তালেবান হামলায় অন্তত ১৩২ জন শিশুসহ নিহত ১৪৬

    0
    386

    আমারসিলেট24ডটকম,১৭ডিসেম্বরঃ পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরে সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান হামলায় অন্তত ১৩২ জন শিশুসহ ১৪৬ জন নিহত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ১৩২ শিশু-কিশোর, ১জন সেনা ও ১জন শিক্ষক রয়েছেন। নিহত ছাত্রছাত্রীদের বয়স ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। এর আগে বার বার পাকিস্তানে স্কুল ও মসজিদগুলোতে হামলা চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাতে দেখা গেছে।
    প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম ডন অনলাইনের খবরে বলা হয়, হামলায় নিহত ১৪১ জনের মধ্যে ১৩২ জনই শিশু। এছাড়া শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। তবে বিরোধী দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা শিরিন মারাজি জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১৪৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ১১৩ জন। নিহতদের মধ্যে ১৪০ জনই শিশু বলে উল্লেখ করেন তিনি।
    এদিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করেছে, হামলায় অংশ নেয়া ৬ সন্ত্রাসীর সবাই মারা গেছে। তবে কোনো কোনো খবরে বলা হয়েছে, হামলায় অংশ নিয়েছে ৮/১০ জন সন্ত্রাসী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বন্দুকধারী ওই জঙ্গিরা সেনাবাহিনীর পোশাক পরে ‘আর্মি পাবলিক স্কুলে’ ঢুকে পড়ে এবং এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। হামলায় আহত হয়েছে অন্তত ১১৪ জন। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর’র মুখপাত্র আসিম বাজওয়া নিশ্চিত করেছেন, এ পর্যন্ত ৬জন জঙ্গি মারা গেছে। হামলার পর স্কুলের চারপাশ বন্ধ করে দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী টানা ৯ ঘণ্টা অভিযান চালায়। অভিযানের সময় সেখানে বেশ কয়েকটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিক নির্দেশনা দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পেশোয়ারে গেছেন। তালেবানের সাথে সবরকমের সমঝোতা সংলাপও স্থগিত করে নওয়াজ আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় পেশোয়ারেই সকল দলের বৈঠকেরও (এপিসি) ডাক দিয়েছেন।
    নওয়াজ শরীফ সাংবাদিকদেরকে বলেছেন, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযান চালানোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ হামলা হয়ে থাকতে পারে। তবে দেশে যে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই চলছে পাকিস্তান পুরোপুরি সন্ত্রাসমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে বলে জানান তিনি। স্কুলে সন্ত্রাসী হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সরকার।
    প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাদের সমাগম লক্ষ্য করে হামলে পড়ে বর্বর হামলাকারীরা। এ হামলার দায় স্বীকার করে তালেবানের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা (সেনাবাহিনী) যেভাবে আমাদের সন্তান-পরিবারের ওপর হামলা চালিয়েছে, আমরাও তাদের সন্তান-পরিবারের ওপর হামলা চালিয়েছি। এখন প্রিয়জন বিয়োগের ব্যথা তারাও বুঝুক। হত্যাযজ্ঞ নিশ্চিত হওয়ার আগে ঘটনাস্থল থেকে বোমা ও গুলির শব্দ শোনা যায়।
    এনডিটিভি জানায়, জঙ্গিরা সেনাবাহিনীর পোশাক পরে স্কুলের ভেতর প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকেই তারা নির্বিচারে গুলি করতে শুরু করে। সাম্প্রতিককালে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযানে শত শত তালেবান নিহত হয়। জার্ব-ই-আজ নামের ওই অভিযানে কমপক্ষে ১ হাজার ৬০০ তালেবান নিহত হয়। সংবাদ মাধ্যমগুলো জানায়, অভিযানে একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েই এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালালো তালেবান।
    যদিও হামলার পাল্টা জবাবে সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ পেশোয়ারে পৌঁছে জানিয়েছেন, পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে। তার এ ঘোষণার পরপরই খাইবার পাখতুনখওয়া প্রদেশে জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ১০টি বিমান হামলা চালানোর খবর পাওয়া যায়। তালেবানি হত্যাযজ্ঞে বিধ্বস্ত পাকিস্তানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার।
    হামলার প্রেক্ষিতে পেশোয়ারে ডাকা ১৮ ডিসেম্বরের বিক্ষোভ সমাবেশ স্থগিত করেছেন বিরোধী দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা ইমরান খান। একইসঙ্গে এ পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন পিটিআই’র সাবেক সিনিয়র নেতা শাহ মাহমুদ কোরেশী। হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে হতাহতদের পরিবার-পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনসহ বিশ্ব নেতারা। হামলার ঘটনায় নিজের হৃদয় ভেঙে যাওয়ার কথা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন নোবেলজয়ী কিশোরী মালালা ইউসুফজাই।
    ঘটনার নিন্দা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি ও প্রধান নির্বাহী আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা। তেহরিকে ইনসাফ দলের নেতা ইমরান খান আগামী ১৮ ডিসেম্বরের দেশব্যাপী ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। এছাড়া, পাকিস্তানের কয়েকজন প্রখ্যাত শিল্পী তাদের আজকের নির্ধারিত গানের অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন। রাজধানী ইসলামাবাদ ও করাচির সিনেমা হলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে খায়বার অঞ্চলে জরুরিভিত্তিতে সেনা ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে, এক বিবৃতিতে টিটিপি আজকের হামলার দায় স্বীকার করেছে। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযানের জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তালেবান জঙ্গি এ সংগঠন।