ভ্যালেন্টাইন’স ডের ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের বাস্তবতা

    0
    255

    আমারসিলেট টুয়েন্টিফোর ডটকম,১২ফেব্রুয়ারী,লুৎফুর রহমান তোফায়েলঃ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি-স্বকীয়তার বিকাশ রুখতে পরিকল্পিতভাবেই কিছু আগ্রাসন চলে আসছে বহু আগ থেকে। সা¤্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী কিংবা মিশনারীরা নানা ছলে তাদের সংস্কৃতির জাল প্রসারিত করছে আমাদের সমাজে। কেউ বা আবার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রসারিত করতে চেষ্টা করছে তাদের সংস্কৃতি। এভাবে আমরা প্রভাবিত হচ্ছি নানা বিজাতীয় ও অপসংস্কৃতির। শিকার হচ্ছি আগ্রাসনের।

    কখনো অবচেতন মনে, কখনো কায়েমী স্বার্থবাদীদের হাত ধরে এসব অপসাংস্কৃতিক কর্মকান্ড আমাদের সমাজে বিস্তৃত হচ্ছে। যা প্রশ্নবিদ্ধ করছে জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্বকীয়তাকে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে করছে হুমকির সম্মুখিন। এরকমই একটি দিন হচ্ছে ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’। যাকে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ও বলা হয়ে থাকে। দিনটির ইতিহাস এবং পটভূমির সাথে আজকের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এই কাহিনী তেমন সুখকর বা শালীন কিছু নয়।

    ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র ইতিহাস এবং পটভূমি অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে ক’টি মতামত পাওয়া যায় তার মধ্যে নির্ভরযোগ্য দুটি মত হচ্ছেÑ ১. প্রাচীন রোমানদের ধর্ম ছিল প্যাগান (চধমধহ)। তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর পুজা করতো। ল্যাপারকাস (খঁঢ়বৎপঁং) ছিল তাদের একটি বন্য পশু ও দেবতা। খিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে এই দেবতার প্রতি ভালবাসা জানিয়ে তারা প্রতি বছর ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ‘লুপারক্যালিয়া’ (খঁঢ়বৎপধষরধ) নামক পুজা উৎসব করতো। যার মূল দিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই পুজার প্রধান আকর্ষণ ছিল একটি লটারি। লটারির মাধ্যমে একেকজন যুবকের মধ্যে একজন করে যুবতী বণ্টন করে দেয়া হত।

    পরবর্তী বছর আবার লটারি না হওয়া পর্যন্ত এই যুবক-যুবতীরা একসাথে বসবাস করতো। পরে রোমান শাসকেরা একসময় তাদের প্যাগান ধর্ম পরিবর্তন করে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য জনগণের প্যাগান সংস্কৃতি ঠিক রেখে তা খৃস্টধর্মের ব্যানারে নিয়ে যায়। সাথে সাথে জনগনের মাঝ থেকে প্যাগান ধর্মের চিহ্ন মুছে ফেলতে রোমানদের দেবতা ল্যাপারকাসের বদলে একজন খৃস্টান ধর্মীয় সন্ন্যাসী সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এর নামে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ উদযাপনের ঘোষণা দেন। তখন প্যাগান রোমানদের ‘লুপারক্যালিয়া’ খৃস্টানদের ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’তে রূপান্তর হয়। কিন্তু লটারি পদ্ধতি সে সময়ও চালু ছিল।

    দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে; ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে ‘সেন্ট ভ্যালেইটাইন’ নামে একজন খৃস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোমান স¤্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দী করেন। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সর্বসাধারণের মাঝে ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়। এতে রাজা ভ্যালেইটাইনের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে মৃত্যুদন্ড দেন। সেই দিন ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও সেন্ট ভ্যালেইটাইনের স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস ঘোষণা করেন। এরপর থেকে খৃস্ট সমাজে এই দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন শুরু হয়।

    বাংলাদেশে সম্ভবত গত ৯০ এর দশকে ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ উদযাপনের প্রচলন ঘটে। দিন দিন দেশব্যাপী এর ব্যাপক প্রচলন বাড়ছে। এবং উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে আজকাল এই দিনটিকে পালন করার আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ্য করা যায়। একে সামনে রেখে হৈচৈ পড়ে যায় তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। প্রেমিক-প্রেমিকারা নানা অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কার্যকলাপে মেতে ওঠে। অথচ ভ্যালেন্টাইন’স ডের পটভূমির সাথে এর কোনো যৌক্তিক ও উল্লেখযোগ্য মিল নেই।

    খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরা হয়তো এই দিনটি তাদের মতো করে পালন করতে পারেন। কিন্তু এটি মুসলমানদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির কোনো অংশ নয়। আমরা মুসলমান এবং বাংলাদেশি জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। প্রাচীন যুগেও ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। ইসলামের আগমনের পর এখানে গড়ে উঠেছে একটি সুসমন্বিত সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারা। যার মাধ্যমে তৈরী হয়েছে একটি সামাজিক রীতি ও আদর্শ। তাহলে কেনো আমরা এই ধরনের দিনগুলো নিয়ে ব্যস্ত হব। যেখানে শুধু অশ্লীলতা। সকল ইসলামিক স্কলার একমত এই দিনটা মুসলমানদের জন্য উদযাপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

    যেভাবে ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন করার চেষ্টা করা হয়, বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কোনো মতেই এটাকে উৎসব বলা যাবে না। এই আনুষ্ঠানিকতা কোনো ভাবেই সুস্থ সংস্কৃতি বা বিনোদনের অংশ নয়। বরং এটি আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের দেশপ্রেম এবং ধর্মীয় চেতনা ধ্বংসের একটি ভাইরাস।