শবে বরাতের বরকত পেতে অন্যের অধিকার খর্বকরন:সহ যা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি

0
837

মুহাম্মদ আনিসুল ইসলাম আশরাফীঃ মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, মহিমান্বিত এই রাতে মহান আল্লাহ জাল্লাশানুহু মানুষকে ক্ষমা করে তাদের ভাগ্য অর্থাৎ তার নতুন বছরের ‘রিজিক’ নির্ধারণ এর ফয়সালা করে থাকেন। এই জন্য এ রাতে বাবা-মা,নআত্মীয়-স্বজন,প্রিয়জনসহ মহান আল্লাহর নিকটবর্তীদের কবর জিয়ারত করে নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা মহান রবের কাছে তুলে ধরেন।যদিও এ নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে তথাপিও সর্বজন স্বীকৃত ফয়সালা হচ্ছে অন্যের সম্পদ ও অধিকার হরণকারী এবং নিম্নলিখিত অপরাধগুলোর সাথে জড়িতরা অপরের অধিকার আদায় করে খাস তওবা ব্যতীত ক্ষমা পাওয়া দুষ্কর।
বর্তমান সমাজে অধিকাংশকেই দেখা যায় ভাইয়ের হক, বোনের হক ফুফুর হক, এতিমের হক, চাচাতো ভাই বোনের হক, এজাতীয় হক বা অধিকারগুলোকে হরণ বা কৌশলগত আত্মসাৎ করে একসময় দান-খয়রাত করে থাকে এমনকি হজ্জ-ওমরাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও সৃষ্টি করে থাকে, শরীয়ত মতে উপরোল্লিখিত অপরাধের কারণে আদৌ কি এগুলো মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হবে? আবার অনেককে দেখা যায় জীবনে একদিন মা-বাবার কবরে না গেলেও কিছু লোককে ভাড়া করে তা আদায় করার চেষ্টা করে থাকে।শবেবরাত ই হোক আর শবে কদরই হোক আল্লাহর ক্ষমা পেতে হলে অন্যের হক আদায় এবং ক্ষমা নিশ্চিত করা জরুরী।

এবার আসুন সমাজে শবে বরাত কতটা গুরুত্ব বহন করে।অধিকাংশ হাক্কানী ওলামারা বিশ্বাস করে যে,শবে বরাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত। কোন অবস্থাতেই এ রাতটি অবহেলায় অতিবাহিত করা অনুচিত।
এ রাতে বিশেষভাবে রহমতের বৃষ্টি মুষলদারে বর্ধিত হয়। এ মোবারক রাতে আল্লাহ তাআলা “বনী কালব” গোত্রের ছাগল গুলোর লোম অপেক্ষাও অধিক উম্মতের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। উল্লেখ পাওয়া যায়, আরবে তৎকালীন ধনী ‘কালব’ গোত্রটি আরবের গোত্র গুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশী ছাগল পালন কারী।” আহা কিছু হতভাগা লোক এমনও রয়েছে, যাদেরকেও শবে বরাতে অর্থাৎ মুক্তি লাভের রাতেও ক্ষমা না করে শাস্তি প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে।
হযরত সায়্যিদুনা ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেন- রাসুলে আকরাম, নূরে মুজাসসাম এর শিক্ষনীয় বাণী হচ্ছে। কয়েক প্রকারের ব্যক্তিদেরকে এ রাতেও ক্ষমা করা হয় না- (১) মদ্যপানে অভ্যস্ত, (২) মাতা-পিতার অবাধ্য, (৩) ব্যভিচারী নারী পুরুষ, (৪) আত্মীয়তা বন্ধন ছিন্নকারী, (৫) ছবি (মুর্তি) প্রস্তুতকারী অনুরূপভাবে গণক, যাদুকর, অহংকার সহকারে পায়জামা গোড়ালীর নিচে ঝুলিয়ে পরিধানকারী ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষনকারীও এ রাতে ক্ষমার সৌভাগ্য লাভ থেকে বঞ্চিত থাকার অঙ্গীকার রয়েছে।
সুতরাং সমস্ত মুসলমানদের উচিত, উপরোক্ত গুনাহ থেকে যদি (আল্লাহর পানাহ্) কোন একটির মধ্যে লিপ্ত থাকে তবে তারা যেন বিশেষত এই গুনাহ থেকে আর সাধারণত প্রত্যেক গুনাহ থেকে শবে বরাত আসার পূর্বেই বরং আজ ও এখন সত্যিকার অর্থে তাওবা করে নেয়, আর যদি কোন বান্দার হক নষ্ট করে তবে তাওবার সাথে সাথে তার থেকে ক্ষমা চাওয়ার ব্যবস্থাও করা অতি জরুরি।

মুলত নিসফে মিন শা’বান (শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত) লাইলাতুল কদর (শবে কদর) লাইলাতুল মে’রাজ, জুমার রাত্রি, সোমবারের রাত্রি, দুই ঈদের রাত্রি, বারই রবিউল আওয়ালের রাত্রি ইত্যাদি সকল রাত্রি মহান আল্লাহ জাল্লাশানুহু মানবজাতির জন্য ক্ষমা প্রাপ্তির সেতু হিসাবে তৈরি করে দিয়েছেন। যেমনি ভাবে সন্তানকে পিতা-মাতার পদতলে (সেবা-শুশ্রূষা ও সম্মানের মাধ্যমে ) জান্নাত নির্ধারন করে দিয়েছেন তেমনি ভাবে স্ত্রীকে স্বামীর পদতলে (সেবা,বিশ্বাস আমানত রক্ষার মাধ্যমে ) জান্নাত তালাশ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এসবই মানবজাতির জন্য বিশেষ সুবিধা।
মহান আল্লাহর গজব ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য এক অপূর্ব সুযোগ, তবে মনে রাখতে হবে এই সুযোগ সবার জন্য নয় যদি শর্তসাপেক্ষ পরিপূর্ণ না হয়,সহজ কথায় শর্তসাপেক্ষ হচ্ছে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস এবং বান্দার হক নষ্ট করা থেকে মুক্ত থেকে তওবা করে মহান রবের প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে প্রার্থনা করলেই মহান রব সেই প্রার্থনা কবুল করতে পারেন কেননা তিনি হচ্ছেন অতিশয় ক্ষমাশীল ও দোষ গোপনকারী।

তবে এর জন্য বিশ্বাস রাখতে হবে পরিপূর্ণ। যে আল্লাহ জাল্লাশানুহু সর্বময় ক্ষমতার মালিক ও মোখতার তিনি যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন, সকল প্রকার ফযীলত বা শ্রেষ্ঠত্ব তারই হাতে। এই চিরন্তন বিধান অনুযায়ী এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির উপর, এক নবী অন্য নবীর উপর, এক জনপদকে অন্য জনপদের উপর, এক সাহাবীকে অন্য সাহাবীর উপর, এক মাসকে অন্য মাসের উপর, এক দিবসকে অন্য দিবসের উপর এক রজনীকে অন্য রজনীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। যেমন পবিত্র রামাদান মোবারক সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, জু’মার দিন অন্যান্য দিনের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, অনুরূপ “নিসফে মিন শা’বান” ( শবে বরাত), লাইলাতুল ক্বদর,লাইলাতুল মে’রাজ ইত্যাদির মর্যাদা অন্যান্য রাত্রির তুলনায় অনেক গুণ বেশী।
প্রশ্ন জাগতে পারে কেন এই সুবিধা গুলো? অনন্তকাল পরকালের জীবনের বিপরীতে দুনিয়ার জিন্দেগী অতি সামান্য। তাই মানুষের সীমাবদ্ধ জীবনে রয়েছে অনেক বাধা-বিপত্তি অসুখ-বিসুখ,শ্রম-আরাম,পেরেশানী যার কারণে সে গন্তব্যস্থান পর্যন্ত পৌছানো অনেক কঠিন। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বীয়-বান্দাগণের প্রতি মহা অনুগ্রহ করে তাদের জীবনে কল্যাণ দান ও অফুরন্ত সওয়াব হাসিল করার জন্য বিশেষ বিশেষ ‘দিবস’ ও সুযোগ দান করেছেন।

আসুন স্বল্পপরিসরে জেনে নেই শবে বরাত কি ? শবে বরাত (লাইলাতুল বরাত) “শব” হচ্ছে ফার্সি শব্দ এর অর্থ রাত, রজনী। বারাআতুন হল আরবী শব্দ এর অর্থ হচ্ছে নাজাত, নিস্কৃতি। ভারত উপমহাদেশে আরবি-ফারসি মিলিয়ে ধর্মিও শব্দগুলো ব্যবহার হয়ে থাকে যেমন নামাজ। আরবিতে বা হাদীস কোরানের ভাষায় নামাজ হচ্ছে “সালাত”।

আসুন আমরা জেনে নেই পবিত্র এই রজনীতে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কি করে থাকেন? হাদিস ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে জানা যায় ওই রাত্রি হচ্ছে তাওবা (মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা)ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে ক্ষমা প্রাপ্ত হইয়া দোযখ থেকে নাজাত ও নিস্কৃতি লাভ করার রাত্রি।
সরল ভাষায় বলতে গেলে এ রাত্রি হচ্ছে লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত একটি প্রশিক্ষণের সময়। যার রেজিষ্ট্রেশন শুরু হয় মে’রাজের রাত থেকে আর ক্লাশ শুরু হয় নিচফে মিন সাবান থেকে এবং পুর্ণ পরীক্ষা শুরু রামাদানের সাওম থেকে আর লায়লাতুল কদর এর মাধ্যমে এর ফলাফল প্রাপ্তির প্রত্যাশায় পরিশেষে আনন্দের দিন ঈদুল ফিতর।


অপর দিকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘রজব হলো আল্লাহর মাস, শাবান হলো আমার মাস; এবং রমজান হলো আমার উম্মতের মাস।
সে জন্য বলা হয়ে থাকে রজব বীজ বপনের মাস,শাবান সেচ দেওয়ার মাস এবং রমযান হচ্ছে ফসল কাটার মাস।
প্রতি আরবি বৎসরের যাবতীয় ফয়সালা হায়াত (জীবন), মওত (মৃত্যু) রিযিক্ব, ধন-সম্পদ, আমল ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক যুক্ত আদেশ-নিষেধ সমূহ উক্ত রাত্রিতে লওহে মাহফুজ থেকে উদ্ধৃত করিয়া কার্যনির্বাহি ফেরেস্তাদের নিকট সোপর্দ করা হয়। এইজন্য বলা হয়ে থাকে যে,শাবানের পনের তারিখ রাত হইতে এই কাজ শুরু হয় এবং শবে ক্বদরে তাহার পরিসমাপ্তি ঘটে।

হযরত সায়্যিদুনা আলী মুরতাদা থেকে বর্ণিত, নবী করীম রাউফুর রহীম ইরশাদ করেছেন: “যখন শাবানের ১৫তম রাতের আগমন ঘটে, তখন তাতে কিয়াম (ইবাদত) করো আর দিনে রোযা রাখো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলা সূর্যাস্তের পর থেকে প্রথম আসমানে বিশেষ তাজাল্লী (উজ্জ্বলা) বর্ষণ করেন এবং ইরশাদ করেন, কেউ আছ কি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কারা, তাকে আমি ক্ষমা করে দিবা কেউ আছ কি জীবিকা প্রার্থনাকারী, তাকে আমি জীবিকা দান করব। কেউ আছ কি মুসিবতান্ত, তাকে আমি মুক্তি প্রদান করবা কেউ এমন আছ কি। কেউ এমন আছ কি। সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত এর ঘোষণা করতে থাকেন।”
আউলিয়ায়ে কিরাম’র আমলঃ মাগরিবের ফরয ও সুন্নাত ইত্যাদির পর ছয় রাকআত নফল দু’ দু’ রাকআত করে আদায় করা। প্রথম দুই রাকআতের পূর্বে দীর্ঘায়ূর নিয়্যত করবে, এর পর দুই রাকআত বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য। এর পরবর্তী দুই রাকআতে আল্লাহ্ যেনো তিনি ব্যতীত অন্য কারো মুখাপেক্ষী না করেন। প্রতি দুই রাকআতের পর একুশবাোর সূরা ইখলাস অথবা একবার ‘সুরা ইয়াসিন’ পড়বেন। বরং সম্ভব হলে উভয়টি পড়বেন।

যে দোয়া বা মোনাজাত করতে পারিঃ হে আল্লাহ অর্ধ শাবান মাসের রাতে যা রয়েছে, যাতে বন্টন করে দেয়া হয় প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ কর্ম ও স্থির করে দেয়া হয়। হে আল্লাহ মুসীবত সমূহ আমাদের কাছ থেকে দূর করে দাও, যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি কিংবা জানিনা, অথচ তুমি এগুলো সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশী জ্ঞানী। নিঃসন্দেহে তুমি সর্বাপেক্ষা পরাক্রমশালী ও সম্মানের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা আমাদের সরদার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র উপর ও তাঁর বংশধর, সাহাবাগণ (রাঃ) এর উপর দরূদ ও সালাম প্রেরণ করুন। আমার সকল প্রশংসা সমগ্র জাহানের পালন কর্তা আল্লাহর জন্য।

আমাদের দেশে ঐ সমস্ত রাত্রিতে ইবাদতের নামে রাতভর মাইক বাজিয়ে চতুর্দিকে রাতের শান্তিময় পরিবেশ কে অস্থির করে তোলা হয়,এবাদত এর পরিবর্তে গল্পগুজব করে, ফেরিওয়ালার মত বাড়ি বাড়ি ঘুরে,কেহ কেহ আতশবাজি করে,অবৈধ আনন্দ বাধ্য বাজনা বাজিয়ে উল্লাসের মত নিষিদ্ধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রকৃত ইবাদতকারীদের ইবাদত করতে যথেষ্ট বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়।ইবাদতের নামে ওই সমস্ত ধর্ম ও পরিবেশ বিরোধী কার্যকলাপ থেকে আল্লাহ আমাদের মুক্ত থাকার তৌফিক যেন দান করেন।আল্লাহ আমাদের বুঝার তৌফিক দিন আমিন বেহহুরমাতে সাইয়্যিদুল মুরসালিন।আল্লাহ ও তার রাসুল (দঃ) অধিক জ্ঞাত।