বঙ্গবীর ওসমানীর ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী:সেনা নায়কের ইতিকথা

    0
    239

    আমারসিলেট টুয়েন্টিফোর ডটকম,১০ফেব্রুয়ারী স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সংসদীয় গণতন্ত্রের অতন্ত্র প্রহরী, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ট সন্তান, সিলেটের রতœ ,বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন । তিনি সত্য সুন্দর  ন্যায়নীতি পরায়ন ও সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি, অন্যায়ের কাছে তিনি কখনও মাথা নত করেননি। এম এ জি ওসমানী  ছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কল্পনা করা যায় না।

    তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠা আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের প্রতীক ছিলেন বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই মহান ব্যক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অপরিসীম অবদান রেখেছেন। নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবীর ওসমানীর জীবনাদর্শ সম্পর্কে বেশি করে জানাতে হবে। তাঁর আর্দশে ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে গড়ে তুলতে  হবে। এসব বিজয়ী বীরদের আবাসভূমি এই জালালাবাদ তথা সিলেট বিভাগ, এ জন্য আমরা অত্যন্ত গর্বিত।

    সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার (বর্তমান ওসমানী নগর থানা) দয়ামীর গ্রাম হলো ওসমানীর পৈতিক নিবাস তবে জেনারেল ওসমানী ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার পিতার কর্মস্থল সুনামগঞ্জ শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তারঁ পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান তখন সুনামগঞ্জের এস.ডি.ও, ছিলেন। বঙ্গবীর ওসমানীরা ছিলেন দু‘ভাই ও একবোন  তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ট। জেনারেল ওসমানী ১৯২৩ সালে শিক্ষা জীবন শুরু করেন ১৯২৯ সালে ১১ বছর বয়সে তিনি আসামের শিলং কটনস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৩২ সালে ভর্তি হন সিলেট সরকারী হাইস্কুলে।

    ১৯৩৪ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন, কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্যে প্রিটোরিয়া পুরষ্কার লাভ করেন অতঃপর মহীয়সি মহিলা মা জোবেদা খাতুনের প্রেরণায় ওসমানী ১৯৩৪ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ট.ঙ.ঞ.ঈ এর সার্জেন্ট, স্যার সৈয়দ হলের অন্যতম ছাত্র উপদেষ্টা , ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওসমানী বিএ পাশ করেন এবং ভূগোল শাস্ত্রের এম এ শেষ পর্বে অধ্যয়ন কালে ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিক্ষায় অংশ গ্রহন করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং একই সাথে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরিক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন।

    কিন্তু ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের যোগদান না করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন , ১৯৪০ সালের ৫ অক্টোবর তিনি ইন্ডিয়ান মিলিটারী একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষন সমাপ্ত করে বৃটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশন প্রাপ্ত হন, ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি  বৃটিশ সামরিক বাহিনীর  সর্বকনিষ্ট মেজর নিযুক্ত হন এবং মাত্র ২৩ বছর বয়সে জেনারেল ওসমানী একটি ব্যাটোলিয়নের অধিনায়ক হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন, ১৯৪৬ সালে বৃটিশ সেনাবাহিনীর ইষ্টার্ণ কমান্ড সিলেকশন কমিটি কর্তৃক উচ্চ শিক্ষায় দীর্ঘ মেয়াদের অধ্যয়নের জন্য যোগ্য বলে মনোনিত হন, ১৯৪৭ সালে ষ্টাফ কলেজ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বৃটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে পিএসসি ডিগ্রি লাভ  করেন এবং  ১৯৪৭ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পদে উত্তীর্ণ হন ।

    উক্ত পদে উন্নীত হবার দীর্ঘ দশ বছর পর ১৯৬৬ সালের ১৬ মে ওসমানী অবসরের প্রাক্কালে ছুটি নেন, ১৯৬৭ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী পাকিস্থান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করেন, ওসমানী চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্টা করেন, তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনের প্রবক্তা, ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে জেনারেল ওসমানী আওয়ামীলিগে যোগদান করেন এবং আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল জেনারেল ওসমানীকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীসহ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়।

    ১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবীর ওসমানী “জাতীয় জনতা পার্টি” নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন,  ১৯৭৮ ও ৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দিতা করে পরাজয় বরন করেন । পরাজিত হলেও সেদিন তিনি গণতন্ত্রের বিজয়ে সহায়তা করেছিলেন । ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে চিকিৎসার জন্য ওসমানী লন্ডন যান, পরবর্তী বছর ১৬ ফেব্রুয়ারী ৬৬ বছর বয়সে মহান জননেতা ও সমর নায়ক জেনারেল ওসমানী লন্ডনের সেন্টপল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

    ১৯৮৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী সামরিক মর্যাদায় তারঁ ইচ্ছায় তাকেঁ শাহ জালাল (রঃ) মাজার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয় । জেনারেল ওসমানী একজন পরীক্ষিত জাতীয়তাবাদী ব্যক্তি,এ কারণেই হীনমন্যতা কখনও তাকেঁ স্পর্শ করতে পারেনি । তারঁ দেশপ্রেম ছিলো নিখাঁদ, রাজনৈতিক সততা ও পরমত সহিনসুতার এক মূর্ত প্রতীক ছিলেন এই মহান জন-নায়ক । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বহু দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্টার স্বপ্ন দেখে গেছেন ।

    বিংশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ট সন্তান প্রতিটি বাঙ্গালীর হৃদয়ে বেচেঁ থাকবেন চিরদিন। উপমহাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক ইতিহাসে, জেনারেল ওসমানী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ,চির স্বরনীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু জাতি তাকে ভুলতে পারছে না।

    এই মহান সমরনায়ক ও জননায়কের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাকেঁ শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করছি । আল্লাহ যেন জেনারেল ওসমানীকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন, আজকের দিনে এই প্রত্যাশা রহিল।লেখক, মোঃ মিজানুর রহমান।