জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণে পাল্টে গেল বাংলাদেশের রাজনীতি

0
134

আমার সিলেট ডেস্ক রিপোর্ট: কতটা সম্মান জানাতে এমন অভিব্যক্তি! বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের পর পাল্টে গেল বাংলাদেশের রাজনীতি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্তে বৈঠক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতেই সুবিধাজনক অবস্থায় চলে এসেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা সরকারের ওপর ভারতের অগাধ আস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্বই জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতাদের সামনে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এই স্বর্ণযুগে জি-২০ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করায় পুরো বিশ্বের কাছে একটিই বার্তা পৌঁছে গেছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আওয়ামী লীগ সরকারের বিকল্প নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলাতেও ভারতের উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জো-বাইডেন ছাড়াও সৌদি আরবের যুবরাজ, আর্জেটিনা, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠক করেছেন শেখ হাসিনা। সবকটি বৈঠকেই বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্ব পেয়েছে।

শেখ হাসিনার এবারের দিল্লি সফর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জি-২০ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সামনে নিজেদের অবস্থান ভালভাবেই তুলে ধরতে পেরেছে বাংলাদেশ। শনিবার দিল্লি পৌঁছেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে বৈঠক ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পরদিন সম্মেলনে ‘গ্লোবাল সাউথের একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠ’ হিসেবে বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরেছে। বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে বিশ্বের সংহতি শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সাইডলাইনে দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গেও কথা হয়েছে তার।

‘গ্লোবাল সাউথের বলিষ্ঠ কণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। বিভিন্ন বৈশ্বিক জটিলতার কারণে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে ভঙুর দেশগুলো। এ সমস্যা সমাধানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর প্রতি শেখ হাসিনা এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়ন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং নারীর সমান অধিকার প্রদানের আহ্বান জানান।

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার একটি অন্যতম দিক হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের নেতারা যখন মিলিত হন, তখন মূল সম্মেলনের বাইরেও একে অন্যের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অনেক আলোচনার সুযোগ পান। অংশ নেন মধ্যাহ্ন বা নৈশভোজেও। একইভাবে জি-২০ মূল সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পর্ককে ঝালিয়ে নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজের ফোনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সেলফি তুলেছেন। বাইডেনের সেলফিতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছেন; যা উষ্ণ সম্পর্কের বহির্প্রকাশ। কূটনীতিতে করমর্দনকে উষ্ণ বা শীতল সম্পর্কের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে দেখা হয়। আলতো বা উষ্ণ করমর্দন দিয়েও একজন নেতা আরেকজনের প্রতি তার মনোভাব প্রকাশ করতে পারেন।

একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও জো বাইডেন আলোচনার সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণভাবে দুই নেতা যখন কথা বলেন, তখন তৃতীয় নেতার উপস্থিত থাকলে ধরে নেওয়া হয় প্রথম দুই নেতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তিনি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা ও জো বাইডেন আলোচনার পেছনে অনুঘটক হিসেবে ভারতের হাত থাকতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মেদ বিন সালমানের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। এবারের জি-২০ সম্মেলনের সাইডলাইনে দুই নেতা একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। রবিবার সকালে দুই নেতার বৈঠকে সৌদি যুবরাজ বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। ওই দেশে কর্মরত ২৮ লাখ বাংলাদেশীর অবদানের কথা জানিয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবে বিভিন্ন সংস্কার কর্মকান্ডের জন্য যুবরাজকে অভিনন্দন জানান। তিনি যুবরাজকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি সেটি গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশে আসার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ জানান, আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সমর্থন জানানোর কারণে তার দেশের লোকের মন জয় করেছে বাংলাদেশীরা। এ সময় বাংলাদেশে দূতাবাস খোলার জন্য আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, খেলাধুলা, বাণিজ্য ও কৃষিসহ অন্যান্য বিষয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পাবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে শেখ হাসিনার। এর ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট শেখ মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করার নিশ্চয়তা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রশংসা করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট।

বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। ওই দেশের প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়ুলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে শেখ হাসিনা। দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি, ব্যবসা ও বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছেন উভয় নেতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, ‘নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর জি-২০ সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশ নেওয়া, মোদি, বাইডেনসহ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং সদ্য সমাপ্ত রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর ও ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশে আসার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন ইস্যুতে বৈশ্বিক যে কোনো চাপ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকটিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, সেটি এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে যেহেতু নির্বাচন সামনে, সেহেতু ধরে নেওয়া যায় সেখানে নির্বাচন প্রসঙ্গটিও আলোচনায় উঠে আসতে পারে। ফলে নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার এই ভারত সফর বর্তমান সরকার তথা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সর্বোপরি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে এই সফরের গুরুত্ব হচ্ছে, নির্বাচন ইস্যুতে ভারতের সমর্থন ধরে রাখা।

তবে বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের বিষয়ে বলেন, তাদের এই বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলবে না। কোনো সুযোগও নেই। কারণ, এ দেশের জনগণ তাদের গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার ফিরে পেতে এরই মধ্যে রাজপথে নেমে গেছে। গণতন্ত্রকামী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও এবার বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বিশ্ব এবং এ দেশের জনগণের বিপক্ষে ভারত তার অবস্থান নেবে না। সুত্র দৈনিক জনকণ্ঠ