তাঁতে কাপড় বুনে পড়ার খরছ চালিয়েছে আদিবাসী রোশনী

    0
    226

    আমারসিলেট24ডটকম,২১মে,শাব্বির এলাহী তাঁতে কাপড় বুনে লেখাপড়ার খরছ চালিয়েছে আদিবাসী মেয়ে রোশনী বেগম। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুর গ্রামের মণিপুরী মুসলীম সম্প্রদায়ভুক্ত দিনমজুর জয়নুল উদ্দিন ও সেহেরুন বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে ২য় রোশনী এ বছর এস,এস,সি পরীক্ষায় দয়াময় সিংহ উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে। তার বড় ভাই মঈন উদ্দিনও একই বছর একই বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এক পরিবারের দুই সন্তান একসাথে ভালো ফলাফল করায় নিজ বিদ্যালয় এবং এলাকায় আনন্দের ঢল নামলেও রোশনীদের পরিবারে ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা অর্জনে কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে আশংকার বাতাস বইছে। ধলাই নদীর তীরে একটুকরো ভিটে আর ঘাম ঝরিয়ে পরিশ্রম করার শক্তি ছাড়া যাদের আর কিছুই নেই,তারা আর কষ্ট করে সন্তানদের লখাপড়া চালিয়ে যেতে চাচ্ছে না। রোশনীর বাবা জয়নুল চান মেয়েকে কোন ভাল ঘরে পাত্রস্থ করতে আর ছেলেকে মহাজনের দোকানে ঢুকিয়ে দিতে।

    অথচ রোশনী মঈনরা আশায় বুক বেঁধে কতো কষ্ট করে প্রতিদিন ৯/১০ঘন্টা করে লেখাপড়া করে এ ফলাফল অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবায় ব্রতী হতে চায় রোশনী আর মঈন হতে চায় প্রকৌশলী। সারা গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও নিজেদের বাড়ী অর্থ্যাৎ খড়ের ছাউনি ঘরে বিদ্যুৎ নেই,তাই রাতে কেরোসিনের কুপির টিমটিমে আলোয় অথবা আশেপাশের বাড়ীর বিদ্যুতের আলোয় লেখাপড়া করেছে তারা জীবনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে। আজ শুধু চরম দারিদ্র্যের কঠোর কশাঘাতে ভেঙে যাচ্ছে ভাই বোনের স্বপ্ন। জয়নুল উদ্দিনের কথা,একসাথে দুইজনের লেখাপড়াসহ সংসারের ভরণপোষন চালাতে হিমশিম খাচ্ছি আর পারছি না।

    কিন্তু মা চান সন্তানেরা লেখাপড়া করুক,মানুষ হয়ে মানুষের সেবা করুক। এস,এস,সি পরীক্ষার আগে প্রাইভেট পড়তে না পারলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষক রঞ্জিত সিংহ তাদেরকে বিনাবেতনে প্রাইভেট পড়িয়েছেন ও স্কুলে ফ্রি কোচিং করেছে বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক প্রভাত কুমার সিংহ। দুবেলা খেয়ে না খেয়ে নিয়ম করে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতো রোশনী ও মঈন। লেখাপড়ার ফাকে রোশনী তাঁতে কাপড় বুনত ও মঈন বাবার সাথে মানুষের ক্ষেতে কাজ করতে যেতো। ঘরের ছাগল বিক্রি করে ও কাপড় বুনার মজুরী মিলিয়ে ফরম ফিল-আপের টাকা যোগাড় করেছিলো তারা। হতদরিদ্র সংখ্যালঘু পরিবারের মেধাবী সন্তান রোশনী ও মঈন প্রতিমুহুর্তে দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকলেও মা বাবার প্রেরণায় এতোদুর লেখাপড়া চালাতে পিছপা হয়নি।

    কিন্তু অভাগা বাবা মায়ের সাধ আছে,সাধ্য নেই অবস্থায় কতোদুরই যেতে পারবে তারা। রোশনীর মেধার আলোয় আলোকিত হবে হয়তো অল্পশিক্ষিত কোন বরের রান্নাঘর।মঈন কোন মুদি দোকানে দিনভর কাজ করে শেষরাতে মহাজনকে বেচাকেনার হিসাব দিতেই ব্যস্ত থাকবে।ভূলে যাবে চিকিৎসক-প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন। নুন আনতে পান্তা ফুরায় সংসারের ভাত-কাপড়ের চাহিদা মিটাতে হিমশিম অবস্থা যাদের,কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের পড়ানো তাদের জন্য খড়ের ঘরে ছেড়া কাঁথায় আকাশছোঁয়া স্বপ্ন বৈকি।কিন্তু অপ্রতিরোধ্য দারিদ্র্যের সুকঠিন বাধা ডিঙিয়ে এতটুকো পথ যারা পাড়ি দিতে পেরেছে,শাণিত মেধার মঙ্গল আলোয় স্বপ্ন পূরণের দৃঢ় প্রত্যয়ে তারা এগিয়ে যাবেই।