নোটিশ পাওয়ার ৭ কর্মদিবসের মধ্যেই শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম শ্রেণিকক্ষে!

0
235

কাওছার ইকবাল, শ্রীমঙ্গল,মৌলভীবজার থেকে: অবশেষে নোটিশ পাওয়ার ৭ কর্ম দিবসের মধ্যেই শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান প্রায় ১৪ মাস পর প্রবেশ করলো তার কাঙ্খিত শ্রেণীকক্ষে।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার দি বাডস্ রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি মিডিয়ামের নার্সারি শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী নাঈম উর রহমান।
জানা যায়,মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) সকালে প্রায় ১৪ মাস পর সে তার ক্লাসে প্রবেশ করে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর আলম তাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন।

মঙ্গলবার সকালে আনন্দ উল্লাসে বাসা থেকে বের হয় দি বাডস্ রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজেের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম উর রহমান। দীর্ঘ দিন পরেও সে ক্লাস করতে পারবে, এই খুশীতে সে উৎফুল্ল হয়ে উঠে। ছেলের উৎফুল্ল দেখে তার বাবা আব্দুর রহমান ও মা নাদিরা খানমের চোখে-মুখে ছিল আনন্দের অশ্রু।
এদিন সকাল ১০টায় শিশু নাঈম স্কুলের অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর আলমের হাত ধরে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে সহপাঠীরা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়।
এর আগে সোমবার নাঈমকে স্কুলে পাঠাতে তার পরিবারকে চিঠি দেন বিদ্যালয় প্রধান মো. জাহাঙ্গীর আলম। ১৩ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র এক বিশেষ সভার এই সিদ্ধান্তক্রমে নাঈমের মা ডা. নাদিরা খানমকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে নাঈম উর রহমানকে ১৪ নভেম্বর থেকে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার অনুমোদন দেওয়া হলো। শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য আপনার ছেলেকে ১৪ নভেম্বর স্কুলে পাঠনোর অনুরোধ করা হলো।’

উল্লেখ্য, ফিনলে টি কোম্পানির বালিশিরা মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের ইনচার্জ ডা. নাদিরা খানম ও ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান দম্পতি তাদের যমজ শিশু সন্তান নাঈম উর রহমান ও নাজিফ উর রহমানকে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে দি বাডস্ রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নার্সারি ওয়ানের বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করেন। স্কুলের অধ্যক্ষসহ তিন সদস্যবিশিষ্ট ভর্তি কমিটি তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করার পর ওই বছরের জুন মাস পর্যন্ত তারা শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেন।

জুলাই মাসে তাদের ওই স্কুলেরই ইংলিশ মিডিয়ামে পুনরায় ভর্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভর্তি করা হয় এবং তারা একসঙ্গে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেয়। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘স্কুলের উপযোগী নয়, কথা বলতে পারে না, পেন্সিল ধরতে পারে না, পড়াশোনায় মনোযোগী না এবং তার দুষ্টুমির কারণে অন্য শিশুদের পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটে’ এরূপ নানা অজুহাতে শিশু নাঈমকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়।

নাঈম ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্কুলের পোশাক পরে স্কুল ব্যাগ নিয়ে যমজ ভাইয়ের সঙ্গে স্কুলের গেট পর্যন্ত যায়। কিন্তু নাঈমের প্রবেশাধীকার না থাকায় বিষণ্ন মনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের প্রধান গেটে।
ফলে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্থকর অবস্থায় পড়ে। বারবার শিশুটির অভিভাবক স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনুনয়-বিনয় করেও কোনো ফল পাননি। বাধ্য হয়ে নাঈমের বাবা আব্দুর রহমান চলতি বছরের ৫ মে স্কুল কর্তৃপক্ষকে আইনী নোটিস পাঠান। স্কুল কর্তৃপক্ষ ২২ মে নোটিসের জবাব দেয়।

পরে শিশুটির বাবা আব্দুর রহমান ২৬ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ১ অক্টোবর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ২ অক্টোবর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করেন।

গত ৮ নভেম্বর শিশু শিক্ষার্থী নাঈম উর রহমানকে ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে ও তার ওপর চলমান মানসিক নিপীড়ন বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টের ১১ জন সিনিয়র আইনজীবী শিক্ষা সচিব, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিস পাঠান।
নোটিস পাওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে শিশু নাঈমের ওপর চলমান অমানবিক ও মানসিক নিপীড়ন বন্ধ করতে এবং তাকে ক্লাসে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। অন্যথায় নোটিসদাতারা উচ্চ আদালতের দারস্থ হবেন বলে উল্লেখ করেন।

গত রবিবার (১২ নভেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিষয়টি নিয়ে দি বাডস্ রেসিডেনসিয়্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়ে শোকজ করা হয়। শোকজে তিন কার্যদিবসের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না দিলে অধ্যক্ষর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

এ নিয়ে সোমবার (১৩ নভেম্বর) স্কুলে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ সভা। সভায় শিশু নাঈমকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সভা শেষে বিকালেই চিঠি পাঠানো হয় শিশুটির অভিভাবককে। চিঠি পেয়ে মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) সকালে শিশু শিক্ষার্থী নাঈম শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়ে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেয়।