রাজধানীতে পানি নিষ্কাশনের সমাধানে অবৈধ জলাশয় উদ্ধার

    0
    215

    আমারসিলেট24ডটকম,০৫জুনঃ রাজধানীতে সংরক্ষিত পানি প্রবাহ এলাকা গুলোকে কয়েকটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) পরিবর্তনের বিষয়টি বুধবার মন্ত্রিসভার একটি কমিটির অনুমোদন পেয়েছে।
    এর মাধ্যমে সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য রূপগঞ্জের আবাসন প্রকল্প জলসিঁড়ি আবাসন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের (প্রশাসন) জন্য টঙ্গীর তুরাগে প্রত্যাশা প্রকল্প এবং বারিধারায় বসুন্ধরার আংশিক আবাসন প্রকল্পকে অনুমোদন দেয়া হবে। এছাড়াও পুলিশের জন্য ‘পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি’ নামেরও একটি প্রকল্প অনুমোদন পাবে। জলসিঁড়ি প্রকল্পে ৬৬ হাজার পরিবার আবাসন সুবিধা পাবে এবং পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকল্প দুটির প্রতিটির আয়তন ৫০একর করে।
    ২০১১ সালের জুন মাসে প্রত্যাশা প্রকল্প এবং বসুন্ধরার আংশিক প্রকল্পসহ আরো ৭৫টি আবাসন প্রকল্পকে উচ্চ আদালত অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ওই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বর্জনসহ প্রকল্প গুলোর অধীনে নির্মিত সবগুলো অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়।
    মন্ত্রিসভার কমিটির এই অনুমোদনের মাধ্যমে আরো যেসব নিষিদ্ধ প্রকল্প এবার লাভবান হতে যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে আছে রাজধানীর জোয়ার-সাহারায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি) এবং বাড্ডায় ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সাইন্স (ইউআইটিএস) নামের দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের কাজ। ড্যাপের আবাসিক প্রকল্পগুলোর জন্য নির্ধারিত জায়গার মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিবর্তিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ওই নির্ধারিত জায়গা গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় দুটির প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
    মন্ত্রিসভার কমিটিটির এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনেকটা প্রকটভাবেই যেন ফুটে উঠছে দেশের প্রভাবশালী আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর জয় ও সংরক্ষণবাদী, পরিবাশবাদী এবং নগর পরিকল্পনা বিদদের পরাজয়ের চিত্র।
    মন্ত্রিসভার কমিটিটির বুধবারের বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন। বৈঠকে তিনি জানান, রাজধানীতে পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে প্রকৌশলগত ও কারিগরি সহায়তা দেয়ায় সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অনুরোধ রেখেছে কমিটি। তিনি বলেন, “একসময় ওই এলাকাগুলো বন্যার পানিতে ডুবে থাকতো, কিন্তু আর সেগুলো বন্যাকবলিত থাকবে না। কারণ ওই এলাকা গুলোকে উন্নয়নের আওতায় আনা হচ্ছে এবং সেখানে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মিত হবে।”
    এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী জানান, জলাভূমি এবং বন্যা প্রবাহ অঞ্চলগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করা অন্য আবাসন প্রতিষ্ঠান গুলোকেও স্বাগত জানানো হবে যদি তারা পানি নিষ্কাশন ও নর্দমা সংরক্ষণের বিধান মেনে চলে।
    ড্যাপ ও আবাসন আইনের তোয়াক্কা না করেই ড্যাপ পরিবর্তন এবং জলাভূমি, ফসলের ক্ষেত ও গ্রামীণ স্থাপনা ধ্বংস করে সেসব জায়গা আবাসন প্রকল্পের কাজে লাগানোর জন্য বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সরকারি সূত্র।
    রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “শেষ পর্যন্ত এই দাবির সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হলো কারণ রাজউকের পরিকল্পনা বিভাগ আর মন্ত্রিসভার সংশ্লিষ্ট কমিটি- উভয়েই এর পক্ষে ছিল”।
    ড্যাপ পরিবর্তনের ফল কী হতে পারে জানতে চাইলে ড্যাপের কারিগরি কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, “এর ফল তো প্রতিদিনই জনগণ ভোগ করছেনই, সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায় পুরো শহর। আমি জানি না এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাকে বাঁচানোর জন্য আর কোন কোন উপায় অবলম্বন করা বাকি আছে।”
    মজার ব্যাপার হলো, বাড়িঘর তৈরির জন্য জলাভূমি আর পানিপ্রবাহিত অঞ্চলগুলো ভরাট করার কিন্তু মোটেই কোনো প্রয়োজন নেই। ড্যাপের আওতাধীন এক হাজার ৫২৮ বর্গ কিলোমিটার জমির মধ্যে আবাসিক এলাকার জন্য নির্ধারিত ছিল অন্তত ৩৫ শতাংশ এবং এই ৩৫ শতাংশ জায়গা এখনো অব্যবহৃত অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে।
    যদি আবাসিক এলাকার জন্য নির্ধারিত এই সমস্ত জমির পুরোটা ব্যবহার করা হয়, তাহলে রাজধানীতে বাসস্থান গড়তে পারবেন কমপক্ষে আরো এক কোটি লোক।
    বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ খন্দকার এম আনসার হোসেন কয়েক মাস আগে বলেছিলেন- রাজধানীর বিভিন্ন পানিপ্রবাহিত অঞ্চল, নদীর তীরবর্তী এলাকা এবং পানি ধরে রাখা হ্রদ, পুকুর ও খাল ভরাট না করেই অবশিষ্ট অঞ্চলগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব যদি প্রতি একরে ৩৫০ জন করেও হয়, তাহলেও ঢাকায় স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারবেন কমপক্ষে পৌনে তিন কোটি মানুষ।
    রাজউকের নিজস্ব প্রকল্প পূর্বাচল ১০ লাখ মানুষ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এবং উত্তরা তৃতীয় পর্বে সংস্থান হবে আরো ১০ লাখ মানুষের। এছাড়াও কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্পে বাড়ি তৈরি করতে পারবেন আরো এক লাখ ৩৩ হাজার মানুষ।
    বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আইনজীবী সংস্থার (বেলা) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, মহাপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করাই সরকারের দায়িত্ব। এসব পরিকল্পনা আর নিয়মনীতি ভঙ্গ করে আবাসন মালিকদের সুবিধার্থে কাজ করা তাদের দায়িত্ব নয়। আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানই ৬০ বিঘার বেশি কৃষিজমি বা অন্যান্য জমির মালিকানায় থাকতে পারবে না বলেও জানান তিনি।
    ড্যাপের নথিপত্র থেকে জানা যায়, রাজউকের হিসাব অনুযায়ী জলসিঁড়ি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত প্রায় ৬৫ শতাংশই বন্যা প্রবাহ অঞ্চলের এবং বাকি ১২ শতাংশ পানিসংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ১৩ শতাংশ গ্রামীণ স্থাপনার জন্য ছিল। জলসিঁড়ির জন্য নির্ধারিত এলাকার মধ্যে বেরাইদ থেকে দক্ষিণ নবগ্রাম পর্যন্ত একটি প্রাকৃতিক খালও ছিল।
    প্রত্যাশার আবাসন প্রকল্প বন্যা প্রবাহিত অঞ্চলের ওপর ছিল বলে তা বাতিল করার সুপারিশ করেছিল ড্যাপের কারিগরি কমিটি।
    ১০০ফুট চওড়া একটি প্রশস্ত খাল ধ্বংস করে পূর্বাচল লিংক রোড নির্মাণের প্রকল্পটি বাতিল করে মন্ত্রিসভার কমিটিটির নেয়া সিদ্ধান্তের ফলে বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ব্লক-জি থেকে ব্লক-এল পর্যন্ত কমপক্ষে আরো ছয়টি ব্লক তৈরি করা সম্ভব হবে। রাজউক কর্মকর্তারা জানান, ব্লক-এ থেকে ব্লক-এফ পর্যন্ত অনুমোদন রয়েছে বসুন্ধরার।
    গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব গোলাম রব্বানি বলেন, “ড্যাপ পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করাই মন্ত্রিসভার কমিটির কাজ, এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।”
    প্রভাবশালী আবাসন প্রতিষ্ঠান গুলোর তীব্র বিরোধিতার কারণে বিশাল যুদ্ধের পরে একটি পরিকল্পিত, স্বাস্থ্যসম্মত ও সুন্দর পরিবেশ সমৃদ্ধ রাজধানী গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত ড্যাপ চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই ২০১০ সালে একটি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সরকার ড্যাপ নিয়ে ‘চূড়ান্ত পর্যালোচনা’র জন্য ৭জন মন্ত্রী বিশিষ্ট কমিটিটি গঠন করে।
    অবৈধ আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য ড্যাপ পরিবর্তন চেয়ে ২০টিরও বেশি আবাসন প্রতিষ্ঠানের চিঠির সূত্র ধরে গত বছর একটি কারিগরি কমিটি জিআইএস ও স্যাটেলাইট ম্যাপ, ভিডিও এবং ছবির ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ড্যাপের আওতাধীন জলাভূমি ও বনা প্রবাহ অঞ্চল গুলোর বর্তমান ও অতীতের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করে।
    রাজউকের পরিকল্পনা বোর্ডের সদস্য ও কারিগরি কমিটিটির আহ্বায়ক শেখ আবদুল মান্নান জানান, ড্যাপ অনুযায়ী তারা তাদের তথ্য-উপাত্ত জমা দিলেও সিদ্ধান্ত নির্ভর করে মন্ত্রিসভার কমিটিটির ওপরেই।
    সামরিক বাহিনীর জন্য জলসিঁড়ি আবাসনের মোট ৬০০০ জমি আছে, প্রতিটির পরিমাণ পাঁচ কাঠা করে। ২০১০ সালে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মাঝখানে অবস্থিতও রূপগঞ্জ উপজেলার রূপগঞ্জ ও কাহেতপাড়া ইউনিয়নের ২৪টি মৌজা নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে এবং পুরোটাই হবে বন্যা প্রবাহ অঞ্চলের ওপর।
    এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ক্ষিপ্ত সহস্রাধিক গ্রামবাসী প্রতিবাদে ফেটে পড়েন এবং সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর তানমুশুরি আর্মি ক্যাম্প জ্বালিয়ে দেন তারা। সে সময় সেনাসদস্যরা গুলি করতে শুরু করলে মোস্তফা জামাল হায়দার নামের এক ব্যক্তি নিহত হন এবং সাইদুল ইসলাম (১৮), মোঃ শামসের আলী (২৮) ও আব্দুল আলিম মাসুদ (৩২) নামের তিন যুবক নিখোঁজ হন। এছাড়াও অগণিত ব্যক্তি গুরুতর আহত হন এবং অঙ্গহানি হয় অনেকের।
    এই ঘটনার পর পর্দার আড়ালে চলে যায় সেনাবাহিনী। এরপর সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এবং গৃহায়ণ ও আবাসন প্রতিষ্ঠান আশিয়ানের সহায়তায় আবারো তারা ওই জমি হস্তগত করে এবং ভরাট করে ফেলে।সূত্রঃডেইলি স্টার।