রাজনৈতিক সংকট নিরসনে হাসিনা ও খালেদার সঙ্গে কথা বললেন বান কি মুন

    0
    283

    আমার সিলেট ডেস্ক,২৪ আগস্ট : জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দেশের চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে কথা বলেছেন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আধাঘণ্টা করে দুই নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেন । এ সময় বান কি মুন বলেন, সব দলকেই নির্বাচনে দেখতে চায় জাতিসংঘ।

    ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিবকে বলেছেন, সংবিধান মেনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে। আগামী মাসে সংসদের অধিবেশন ডাকা হয়েছে। বিরোধী দল যদি সংসদে কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তাহলে সরকার তাদের ‘ওয়েলকাম’ জানাবে।

    অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবকে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না তারা। খালেদা বলেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে চান এবং সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চান। কিন্তু বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। সংলাপের জন্য তিনি সব সময়ই প্রস্তুত আছেন বলেও উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া।

    সকাল ১১টায় শেখ হাসিনাকে এবং সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে ফোন করেন বান কি মুন। জাতিসংঘ মহাসচিবকে আশস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশ্বাসী। আগামী নির্বাচনে জনগণ যাতে সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তার সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে তার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশের পরিস্থিতি জানতে চান। প্রধানমন্ত্রীও সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অবহিত করেন। আধ ঘণ্টার আলোচনায় জাতিসংঘ মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রশংসা করেন। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ নির্মূলে তার পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা অর্জন করেছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানান তিনি। বান কি মুন মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জঙ্গিবাদবিরোধী পদক্ষেপ আরো সফল হবে।

    বান কি মুন কথোপকথনের শুরুতেই শেখ হাসিনার কুশল জানতে চান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিহত হওয়া এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা স্মরণ করে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সমবেদনা জানান।

    ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, অতীতে দেশে অসাংবিধানিক পথে অথবা রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সাংবিধানিক পথে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ নিশ্চিত করতে চান। প্রধানমন্ত্রী গত সাড়ে চার বছরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার ও উপনির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের কথাও বান কি মুনের কাছে তুলে ধরেন।

    প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে জানিয়েছেন, এসব অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ৬৪ হাজার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। তারপরও এসব নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও প্রভাবমুক্তভাবে হয়েছে। বিদেশী গণমাধ্যম এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও এর প্রশংসা করেছেন। প্রায় ৩২ মিনিটের ওই ফোনালাপে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে বান কি মুন বলেন, তার (শেখ হাসিনা) মতো নেতৃত্ব বাংলাদেশে

    দরকার। সন্ত্রাস দমনে সরকারের পদক্ষেপ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

    প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে বলেন, তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধানে আগ্রহী। এ কারণে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সংলাপের প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টিও তিনি বান কি মুনকে জানিয়েছেন।

    প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে তার উপদেষ্টা বলেন, দুঃখের বিষয় বিরোধীদলীয় নেত্রী ওই প্রস্তাবের জবাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে দিতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। এতে দেশে সহিংসতা ও নাশকতামূলক তৎপরতায় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদ বিনষ্টের ঘটনা ঘটে। জনগণের দুর্ভোগ ও রাজনেতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়, যা দেশের জনগণের কাছে কাম্য নয়।

    সংলাপের বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব দেয়ার প্রসঙ্গটিও বান কি মুনের সঙ্গে আলোচনায় আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে সরকার আলোচনা করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিরোধী দল ওই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়ে আলোচনার সুযোগ নষ্ট করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের আগে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়টি জাতিসংঘ মহাসচিবকে ব্যাখ্যা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলকে ডাকা হলেও তারা আসেনি।

    ইকবাল সোবহান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সাংঘর্ষিক। ওই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।

    এদিকে সন্ধ্যায় খালেদা জিয়াকে ফোনে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতিসংঘ এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বলেও খালেদাকে বলেন বান কি মুন।

    এ সম্পর্কে রাতে গুলশানে খালেদার রাজনৈতিক কার্যালয়ে জরুরি ব্রিফিং ডেকে বিস্তারিত জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানান, বান কি মুন খালেদাকে বলেছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতিসংঘ এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘ সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন চায় বলেও খালেদাকে জানিয়েছেন মহাসচিব। একই সঙ্গে তিনি সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।

    জবাবে খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, সংলাপের জন্য তিনি সব সময়ই প্রস্তুত আছেন।

    প্রসঙ্গত, সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পর থেকেই তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের শরিকরা। সংবিধান অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষভাগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে, যা নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি। বিরোধীদলীয় নেত্রীকে আগে সংলাপের জন্য ডাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দেন সংবিধান থেকে তার সরকার ‘এক চুলও’ নড়বে না।

    অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া পরদিন এক অনুষ্ঠানে বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন তার দল মানবে না। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের এই মুখোমুখি অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে সমঝোতা ও সংলাপের তাগিদ দেয়া হচ্ছে।