেকজন ছাত্রলীগ কর্মী শফিকুর রহমান চঞ্চল আহমেদ এই প্রতিবেদক কে জানান, “বাল্যকাল থেকে দেখা ছাত্রলীগের কমিটির পদ আমাদের ছাত্রত্ব ও নেতৃত্ব প্রদানের বয়স পেরিয়ে গেলেও নেতারা ধরে রেখেছেন।” চঞ্চল আরো বলেন, পদত্যাগ করেও নেতারা পদ ছাড়েন না এবং হেরে গিয়েও ধরে রাখতে চাইছেন পদ। নেতাদের এমন আচরনে মনে হচ্ছে দলীয় পদগুলো লাভজনক একটা কিছু। নেতৃত্ব্রে আকাল ও ছাত্ররাজনীতির চলমান বন্ধ্যাত্ব সম্পর্কে চুনারুঘাট সরকারী কলেজ ছাত্রলীগ কর্মী সায়েম তালুকদার বলেন,“ ছাত্রলীগের আদর্শ আমাকে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে, কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতি আজ সভ্যতার অতলে হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। আমরা আশা করছি ছাত্ররাজনীতির প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে কলেজসহ প্রতিটি ইউনিট গঠন শীঘ্রই সম্পন্ন হবে।” চুনারুঘাট সরকারী কলেজ ছাত্রলীগের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সায়েম তালুকদার বলেন, বর্তমান নেতৃত্ব জোরালোভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন ছাত্রলীগকে শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির মূল ধারায় পরিচালিত করতে এবং এদেশের সার্বিক রাজনীতির প্রভাবে মাঝে মাঝে কিছুটা অসঙ্গতি ছাড়া ছাত্রলীগের রাজনীতিক কার্যক্রমে আমরা সন্তুষ্ট।

    ছাত্রদল

    অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চুনারুঘাট উপজেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো বেশী হতাশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন উদীয়মান ছাত্রদল নেতা শাহীনুজ্জামান শাহিন বলেন, বিরোধীদলীয় রাজনীতি সক্রিয় রাখতে হলে অতি শীঘ্রই নিবেদিতপ্রান কর্মীদের সমন্বয়ে পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠন করা জরুরী বলে মনে করছি। তিনি আরো বলেন, সরকারী দলের নির্যাতনে অস্থির ও মামলায় জর্জরিত নেতৃবৃন্দের অনেক স্থানীয় নেতা জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা থাকলেও দলীয় প্রধানদের উদাসীনতায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এ প্রসঙ্গে ছাত্রনেতা সোহেল মজুমদার বলেন, বিগত এক বছরেরও বেশী সময় ধরে চলা তিন মাস মেয়াদের আহবায়ক কমিটি এখনও নেতৃত্ব দেয়ার চেষ্টা করছেন, যদিও দিনেদিনে বয়স হারাচ্ছেন অন্যান্য নেতা-কর্মীরা। আরেকজন কমিটি গঠন ও কার্যক্রমে হতাশ আরেক ছাত্রদল নেতা পংকজ দাশ বলেন, আমরা অতিসত্বর একটি শিক্ষিত ও নেতৃত্বের গুনাবলী সম্পন্ন কর্মীদের নিয়ে একটি কার্যকরী কমিটি চাই। আরেক ছাত্রদল নেতা মিজান এই প্রতিবেদককে বলেন, “আহবায়ক কমিটির তিনজন চাকুরী করছেন প্রায় এক বৎসর ধরে তবুও ধরে রেখেছেন ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পদ যা দলীয় গঠনতন্ত্র পরিপন্থী। এত অগোছালো থাকা সত্বেও আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে আছি।” তবে, ছাত্রনেতা মিজানও অতি শীঘ্র নতুন পূর্নাঙ্গ কমিটি আশা করেন এবং ত্যাগী নেতা-কর্মীদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা জরুরী।

    চুনারুঘাট উপজেলায় অন্যান্য ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে জাতীয় ছাত্রসমাজ, ইসলামী ছাত্রসেনা, ইসলামী ইসলামী ছাত্রশিবিরের কোন গণমূখী কার্যক্রম চোখে পড়ছেনা। এছাড়াও বাম ছাত্র সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী এখন নির্লিপ্ত ও নিস্ক্রিয়, ফলে হারিয়ে গেছে বামপন্থী রাজনীতির প্রগতিশীল ধারা। বাম রাজনীতির এই অস্তিত্বহীনতা প্রসঙ্গে সাবেক ছাত্রনেতা সৈয়দ আবু নাসের মো সায়েম বলেন, একসময় ছাত্ররাজনীতির কান্ডারী বাম ছাত্র সংগঠনগুলো ক্ষমতার জালে আটকা পড়েছে এই বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও নেই বলেই মনে হচ্ছে। আক্ষেপ করে ইউনিভার্সিটি ষ্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েসন অব চুনারুঘাট(উসাক) এর সভাপতি আব্দুল মমিন সাদ্দাম বলেন, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ছাত্ররাজনীতির চরিত্র আজ অপহৃত। শিক্ষাকে জনগনের মৌলিক অধিকারে পরিণত করার শিক্ষা আন্দোলনে এখন আর ছাত্রদের কোন ভূমিকা নাই। চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, দখল-পাল্টাদখল, হত্যা-খুন-সন্ত্রাস দিয়ে লেজুড়বৃত্তি টিকিয়ে রাখা এখন ছাত্র রাজনীতির ধমেৃ পরিণত হযেছে। ছাত্ররাজনীতির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সকল প্রগতিশীল সচেতন মানুষের দায়িত্ব বলে মনে করি।