নবীগঞ্জে হত্যাকান্ডের জেরে দফা দফায় সংঘর্ষে পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত অর্ধ শতাধিক:আটক-১৪

0
185
নবীগঞ্জে হত্যাকান্ডের জেরে দফা দফায় সংঘর্ষে পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত অর্ধ শতাধিক:আটক-১৪

নূরুজ্জামান ফারুকী,নবীগঞ্জ: হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ শহরে তিন গ্রুপের ঘন্টাব্যাপী ভয়াবহ সংঘর্ষে শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এতে পুলিশ ও সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের শতাধিক লোকজন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে।
এঘটনায় উভয় পক্ষের ১৪ জনকে পুলিশ আটক করেছে। বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত নবীগঞ্জ শহরের নতুন বাজার এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটন ঘটে। সংঘর্ষকালে কুর্শি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ খালেদুর রহমান খালেদের মালিকানাধীন অত্যাধুনিক মার্কেট ‘রাজা কমপ্লেক্স’ এবং পৌর কাউন্সিলর ফয়জুর রহমান নানু মিয়ার দোকানসহ বেশ কয়েকটি দোকান ভাংচুর করা হয়।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
রাজা কমপ্লেক্স এর সত্বাধিকারী কুর্শি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ খালেদুর রহমান খালেদ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বন্ধুদের ছুরিকাঘাতে নিহত সৈয়দ রাইসুল হক তাহসিনকে প্রথমে রাজা কমপ্লেক্সে মারধর করা হয়।
উক্ত ঘটনার সাথে কারা জড়িত ছিল তা চিহ্নিত করার জন্য মার্কেটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নেয়ার জন্য পুলিশ কর্মকর্তা মার্কেটে আসেন। এ সময় তিনি আজিজ হাবিব উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি মিটিংয়ে ছিলেন।
পরে তিনি মার্কেটে আসেন। এক পর্যায়ে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাসহ নিহত সৈয়দ রাইসুল হক তাহসিন এর জানা নামাজে চলে যান। জানাযা নামাজ শুরুর মুহুর্তে তিনি ফোনে খবর পান আনমনু গ্রামের লোকজন তার মালিকানাধিন রাজা কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে। তারা মার্কেটের সিসি ক্যামেরার ডিভাইসটি নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। বিষয়টি তিনি তাৎক্ষনিক জানাযা নামাজে উপস্থিত মুসল্লিদের অবহিত করেন। সৈয়দ খালেদের ধারণা মার্কেটে যারা হামলা চালিয়েছে তারাই সৈয়দ রাইসুল হক তাহসিন এর উপর হামলা করেছিল তারাই হত্যাকান্ডে জড়িত। এ কারণে পুলিশকে সিসি ক্যামেরা দেখানোর কারণে সৈয়দ খালেদের উপর বিক্ষুব্ধ হয়ে এবং সিসি ক্যামেরার ডিভাইসটি নিয়ে যেতেই মার্কেটে হামলা চালিয়েছে। এ সময় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিহত করে।
অপর দিকে পৌর কাউন্সিলর আনমনু গ্রামের ফয়জুর রহমান নানু’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রাস্তার পাশে ফুটপাতে লোকজন দোকানধারী করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ জন্য সৈয়দ খালেদ তার মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে বলে বার বার অভিযোগ করেন। তাদের উচ্ছেদের দাবী জানান। অথচ তার মার্কেটের দোকানীদের ব্যবসার সাথে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কোন মিল নেই। অনেক দোকান তোলাও হয়েছে। ফুটপাতের দোকানীরা ফলমুল সব্জী ব্যবসা করে। সর্বশেষ গতকাল সৈয়দ খালেদ ওই সব দোকান থেকে আমি চাঁদাবাজি করি বলে বিভিন্ন ধরনের কথা বলাবলি করেন। আমি এ বিষয়টি জানতে পেরে জিজ্ঞেস করার জন্য রাজা কমপ্লেক্সে যাই। সেখানে গিয়ে অনেক লোকজন পাই। তাদের জানতে চাইলে তারা চেয়ারম্যান মার্কেটে নেই বলে জানায়। এ সময় আমি তাদেরকে বলি আমাকে নিয়ে চেয়ারম্যান যে সব কথা বলেছেন তা তাঁর নিকট আশা করিনি। এ সময় তাদের মধ্য থেকে একজন আমাদের সম্প্রদায় তুলে আমাকে গালি দেয়। তারা আমার উপর হামলা চালায় ও মোটর সাইকেলটিও ভাংচুর করে।
এ ঘটনাগুলোর খবর পেয়ে কুর্শি ইউনিয়নের এনাতাবাদ গ্রামের লোকজন ও আনমনু গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করে। নবীগঞ্জ শহর পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।এক পক্ষ অবস্থান নেয় রাজা কমপ্লেক্সে এলাকায়। অপর পক্ষ আনমনু এলাকায়। সংঘর্ষের ভয়বহতায় আনমনু ও এনাতাবাদের পক্ষ নেয় কয়েকটি এলাকা। দফায় দফায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। ভাংচুর করা হয় রাজা কমপ্লেক্সসহ ২০টি দোকানপাঠ। অগ্নি সংযোগ করা হয় একটি মোটরসাইকেলে। শহর পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল-রাবার বুলেট নিক্ষেপের পরও পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। টানা ৩ ঘন্টা চলে সংঘর্ষ।
এসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম দাশ, সার্কেল এএসপি আবুল খায়ের, সহকারী কমিশনার ভূমি সাহিন দেলোয়ার, ওসি মাসুক আলী, নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি ইউপি চেয়াম্যান এমদাদুর রহমান মুকুল, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মুজিবুর রহমান সেফু, জেলা পরিষদের সদস্য শেখ সফিকুজ্জামান শিপন, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ মিলু, ইউপি চেয়ারম্যান নির্মেলেন্দু দাশ রানা, নোমান আহমদ, সাবেক জেলা পরিষদের সদস্য আঃ মালিক, সাবেক প্যানেল মেয়র এটিএম সালামসহ সাংবাদিক জনপ্রতিনধি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আপ্রাণ চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হন।
সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক লোকজন আহত হয়। আহতদের নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
সংঘর্ষের ঘটনার সাথে জড়িত ১৪জনকে পুলিশ আটক করেছে। আটককৃতরা হচ্ছে- আনমনু গ্রামের তৌহিদ মিয়া (৩৫), অন্তর মিয়া (২৬), এনাতাবাদ গ্রামের মোঃ নাছির মিয়া (২৫), আবু জাহেদ (৩৫), ফজল মিয়া (৩৮), ছনু মিয়া (৩৫), জুবেদ মিয়া (২৫), বিলাল মিয়া (২০), রাজু মিয়া (২৫), আলী মোঃ দিলদার (২৬), খালেদ মিয়া (২৫), ছোলাইমান মিয়া (৩৫), মঈন উদ্দিন (২০) ও মমিন উদ্দিন (২০) ।
এ প্রসঙ্গে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুক আলী বলেন, আতিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে ৪৫ রাউন্ড টিয়ারশেল ও ১৫ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়।
এঘটনায় ওসি তদন্ত গোলাম মুর্শিদ, এসআই পরিমলসহ ৭জন আহত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে।