শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন:মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

0
151

প্রচণ্ড রকমের ঠাণ্ডাকে সাথে করে নিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে আসে শীত ঋতু। এতো বেশি শীত সেখানে নামে যে দেশটি শীতার্ত অঞ্চল বলেই পরিচিত। শীতের দাপটে সেখানে সব কিছুরই তখন জমে যাবার মতো অবস্থা হয়। সে দেশের লোকজন সব আড়ষ্ট অবস্থায় থরথরিয়ে কাঁপতে থাকে। সবাই কীরকম কুঁকড়ে যায়। শীতঋতুটি সে কারণে তাদের কাছে ছিল বিপদজনক। তখন কোথাও কোন স্বস্তি নেই। অথচ এই শীতকালটাকেই কিনা পছন্দ করত সেখানকার গহিন জঙ্গলে থাকা ডাইনি বুড়িদের দলটি। যারা থাকতো নিকষ অন্ধকারের পাহাড়ি গুহাগুলোতে।
শীতের কারণে মানুষজন তেমন একটা ঘর থেকে বেরুতো না। ঘরের ভেতরেই থাকতো শীতের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। চারদিক তখন শুনশান অবস্থা বিরাজ করত। সে রকম পরিবেশে ডাইনি বুড়িদের দলটি মনের খুশিতে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারতো। কেউ আর তাদের তখন বিরক্ত করত না। অন্য সময় ডাইনিদের দেখতে পেলেই লোকজন তাদের প্রতি ঘৃণা দেখাতো। ডাইনিদের পথ আটকাতো। ডাইনিদের ক্ষতি করতে চাইত।
পথে ঘাটে মানুষজন না থাকলেই তো ডাইনিদের মনে আনন্দ জেগে উঠত। কুৎসিত ডাইনিগুলো তখন তাদের কদাকার আকৃতি নিয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াত। তারা যা পছন্দ করে সে ধরনের আচরণ করত। আর এভাবেই ডাইনিরা তাদের দাপট বজায় রাখতো।
সেই ডাইনি বুড়িদের মধ্যে আবার যেটা ছিল সবচাইতে বেশি বয়সী তার মনে হঠাৎ করে এক অদ্ভুত চিন্তা জাগল। যদি এই শীতঋতুটা শেষ না হতো তাহলে তো খুব ভালো হতো। শীতকাল আর ফুরিয়ে যেতো না। কিন্তু কীভাবে এই শীতকালটাকে চিরস্থায়ী করা যায়। এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে যাতে শীতের শেষে বসন্তকাল চলে না আসে। বসন্তকাল হলো ফুল ফোটার রঙিন, ঝলমলে ঋতু। তখন আলোময় সময়। যেটা ডাইনিদের কাছে খুব অপ্রিয়। ডাইনিরা চায় থমথমে আঁধার ঢাকা পরিবেশ।
সেই ডাইনিবুড়িদের তখন তার মতো আরো অশুভ শক্তির অধিকারীদের সাথে এ বিষয়ে গোপন শলা-পরামর্শ করল। তারা শীতকালকে চিরস্থায়ী করার পক্ষে। তারা গভীর ষড়যন্ত্র করল। তারা গেল জাদুবিদ্যার পারদর্শী পাতালপুরির তাতুনখামুনের নিকটে। ভয়ঙ্কর ক্ষমতা তার। অসাধ্য সাধন করতে পারে। কিন্তু তাতুনখামুনকে দিয়ে সহজে কাজ করানো যায় না। তার চাহিদা ছিল অদ্ভুত। সে চায় বলগা হরিণের প্রচুর মাংশ। সেই মাংশের পরিমাণ হবে পাহাড় সমান। তাতুনখামুন বলগা হরিণগুলোর কলজে চিবিয়ে খাবে। তার মুখ ভরে যাবে বলগা হরিণের রক্তে।
ডাইনিরা তাতুনখামুনের সেই ভয়ানক চাহিদাকে মেটালো। বরফের প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় বলগা হরিণের পাল। ডাইনিরা দলবেঁধে যায় বরফের বিশাল প্রান্তরে। প্রচুর সংখ্যক বলগা হরিণকে হত্যা করে। তারপর তাতুনখামুনের সামনে নিয়ে যায় বলগা হরিণের মাংশের স্তুপ। পাতালপুরিতে ডাইনিরা এভাবে তাতুনখামুনের জন্যে বিশাল ভোজের আয়োজন করে। ভীষণ পরিতৃপ্তির সাথে ভোজে অংশগ্রহণ করে তাতুনখামুন।
বলগা হরিণের রক্তমাখা কলজে কচকচিয়ে চিবিয়ে খাওয়ার সময় তাতুনখামুনকে উল্লসিত দেখায়। এরপর তাতুনখামুন জাদুবিদ্যা প্রয়োগ করে ডাইনিদের মনোবাসনা পূরন করে। তার জাদুবিদ্যার ছিলো অকল্পনীয় ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার সাহায্যে তখন শীতকালটাকে আটকিয়ে ফেলা হলো। তখন থেকে শীত ঋতুর আর সমাপ্তি ঘটবে না। শীতের অবসান হবে না। শীত টিকে থাকবে। আর বসন্তকালকে গভির ঘুম পাড়িয়ে দিলো। সেই ঘুম আর সহজে ভাঙবে না। তাই প্রকৃতিতে বসন্তকালও আর আসতে পারবে না। শীতকাল জেঁকে বসে থাকবে। নড়বে না। শুধু তুষার ঝড় বইতে থাকবে হু হু করে। গাছে ফুল ফুটবে না।
তাতুনখামুনের অশুভ জাদুশক্তির প্রভাবে দেশটিতে তখন এক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। তুষারের নিচে চাপা পড়ল মানুষদের বাড়িঘর। দিনের বেলাতেও সূর্যের আলোর দেখা মেলে না। তাই অন্ধকার থমথম করে সবখানে। মানুষজন প্রকৃতির এমন বিরূপ ভাব দেখে বিস্মিত হয়। শীতকাল তো শেষই হচ্ছে না। শীতের এমন স্থায়ী রূপ এর আগে কখনও দেখা যায়নি। ঋতুর সময়কাল যেন কোনো হিশেব-নিকেশ মানতে চাইছে না। এরকম গরমিল দেখে মানুষেরা স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। অবিরাম বরফ পড়াতে ঘরবাড়িগুলো পুরু বরফ আচ্ছাদনে ঢেকে যায়। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা দাঁড়ালো, বাড়িঘরের দরজার সামনে বরফের চাঁই জমে যাওয়াতে দরজা আর খোলা যেত না। মানুষজন ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। ঘরে আটকে পড়া লোকেরা তখন নিরুপায় হয়ে বরফের দেয়াল ফুটো করে প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। অসহায় লোকেরা ঐ রকম অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চায়। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? কেমন করে এর অবসান ঘটবে? সেই উপায়টা বের করতে হলে তো সকলের সাথে কথাবার্তা বলে পরামর্শ করতে হবে। সেই অসহনীয় অবস্থায় থেকে তারা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠল। শেষে বাধ্য হয়ে তারা নিজেদের ঘরের দরোজাগুলো ভেঙে ফেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। দম আটকানো দুঃসহ ভাব থেকে মুক্তি পায়। লোকজন শীতে কাঁপতে কাঁপতে নগরীর বিশাল মাঠের দিকে ছুটে যেতে থাকে। তারা একসাথে মিলিত হয়ে এই সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজার বিষয়ে আলোচনা করবে। তারা সমবেত কণ্ঠে চিৎকার করে নিজেদের মনের ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। উপস্থিত লোকজনদের মাঝে সবচাইতে প্রবীন ব্যক্তিটির কাছে এই সমস্যা সমাধানের উপায়টি জানাতে অনুরোধ করা হয়। সেই মানুষটি হচ্ছেন শামান গোষ্ঠীর নেতা। যে গোষ্ঠির লোকেরা আসন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের আভাস দিতে সক্ষম।
সকলেরই প্রবল আস্থা রয়েছে শামান প্রধানের প্রতি। তিনি হয়ত এই সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সঠিক একটি দিক-নির্দেশনা দিতে সক্ষম হবেন।
প্রবীন শামানের দিকে সকলে সাগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে। শামান প্রধান তার ধারণার কথাটি জানালেন। ‘শোনো সবাই, আমিও কখনও এ রকম দুঃসহ অবস্থা এখানে দেখিনি। এতো অবিশ^াস্য এক ঘটনা। শীতঋতু এখনও বিদায় নিচ্ছে না। আর তার বিদায় নেবার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এমন কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাচ্ছি না, যাতে মনে করতে পারি যে শীতকাল বিদায় নিচ্ছে। তাহলে কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে ঋতু বদলের সম্রাট এখন সচেতন অবস্থায় নেই। তিনি ঘুমিয়ে আছেন। গভীর ঘুমে সুপ্ত তিনি। সম্রাট যদি জাগ্রত থাকতেন তা হলে তো এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। নিশ্চয়ই অশুভ শক্তির উৎস ডাইনি সম্প্রদায় তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। কারণ ডাইনিরা চায় শীতঋতু স্থায়ীভাবে থাকুক। আমরা এখন অবশ্যই ঋতু বদলের সম্রাটের এই ঘুমের অবসান চাই। তাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাকে জাগাতে না পারলে আমরা কখনও মুক্তি পাবো না। তখন আমাদের সবাইকে বাধ্য হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। শামান প্রধানের কথাগুলো শুনে সমবেত লোকজনের চৈতন্য উদয় হয়। তারা তো বিষয়টাকে এমন করে ভেবে দেখেনি। তিনি যেন তাদের সকলের চোখ খুলে দিয়েছেন। সকলে বুঝতে পারলো যে তাদের এমন মারাত্মক অবস্থা কেন হয়েছে। কিন্তু ঋতু বদলের সম্রাটের গভীর ঘুম ভাঙানো হবে কীভাবে? এতো ডাইনিদের পাড়ানো জাদুঘুম।
ঋতু বদলের সম্রাট থাকেন অতি দুর্গম এলাকায়। সেটি হলো সবচাইতে উঁচু খাড়াই পাহাড়ের চূড়োর টকটকে লাল প্রবাল পাথরের তৈরি প্রাসাদে। পথটি পুরোপুরি বরফে ঢাকা। সেই পথ অতিক্রম করাটা দুঃসাধ্য। কারো পক্ষেই সেখানে পৌঁছানো অসম্ভব। বরফের চাঁই ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। অতলস্পর্শী গভীর খাদ ডিঙিয়ে যেতে হবে। প্রচ- তুষার ঝড়ের মাতামাতি তো রয়েছেই। এসব কথা চিন্তা ভাবনা করে লোকজন হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ল। শামান প্রধান কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ঋতু বদলের সম্রাটকে জাগিয়ে তুলতে না হয় শেষ পর্যন্ত আমিই যাবো। ডাইনিদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার চেষ্টা আমি দীর্ঘকাল থেকে করে আসছি। এদের জন্য দেশটা নষ্ট হয়ে যাবে।
শামান প্রধানের কথা শুনে উপস্থিত লোকজন আঁতকে ওঠে। এই বৃদ্ধ মানুষটি সেই দুর্গম পথে কীভাবে যাবেন! এতো অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই হতে পারে না।
লোকজনেরা বলে, ‘জানি, আপনি আমাদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। বিশ^াস করি আমাদের মঙ্গলের জন্যই আপনি সেখানে যেতে চাইছেন। কিন্তু যাবার পথটি অতি দুর্গম। আপনি যেতে চাইলেও তো পারবেন না। তুষার ঝড় আপনাকে পর্যদস্তু করে ফেলবে। পথে আপনি মুখ থুবড়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করবেন। আমরা কোনোমতেই আপনাকে এভাবে হারাতে চাই না। একমাত্র আপনার কাছ থেকেই আমরা দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার সাহস পাই।’
শামান প্রধান বলতে থাকেন, ‘কিন্তু কাউকে না কাউকে তো যেতে হবে ঐ পাহাড় চূড়োর প্রাসাদে। সে গিয়ে ঘুম ভাঙাবে ঋতু-বদলের সম্রাটের।’
এমন সময় একটি অভাবিত ঘটনা ঘটল। ভিড় ঠেলে একটি কিশোরী এগিয়ে আসে। তার নাম শালোনিকা। সে একটি দুস্থ, দরিদ্র, এতিম মেয়ে। তার বাবা-মা দু’জনই পাহাড়ি বানের স্রােতে ভেসে মৃত্যুবরণ করেছে। সবাই কিশোরীটিকে স্নেহের চোখে দেখে। শালোনিকা এগিয়ে যায় শামান প্রধানের সামনে। সেখানে গিয়ে নতজানু হয়। শামান জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি কিছু বলবে? শালোনিকা দৃঢ় কণ্ঠে বলে, আমি বলতে এসেছি যে আমি ঐ পাহাড় চূড়োর প্রাসাদে যাবো ঋতুবদলের সম্রাটের ঘুম ভাঙাতে।
কিশোরী শালোনিকার এমন প্রত্যয়ী কণ্ঠস্বর শুনে সকলে স্তম্ভিত হয়ে যায়। বলছে কী এই কিশোরীটি। সে কী না যেতে চাইছে পাহাড়ে চূড়োর প্রাসাদে। কী ভয়ানক কথাই না বলছে এই মা-বাবা হারানো মেয়েটি। তার কি বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেছে? তা না হলে এমন একটি অসম্ভব প্রস্তাব সে কীভাবে দেয়?
সকলেই হতবাক হয়ে যায়। অথচ শামান প্রধান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন শালোনিকার দিকে। তিনি তখন মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছিলেন তার সামনে একটি প্রজ¦লিত অগ্নিশিখা। তিনি স্নেহ ভরে হাত রাখলেন শালোনিকার মাথায়। বললেন, ‘তুমি যাবে?’ শালোনিকা সাহসভরা কন্ঠে বলল, ‘আমি অবশ্যই যাবো। কারণ আমি সেখানে যেতে পারবো। আমি যে পাহাড়ি প্রাণিদের মতোই দারুণ ক্ষমতা রাখি। দেখো তোমরা, আমি কিন্তু ঠিকই পাহাড় বেয়ে উঠে যাবো। কোনো কিছুই আমার সামনে বাধা হবে না।
আসলে শালোনিকা ছিল অসম্ভব ধরনের জেদি স্বভাবের। সে যা বলত তা অবশ্যই করে ছাড়ত। কেউ তাকে নিরস্ত করতে পারতো না। অনেকেই তাকে নিষেধ করলো পাহাড়ে না উঠতে। শামন প্রধান নুয়ে শালোনিকার হাতটি ধরলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ মা, তুমি যাবে।’
শামান প্রধানের কাছ থেকে এভাবে সম্মতি পেয়ে খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল শালোনিকার মুখ। সকলে বুঝতে পারল শালোনিকা যাবেই। শালোনিকার পরনে ছিন্ন পোশাক। দরিদ্র মেয়েটির কোন শীতবস্ত্রও নেই। সেখানে উপস্থিত মায়েরা তাদের সন্তানদের পশমি পোশাক খুলে শালোনিকার শরীরে পরিয়ে দিল। বাবারা তাদের সন্তানদের মাথা থেকে পশমি লাল টুপি খুলে নিয়ে শালোনিকার মাথার পরিয়ে দেয়। শালোনিকা তার শরীরে উষ্ণতা অনুভব করে। শামান প্রধান তার নিজের শালটি তুলে দিলেন শালোনিকার হাতে। বললেন, ‘তুমি এটা নাও। রাতে এর উপরে শুয়ে ঘুমুবে। আর এই নাও ভেড়ার লোমের তৈরি চাদর। শরীরে জড়িয়ে রাখবে। আর এই নাও ছোট একটি কুঁড়াল। সম্রাটের প্রাসাদটি ঘিরে রেখেছে ডাইনি শক্তির বলয়। তুমি এই কুঁড়ালের সাহায্যে সেই বলয়টিকে কেটে ফেলতে পারবে।
তোমাকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দিচ্ছি। এই সোনালি রুপুলি বাঁশি। এটা তৈরি করা হয়েছে বলগা হরিণের শিঙ দিয়ে। তুমি যখন ঘুমন্ত সম্রাটের কানের কাছে গিয়ে এই বাঁশিটি বাজাবে ঠিক তখনই সম্রাটের ঘুম ভাঙবে। এই বাঁশির সুরের এমনি গুণ।
শালোনিকা শামান প্রধানের কাছ থেকে উপহারগুলো গ্রহণ করল। এরপর শালোনিকা পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল। বিশাল এক দায়িত্ব নিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মনে কোনো দ্বিধা নেই। সে এটা ভালো করেই জানে যে তার এই কাজটি সফলভাবে সমাপ্ত করার উপর সকলের জীবন মরণ নির্ভর করছে। যদি সে ব্যর্থ হয় তাহলে সকলকেই মরতে হবে।
খুব সতর্কতার সাথে পথ চলছে শালোনিকা। আসলেই পথটি খুব বিপদজনক। বরফে ঢেকে পথটি ভীষণ রকমের পিচ্ছিল হয়ে আছে। সহজে হাঁটা যায় না। পা কাঁেপ। শালোনিকা বার কয়েক পিছলে গড়িয়ে পড়েছে। পাশের গভির খাদে। সেখানে থেকে অনেক কষ্টে উঠে আসে। তার শরীরে আঘাত লাগে। পাথরের ঘষায় পা ছড়ে যায়। তবু মনোবল হারায় না সে। কোনো বাধাই যেন তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।
এদিকে পাহাড়ি পথে এগিয়ে আসতে থাকা শালোনিকার বিষয়টি জেনে গেছে ডাইনিগুলো। তারা তখন শালোনিকাকে আটকাতে চায়। তারা তীব্র তুষার ঝড় পাঠিয়ে দেয় কিশোরী মেয়েটিকে রুখতে। তুষার ঝড়কে রাগিয়ে দিতে চায় ডাইনিগুলো। বলে, ‘ছোট মেয়েটির কতোটা সাহস দেখেছো। তোমাকে তো সে মোটেই আমলে আনতে চাইছে না।’
ডাইনিদের এমন কথায় তুষার ঝড় ভারি রেগে যায়। সত্যিই তো মেয়েটি কীরকম হনহনিয়ে চলেছে। আশপাশের কোনো সমস্যাকেই সে যেন তোয়াক্কা করছে না। ভাবটা এমন যে কেউ যেন তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ডাইনিগুলোর উসকানিতে তুষার ঝড় রাগে ফুঁসতে থাকে। তার পাক খাওয়ার গতিকে বাড়িয়ে দেয়। ভাবে ঝড় ঐ পুচকে মেয়েটিকে এবার ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে পাহাড়ি খাদের নিচে ফেলে দেবে।
আসলে তুষার ঝড়ের কোনো ধারণাই ছিল না শালোনিকার ক্ষমতার সম্পর্কে। ভেবেছিল ঝড়ের এক জোরালো ফুঁতেই হয়তো মেয়েটি উড়ে যাবে। যখন তুষার ঝড় হু হু করে ছুটে এলো তখন অসম সাহসী শালোনিকাও রুখে দাঁড়ালো। সে তুষার ঝড়কে একেবারেই যেন গুরুত্ব দিচ্ছে না। শালোনিকার ওইরকম দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেই তুষার ঝড় নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। শালোনিকার দৃপ্ত তেজি ভঙ্গিতে তখন সিঁটিয়ে যায় তুষার ঝড়। তার দর্প চূর্ণ করে দিয়েছে এই কিশোরী।
তুষার ঝড়ের এমন পরিণতি দেখে ডাইনিগুলো মুষড়ে পড়ে। এটা কী হলো? কোথায় কিশোরী মেয়েটির থেঁতলে যাওয়া শরীর পড়ে থাকবে খাদের কিনারে তার বদলে কিনা মেয়েটি দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারাতে ভয়ের লেশ চিহ্ন নেই। ডাইনিরা তখন নতুন করে কু-বুদ্ধি আঁটতে থাকে। মেয়েটিকে থামানের জন্য এবার কী করা যায়? ডাইনিরা তখন তাদের মায়ের কথাটি ভাবলো। এই মা হয়তো তাদের সাহায্য করতে পারবে। ডাইনিরা তাদের মাকে আর্ত কন্ঠে ডাকতে থাকে।
ডাইনিদের এমন করুণ কণ্ঠের ডাক শুনে তাদের মা গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিদের কাছ থেকে সব কথা শুনে বলে, তোমরা তো ভুল করছো। ঐ ছোট মেয়েটি কিন্তু অসম্ভব সাহসী। তাকে থামানোর বিষয়টাকে তোমরা কিন্তু অত সহজ ব্যাপার বলে মনে করো না। তার বিরুদ্ধে গিয়ে তোমরা পারবে না।
ডাইনিরা জানতে চায়, তাহলে আমরা কী করবো? ওকে তো থামাতেই হবে। যে করেই হোক। ও যদি ঋতু বদলের সম্রাটের কাছে চলে যেতে পারে তাহলে আমাদের বিপদ হবে।
ডাইনিদের মা তখন জানায়, তোমাদের এখন কাজ হবে ঐ মেয়েটির সাথে ভাব করে ফেলা। মায়ের এমন কথা শুনে ডাইনরা ভীষণ অবাক হয়ে যায়। এ কী বলছে তাদের মা!
ডাইনিদের মা বলল, আমি এবার অন্য একটা কাজ করবো। চেষ্টা করে দেখি, ওকে থামানো যায় কী না। আমি এবার শালোনিকার সামনে তার দাদির ছদ্মবেশ ধরে উপস্থিত হবো। মায়ের মৃত্যুর পর শিশুকালে শালোনিকাকে কিছুদিন তার দাদি পালন করেছিল।
তখন তাই করল ডাইনিদের মা। জাদুবলে সে নিজেকে শালোনিকার মমতাময়ী দাদির চেহারায় রুপান্তরিত করল। তারপর হিমেল বাতাসে কাঁপতে থাকা শালোনিকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শালোনিকা বিস্মিত হয়ে সামনে তার দাদিকে দেখতে পায়। শালোনিকা বলে, ‘তুমি?’
ছদ্মবেশি দাদি বলে, ‘এলাম তোমাকে ঘুম পাড়াতে। তুমি এখন প্রচ- কষ্টে আছো। তোমাকে কষ্ট পেতে দেখে আমারও যে যন্ত্রনা হচ্ছে।
এমন কোমল কণ্ঠের কথাগুলো শুনে শালোনিকা থমকে যায়। এদিকে শীতের বাতাস ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। ফুঁসে ফুঁসে ছোবল মেরে থামিয়ে দিতে চাইছে শালোনিকার চলার গতিকে। কিন্তু প্রচ- মনের জোরে সে এগুচ্ছে। একসময় বাতাসের তীব্র ঝাপটার সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায়। ডাইনিদের মা তখন শালোনিকাকে বরফের উপর শুইয়ে রাখল। ডাইনিরা শালোনিকার এমন পতনে দারুণভাবে উল্লসিত হয়।
ডাইনিদের মা আর ডাইনিরা শালোনিকাকে মৃত মনে করে চলে যায়।
এদিকে ধপধপে বরফের উপর এরকমভাবে হাত পা ছড়িয়ে একটি কিশোরী মেয়েকে দেখতে পায় সেখানকার গর্তে থাকা পাহাড়ি ইঁদুরগুলো। তারা দলবেঁধে এগিয়ে আসে। তারা এসে মেয়েটির হিমে জমে যাওয়া শরীরটিকে সচল করে তুলতে চায়। ইঁদুরেরা মেয়েটিকে উষ্ণ করে তোলার জন্যে শালোনিকার চেতনাহীন শরীরের সাথে নিজেদের ঘষতে থাকে। এই ঘষাঘষির ফলে মেয়েটি ক্রমশ উষ্ণতা ফিরে পাবে।
পাহাড়ি ইঁদুরদের এরকম কর্ম তৎপরতা দেখে আকৃষ্ঠ হয় পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের গর্তে সেঁিধয়ে থাকা তুলতুলে খরগোশগুলো। তারা মনে করল, ইঁদুরদের পাশাপাশি তাদেরকেও অমন কাজ করা উচিত। মেয়েটিকে বাঁচিয়ে তোলার জন্যে তারাও তখন এগিয়ে আসে। খরগোশদের এগিয়ে আসতে দেখে পাহাড়ি ইঁদুরেরাও তখন আরো বেশি উৎসাহ পায়। খরগোশদের দলটি শালোনিকার হিমে জমা শরীরের সাথে নিজেদের শরীর ঘষতে থাকে। এরকম দৃশ্য দেখে আশেপাশের গাছগুলোর খোঁড়ল থেকে কাঠবিড়ালিও লেজ উঁচিয়ে বেরিয়ে আসে। আর তারাও শালোনিকার শরীরে নিজেদের শরীর ঘষতে থাকে। তারাও শীতে কুঁকড়ে যাওয়া কিশোরীটিকে সজীব করে তুলতে চাইছে। এভাবে পাহাড়ি প্রাণিদের সকলের আপ্রাণ চেষ্টায় শালোনিকা সজীব হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। ভাবে, কতো যে ভালো এই প্রাণিরা। সে তখন প্রাণিদের কাছে তার গভির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। বলে, ‘তোমাদের জন্য আমি যেন নতুন করে বেঁচে উঠতে পেরেছি। সত্যি, এটা হলো এক রহস্যময় ঘটনা। তোমরা সবাই মিলে আমার জন্য অনেক করলে। প্রাণিরা তখন শালোনিকার কাছে তার পাহাড়ে উঠে আসার কারণটি জানতে চায়। শালোনিকা তখন তাদের কাছে সব কথা খুলে বলে। পাহাড়ে উঠে আসার উদ্দেশ্য জানায়। পাহাড়চূড়োর প্রাসাদে গিয়ে ঋতুবদলের সম্রাটের ঘুম যে ভাঙাতে হবে সেই কথাটি বলে। শালোনিকার কাছ থেকে সব শুনে পাহাড়ি প্রাণিদের দলেরও ইচ্ছে জাগে শালোনিকার সাথে থেকে তাকে সাহায্য করতে। তারা বলে, আমরাও তো আর চাচ্ছি না যে এই শীতকালটা এতোটা সময় ধরে থেকে যাক। শীতে তো আমরা সবাই কাবু হয়ে পড়েছি। আমরা শীতের শেষে বসন্তকালকে আবার ফিরে পেতে চাই।
আহ, বসন্তঋতুটা যে কত বেশি সুন্দর। চারদিকে তখন অনেক ধরনের খাবার খুঁজে পাওয়া যাাবে। খাবারের তখন কোনো রকমের অভাব হবে না। অথচ এই শীতে তুষারে সমস্ত জায়গা ঢেকে আছে বলে কোথাও আর খাবার খুঁজে পাচ্ছি না। আর খাবার না পাওয়ার জন্য আমাদের যে খুবই অসুবিধে হচ্ছে।
শালোনিকা এবার পাহাড় চূড়োর প্রাসাদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। আর মাত্র কিছুটা পথ বাকি আছে।
শালোনিকা দেখলো, পথের সামনে নীলাভ রঙের দেয়াল। তার তখন মনে পড়ল শামান প্রধানের কথা। প্রাসাদটিকে ঘিরে রেখেছে ডাইনি শক্তির বলয়। তাহলে এসবই কি বলয়ের চিহ্ন। সেই বলয় কাটার জন্য শামান প্রধান তাকে একটি ছোট কুঁড়াল উপহার দিয়েছিল। শালোনিকা থলে থেকে তখন সেই কুঁড়ালটিকে বের করে। চকচক করছে কুঁড়ালটি। শালোনিকাকে শামানপ্রধান শিখিয়ে দিয়েছিল বলয় কাটার পদ্ধতি। শালোনিকা সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রাসাদ ঘিরে রাখা বলয়টাকে কুঁড়ালের সাহায্যে নিপুনভাবে কাটতে থাকে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সাহসী, বুদ্ধিমতি কিশোরী শালোনিকা ডাইনিদের তৈরি করা অশুভ শক্তির বলয়কে কেটে ফেলে অপসারণ করতে সক্ষম হয়। পাহাড়ি প্রাণিদের দলটি অবাক হয়ে শালোনিকার কাজ দেখে। এখন তারা উঁচুতে উঠে গিয়ে প্রাসাদে যেতে পারবে। নিশ্চিন্তে সেখানে পৌঁছাতে পারবে।
শালোনিকার সাথে চলছিল ইঁদুর, খরগোশ আর কাঠবিড়ালদের দলটি।
সবাই মিলে প্রাসাদের সামনে এসে দেখে যে প্রবেশপথটি বন্ধ। কাঠবিড়ালি তখন দেয়ালের ফোকর গলে ভেতর গিয়ে দেখে সেখানে সকলেই ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। জীবনের স্পন্দন নেই। সব শুনশান করছে। কাঠবিড়ালি দরজার পাহারাদারের কোমরে ঝোলানো চাবির গোছাটি নিয়ে আসে। শালোনিকা তখন কাঠবিড়ালিদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে দরজার ফুটোতে চাবি ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা খুলতে হয়। কাঠবিড়ালিদের দলটি চাবি দিয়ে আবার ভেতরে ঢুকে যায়। তারপর কাঠবিড়ালিরা দরজাগুলো খুলে ফেলে।
শালোনিকা তখন প্রাণিদের সাথে নিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করে। পুরো প্রাসাদ জুড়ে এক অদ্ভুত অবস্থা বিরাজ করছে। সবখানেই নীরবতা। শালোনিক প্রবাল পাথরের তৈরি সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পনে উপরে উঠে যায়। সম্রাটের শয়নকক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রহরীরা ঘুমিয়ে আছে। শালোনিকা সম্রাটের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। পুরু মখমল আচ্ছাদিত বিশাল বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন সম্রাট। ঋতু বদলের প্রতাপশালি সম্রাট কেমন অসহায়ের মতো ঘুমের গভির সাগরে ডুবে রয়েছেন। কতো দীর্ঘ সময় ধরেই না ঘুমুচ্ছেন তিনি। শালোনিকা সম্রাটের শিয়রের কাছে এসে দাঁড়ায়। তারপর তার ঝুলি থেকে শামান প্রধানের উপর দেয়া বলগা হরিণের শিঙ থেকে তৈরি সোনালি রুপুলি বাঁশিটিকে বের করে। তারপর সম্রাটের কানের কাছে মুখ নামিয়ে বাঁিশটিতে ফুঁ দেয়। তখন আশ্চর্য রকমের এক সুর সৃষ্টি হয়। সেই সুরের ঝঙ্কার যেন সম্রাটের হৃদয়তন্ত্রীতে গিয়ে দোলা দেয়। সম্রাটের বুঁজে থাকা চোখ দু’টো তখন ধীরে ধীরে খুলে যায়। সম্রাট এর দীর্ঘ ঘুম ভাঙে।
তিনি শালোনিকার মায়াবি মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে তুমি?’
শালোনিকা বলল, আমি শালোনিকা। এই পাহাড়ের নিচের দেশে আমি থাকতাম।
সম্রাট বিস্ময়ের সাথে বললেন: কিন্তু তুমি এখানে কী করতে এসেছো? কীভাবেই বা এসেছো?
এখানে আসতে পারাটা তো পৃথিবীর মানুষদের জন্য অসম্ভব ব্যাপার। এই প্রাসাদের আসতে হলে যে অনেক ধরনের বাধা ডিঙিয়ে আসতে হয়। তুমি তো একটি কিশোরী। কত বীর যোদ্ধারাই এখানে আসতে সাহস পায় না।
শালোনিকা বলল: কিন্তু আমি এখানে বাধ্য হয়ে এসেছি। আর এসেছি আপনার ঘুম ভাঙাতে। আপনি তো দীর্ঘসময় ধরে ঘুমিয়ে আছেন। মহামান্য সম্রাট, আপনার এই দীর্ঘ ঘুম আমাদের জন্য মহাবিপদ ডেকে এনেছে। আপনি হলেন ঋতু বদলের সম্রাট। যথাসময়ে পরপর ঋতুকে বদলে দেয়াটাই হচ্ছে প্রধান বিষয়। আপনি ঘুমিয়ে থাকার ফলে শীতঋতু আর বদলালো না। নিয়মানুযায়ী শীতের শেষে আর বসন্তকাল পৃথিবীতে দেখা দিলো না। যার ফলে শীত পৃথিবীতে স্থায়ী হয়ে রইল। এভাবে শীতের টিকে থাকার দরুন পৃথিবীতে বিপর্যয় নেমে এলো।
মানুষজনের জীবন ভয়ানক রকমের বিপন্ন হয়ে পড়ল। ডাইনিরা ষড়যন্ত্র করে এসব করেছে। আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। ঋতু বদলের সম্রাট তখন সমস্ত বিষয়টা বুঝতে পারলেন। তিনি হয়ে পড়েছিলেন ডাইনিদের ঘোরতর ষড়যন্ত্রের শিকার। সম্রাট তখন বিছানার পাশে রাখা বিশেষ ধরনের একটি বাদ্যযন্ত্র তুলে তা বাজাতে লাগলেন। সেই সুর মূর্ছনার প্রাসাদের সকলে জেগে উঠল। প্রাসাদে চাঞ্চলের সৃষ্টি হলো। সাড়া জাগল। সম্রাট প্রহরিদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা এখুনি শীতের ডাইনিগুলোকে বন্দি করে আনো। তাদেরকে কঠিন শাস্তি দাও। আগামী বছরের হেমন্তকালের শেষ দিন পর্যন্ত ডাইনিদের অন্ধকূপে বন্দি করে রাখো। আর এখনই আকাশটাকে পরিষ্কার করে দাও। স্বচ্ছ করে দাও। বসন্তকাল এর রূপ কে ছড়িয়ে দাও। সূর্যের তাপ বাড়িয়ে দাও। সেই তাপে বরফ গলে নদীতে গড়িয়ে যাবে। চারদিককে আলোময় করে তোল। ঋতু বদলের সম্রাটের প্রতিটি নির্দেশ তখন পালিত হলো।
চারপাশ প্রসন্ন হয়ে উঠল। ফুল ফুটল। পাখিরা ডাকল। আলোয় ভরে উঠল ভুবন। আলোর মাঝে প্রজাপতিরা রঙিন ডানা মেলল।
শালোনিকা ঋতু বদলের সম্রাটকে অজস্র ধন্যবাদ জানালো। আপনার ঘুম ভাঙাতে পৃথিবীটা পুনরায় সুন্দর হয়ে উঠল।
শালোনিকা পাহাড়ি প্রাণিদের সাথে করে তখন পাহাড় থেকে নেমে এলো। লোকজন তাদের অভিনন্দন জানালো। শিশুরা হাততালি দিচ্ছিল। সকলে শালোনিকার সাহসের প্রশংসা করতে থাকে। শামান প্রধান শালোনিকার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, আমি জানতাম যে তুমি শেষ পর্যন্ত ঋতু বদলের সম্রাটের ঘুম ভাঙাতে পারবে। সেদিন থেকেই দেশে বসন্তকাল শুরু হয়ে গেল। গাছে গাছে পাখি ডাকে। কত শোভা চারিপাশে।
লেখক- গবেষক, কলামিস্ট, মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান,সিলেট।