ভাঙ্গা তরী

    0
    319

    ভাঙ্গা তরী

    জালাল আহমেদ জয়

     

    মানুষ এই ভুবনে কত কিছুই না করতে পারে। যেমনি তার কোন শেষ নেই ,তেমনি তার কোন অবকাশ ও নেই । এ জীবনের সাগরে আমরা সবাই যেন ভাঙ্গা তরীতে ভাসছি  , যে কোন সময় তরী ভেঙ্গে সাগরের জলে ডুবে যেতে পারি । আর তার সাথে আমাদের অস্থিত্ব ও রয়বেনা।জলোচ্ছাসপূর্ণ এক সমুদ্র পাণে বসে আছি আমরা সবাই।

    রবীন্দ্রনাথের “সোনার তরী” কবিতায় তিঁনি যা বোঝাতে চেয়েছেন তা আমরা কেহ বোঝার মত ক্ষমতা রাখতে পারি নাই।এর উত্তম কারণ হলো আমরা পাঠ্য-বই এর বাঙলা পাঠ করি শুধু মুখস্তের জন্য,কিন্তু কাঁর লেখায় পূর্ণ মাত্রায় কি-বোঝাতে চেয়েছিল ? তা চিন্তা-ভাবনা করার গভীরে যেতে পারি না।এটি একটি মুখস্থ ব্যাধি ও বলা যেতে পারে।ছোট-বেলায় শিশুদের স্কুলে পড়ানো হয় যে,

    ” লেখা-পড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চরে সে”

    বর্তমানে এই কথাটির জন্যেই আমাদের ভাঙ্গা তরীতে ভাসতে হচ্ছে।এখানেই ভাঙ্গা তরীর প্রথম ছোয়া। লেখাপড়া শুধু গাড়ি-ঘোরায় চড়ার জন্যে নয়,মানুষের মত মানুষ হবার জন্যে।

    এর কারণ আশা করি আমরা সবাই বুঝি।যেমন একজন ব্যাক্তি অতি লেখাপড়া করে ও গাড়ি-ঘোড়ায় চলতে পারছেন না,তখন সে তার ছোট-বেলার কথাটা মনে রেখে এবং তার জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও গাড়ি-ঘোড়ায় চলার জন্য উদ্ধিগ্ন হয়ে যায়।এভাবে তার চাহিদা অসীম হয়ে দাড়ায়।যার ফলে তার মাঝে সৎ আত্বা,মনুষ্যত্ব,মানবতা,ভালোবাসা সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে দাড়ায়।

    তখন সে তার অধিক চাহিদা মেটানোর জন্য এবং ছোট বেলার সেই অমরীয় কথাটি রাখার সমরে সফল করার লক্ষ্যে কোন উপায় না পেয়ে, চুরি,ডাকাতি,বিশেষ করে দুর্নীতির মাধ্যমে,

    ” লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চরে সে” এই কথাটির মান রক্ষা করার চেষ্টা করে,কিন্তু মানুষ হবার চেষ্টা করতে আগ্রহী হতে চায় না।এভাবে যখন দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে এরকম আদর্শের সৃষ্টি করে,দুর্নীতির মালা দিয়ে গাড়ি-ঘোড়ায় চলতে থাকেন।অন্যদিকে দরিদ্র-শ্রেনীর লোকের না-খেয়ে অনাহারে দিন-যাপন করে।এক-বেলা খেলে আরেক-বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। যাদের তিনবেলা ভাত ঝোটাবার ক্ষমতা নেই ,তাদের ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করলেও তারা গাড়ি-ঘোড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে অমানুষ হয়ে যায় না।বর্তমান চিত্রে ছোট শিশুদের ঐ কথাটি বাদ দিয়ে, এই কথাটি পড়ানো দরকার-

    “লেখা-পড়া করে যে,সৎ,আদর্শ,মনুষ্যত্বের ব্যাক্তি হয় সে”

    কারণ,আমরা লেখাপড়া করি ,গাড়ি-ঘোড়ায় চলার তরে নয়।মনুষ্যত্বের আলোয় নিজেকে জ্বালাবার জন্যেই।প্রতিটি হৃদয়ে আত্বার স্পন্দন সৃষ্টির জন্যেই আমাদের আত্বদান।একটা দেশ তখনই সমৃদ্ধির পথে হাটবে ,যখন শুধু শিক্ষার হার নয় ।মনুষ্যত্ব,বিবেকবান,মহৎ,হৃদয়বান,ও আত্বায়-গূণীত শিক্ষিত হতে পারবে।

    মানুষের মত মানুষের খুভ প্রয়োজন আজ।কারণ দেহে মাংসে গড়া এ পূর্ণ শরীরে দামী কাপড় ঝড়ালেই মানুষ হওয়া যায় না। ধর্মের প্রতি সম্মান রেখে,মনের-সাধনার উন্নতির দ্বারা সৃষ্টিশীল,সত্য ও সুন্দরের চিন্তা-ধারণাই মানুষের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।

    একটি গহীনতার অংশ  : প্রথমে…………….. .

    একদা কোন এক সময়ে বিশ জন লোক একটি বাসে উঠিলো-প্রায় ৩০০ কি: মি: রাস্তা অতিক্রম করিতে হইবে। গাড়ির চালক ছিল মাতাল। সে গত রাত্রে ৫ বোতল মদ্য-পান করে।কিছুক্ষণ পড়ে গাড়ীটি ছাড়ল।

    ১০০ কি: মি: রাস্তা পর্যন্ত গাড়ীটি ভাল করেই চলছে।সবাই ড্রাইবারের ওপর খুভ খুশি।তখন সবাই খুভই আনন্দে মেতে উঠেছিল।ড্রাইবারের গাড়ী চালানোর স্প্রীড দেখে।যখন ১৫০ কি: মি: রাস্তা পাড়ি দিলো তখন,

    একটি নদীর পাশ দিয়ে যাবার সময়ে বেশামাল হয়ে ব্রেক ফেইল করে এবং সাথে সাথেই বাসটি খাদে পড়ে যায়। বি: দ্র: সেই বাসটি ছিল লোকাল বাস,কোন কোম্পানীর কর্তৃক পরিচালিত নয়।নদীর খাদে পড়ে ড্রাইবার সহ সকল যাত্রিই নিহত হলেন।তারা কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য লোকাল বাসে উঠেছিল ।কিন্তু তারা জানত না যে আজ তাদের এই করূন পরিনতি হবে।

    ২য় অংশ :

    ” সোনার তরী ” কবিতায় কবিগুরূ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চাঁষির সমবেদনার মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন যে ,মানুষের মরণের সময় হলে পৃথিবী তাকে রাখে না ,কিন্তু তার জীবনের কাজগুলাকে রেখে দেয়।অর্থাৎ পৃথিবী আমাকে রাখবে না ,কিন্তু আমার যা কর্ম আছে সে গুলোই পৃথিবীতে থেকে যাবে।কবি ঠাকুর পূণ্য কাজ করায় তিনি সোনার তরী উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

    কিন্তু দুঃখ আমাদের ভাগ্যে একটা ভাঙ্গা তরীর স্বপ্ন ও দেখতে পারি না।কারণ আগামী ভবিষ্যৎ জাতির জন্যে আমি কি রেখে যেতে পারবো ? একথা কারো ভাবার সময় নেই।আমরা শুধু অর্থ-আর ধান্দাবাজির পিছনে ছুটাছুটি করি। ” সোনার তরী ” নিয়ে ভাবার মত সময় নেই। ” কবর ” আমাদের আসল সার্কিট হাউস,যেখানে যেতে হলে এম পি অথবা মিনিষ্টার হওয়ার প্রয়োজন নেই ।কারণ আমাদের যেকোন সময় বিনা রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সেই হাউসে যেতে হবে।আমাদের দৌড়ের শেষ ঠিকানা।কয়জন আমাদের মাঝে আছে ,যাহারা প্রতিটা মুহুর্তে ” কবর ” নিয়ে চিন্তা করি ?

    খালি হাতে ভাঙ্গা নায়ে তো আমাদের ঠায় হবে না।যদি সত্য-ন্যায় এর পথ ছেড়ে মিথ্যা-অন্যায়ের পথকে সুগম করে তুলি।এভাবে আমরা যদি ” সোনার তরীর ” কথা চিন্তা না করে ভাঙ্গা তরী নিয়ে সমুদ্রে পার হবার সাহস দেখাই তাহলে ভবিষ্যতে সে সমুদ্রের জলে ডুবে মরা ছাড়া আর কোন উপায় আমরা খুজে পাবো না।

    -তাই আমাদের সকলের সর্বোকৃষ্ট দায়িত্ব-কর্তব্য হল ,দেশের সকল শিশুকে মানুষের মত হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে।এভাবে দেশে আরো হাজারো গুণী মানুষের সৃষ্টি হবে বলে আমরা সবাই আশা রাখতে পারি না কি ?হৃদয় থেকে ।সর্বশেষে আমাদের দেশের শিশুদের এই কথাটি স্কুলে পড়ানো এবং সেখানো দরকার –

    ” লেখাপড়া করে যে ,সৎ,আদর্শ ও মনুষ্যত্বের ব্যাক্তি হয় সে “

    এই আলোটি সবার অন্তরে জ্বালাতে পারলেই আগামীতে সবাই ভাঙ্গা তরী নিয়ে সাগরে না ভেসে,রবীন্দ্রনাথের সোনার তরীর স্বপ্ন দেখার সাহস পাবে বলে আশা করি।

    ১৪ সেপ্টেম্বর ,২০