জামায়াত-শিবির ও বিএনপি হরতালের নৃশংসতার সাক্ষ্য বহন করছে শিক্ষার্থী অন্তুর চোখ

    0
    420

    ॥  আব্দুর রহমান রুবেল, চট্টগ্রাম  ॥  Onto

    স্কুলছাত্রী অন্তু বড়ুয়ার চিরচেনা সকাল চিরদিনের জন্য বদলে গেল আজ থেকে। নিষ্পাপ ও নিরপরাধ এ ছাত্রীর এক চোখ আজ হরতালের নৃশংতায় আক্রান্ত। হরতাল সমর্থকদের নিক্ষেপ করা ককটেল বিষ্ফোরণে ডান চোখে আঘাত পেয়েছে এ ছাত্রী। কোচিং সেন্টারের বদলে তার ঠিকানা এখন হাসপাতালের বিছানা। অসহ্য যন্ত্রণায় সেখানে কাতরাচ্ছেন এ ছাত্রী। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।

    নগরীর অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান শাখার এ ছাত্রীর চোখে এখন আর স্বপ্ন নেই। সেখানে ভর করেছে শুধুই দুঃস্বপ্ন। টানা ৩৬ ঘণ্টা হরতালের সমর্থনে নগরীর মোমিন রোডের হেমসেন লেইনের মুখে বৃহস্পতিবার সকাল আটটার দিকে পিকেটাররা পর পর দু’টি ককটেল নিক্ষেপ করে।

    এ সময় ওই রোড দিয়ে মা শিউলি বড়ুয়াকে নিয়ে নগরীর চেরাগী পাহাড় এলাকায় অবস্থিত একটি কোচিং সেন্টারে ক্লাস করার জন্য যাচ্ছিল সে। শিবিরের নিক্ষেপ করা একটি ককটেল বিষ্ফোরণে ডান চোখে আঘাত পায় অন্তু বড়ুয়া। স্থানীয় লোকদের সহায়তায় দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

    বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে শিউলি বড়ুয়া জানান, দু’টি ককটেলের একটি বিষ্ফোরণ হয় তাদের পেছনেই। আতঙ্কে দৌড় দিতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যায় অন্তু বড়ুয়া। তার উপর পড়ে যান তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিউলি বড়ুয়া বলেন,‘মেয়েকে নিয়ে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ককটেল বিষ্ফোরণের পর দেখি মেয়ে ডান চোখে হাত চেপে মা মা বলে কান্না করছে। দেখি সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। আমার মেয়ের তো কোন দোষ নেই। তাহলে তার ওপর এ হামলা কেন?’ আতঙ্কিত শিউলি বড়ুয়া বলেন, ‘‘আর কোনো মা’কে যেন এ ধরণের কষ্ট সইতে না হয়।’’

    এদিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর পরই অন্তু বড়ুয়ার ডান চোখে অপারেশন করা হয়েছে। চোখের ভেতর ও বাইরে থাকা স্প্লিন্টার অপসারণ করা হয়। ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসক সুব্রত বলেন, ‘অন্তুর ডান চোখের কর্ণিয়ায় ও চোখের বাইরে আঘাত লেগেছে। তবে এখন আশঙ্কামুক্ত। আশা করি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে সে।’

    ডাক্তারদের সেবায় কিছুদিনের মধ্যে হয়ত সেরে উঠবে অন্তু। এক সকালে উচ্ছ্বল মনে ঘর থেকে বের হলেও আগামীর সকালগুলো হবে আতঙ্ক আর ভয়ের! ডাক্তারও আশঙ্কা প্রকাশ করলেন এ বিষয়ে। উদ্বেগ কণ্ঠে ডা. সুব্রত দাশ বলেন, ‘মেয়েটি অসম্ভব ভয় পেয়েছে। মানসিকভাবে সে খুবই বিপর্যস্ত।’

    শিউলি বড়ুয়া রাউজান পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন। অন্তু বড়ুয়ার পিতা অঞ্জন বড়ুয়া জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। তার দু’মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ছাত্রী। তাদের গ্রামের বাড়ি রাউজানের পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের বৈদ্য পাড়ায়। নগরীতে তারা আসকারদিঘী পাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।

    এদিকে অন্তুর মত গত কয়দিন আগে জামায়াত-শিবিরের বর্বরতায় মারাত্মক আহত হয়ে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোয় শঙ্কায় পড়েছেন মেডিকেলের ছাত্র সুজন দেব নাথ। অন্তু বড়ুয়া স্বপ্ন দেখত, আর সুজন দেব নাথ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। কিন্তু তিনিও আজ বিপর্যস্ত। তারও ডান চোখ জামায়াত-শিবিরের বর্বরতা ‍সাক্ষ্য বহন করছে।

    আর জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের ধরিয়ে দেওয়া আগুনে ঝলসে যাওয়া টমটম চালক এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

    গত ১২ মার্চ রাত ৮টার দিকে নগরীর প্রেসক্লাব ও চেরাগী মোড় এলাকায় পরপর কয়েকটি ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটায় শিবির। চেরাগী পাহাড় মোড় এলাকায় ককটেল বিষ্ফোরণে আহত হয় সুজন দেব নাথ, রনি বিশ্বাস ও জয় সরকার নামের তিন বন্ধু।

    ককটেল বিষ্ফোরণে আহত অপর দু’বন্ধুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবনের জন্য লড়ছেন সুজন দেবনাথ।