নাম, ঐতিহ্য, অনুদান ও শরয়ী বিবেচনা
মসজিদ শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়; এটি তাওহিদের কেন্দ্র, সালাতের স্থান, কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা বিস্তারের প্রতিষ্ঠান এবং মুসলিম সমাজের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের অন্যতম আশ্রয়স্থল।
১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদ প্রায় এক শতাব্দী ধরে স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও ঐতিহাসিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এর নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি নিছক একটি নাম বদলের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শরিয়তের দৃষ্টিতে নামের বিধান, তাওহিদ ও রেসালাতের শিক্ষা, ঐতিহাসিক পরিচয়, ভৌগোলিক বাস্তবতা, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্ন।
সম্প্রতি মসজিদের উন্নয়নের জন্য সরকারি পর্যায় থেকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা এবং একই সময়ে প্রচলিত নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
একটি প্রায় শতবর্ষী মসজিদের পরিচিত নাম পরিবর্তনের শরয়ী প্রয়োজন কী, বাস্তব প্রয়োজন কী এবং এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কী অর্জিত হবে?
১. তাওহিদ ও রেসালাতই মসজিদের প্রকৃত পরিচয়
ইসলামের মূল আকিদা হলো তাওহিদ—আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং ইবাদতের একমাত্র অধিকারী তিনিই।
আর তাওহিদের পথ মানুষকে দেখিয়েছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ।
তাই একটি মসজিদের প্রকৃত ইসলামী পরিচয় শুধু তার নামের মধ্যে কতগুলো আরবি বা ধর্মীয় শব্দ রয়েছে—তার ওপর নির্ভর করে না। বরং সেখানে কী আকিদা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে সালাত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কুরআন-সুন্নাহ কীভাবে চর্চা হচ্ছে এবং মুসলিম সমাজে তাকওয়া, নৈতিকতা ও ভ্রাতৃত্ব কতটা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে—তার ওপরই মূলত মসজিদের ইসলামী ভূমিকা নির্ভর করে।
অতএব ‘তাওহিদ’ শব্দটি মসজিদের নামে থাকা সুন্দর ও অর্থবহ হতে পারে; কিন্তু শুধু নামের মধ্যে ‘তাওহিদ’ শব্দ যুক্ত করলেই তাওহিদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।
রেসালাতের অনুসরণে তাওহিদ প্রথমে আকিদায়, তারপর আমলে প্রতিফলিত হতে হয়।
২. স্থাননাম ও ধর্মীয় পরিচয় এক বিষয় নয়
‘শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদ’ নামটি সাধারণ অর্থে মসজিদের ভৌগোলিক অবস্থান নির্দেশ করে—অর্থাৎ শ্রীমঙ্গল এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জামে মসজিদ।
এটি কোনো ধর্মীয় উপাসনার নাম নয় এবং নামটি উচ্চারণের মাধ্যমে কোনো দেবতা বা ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা হয় না।
সুতরাং কোনো শব্দের ভাষাগত উৎস এবং তার বর্তমান সামাজিক ব্যবহারকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
যদি কোনো নামের মধ্যে সরাসরি শিরক, কুফর, উপাসনা, আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপন অথবা স্পষ্ট নিন্দনীয় অর্থ থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই আলাদাভাবে শরয়ী বিচারের বিষয়।
কিন্তু কোনো শব্দ অন্য ভাষা থেকে এসেছে কিংবা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও ব্যবহৃত হয়—এটুকু দিয়ে সেই শব্দকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম ঘোষণা করা যায় না।
৩. ‘শ্রী’ ও ‘মঙ্গল’ সংস্কৃত উৎসের—তাহলে কি তা হারাম?
নাম পরিবর্তনের পক্ষে যে যুক্তি সামনে এসেছে, তার একটি হলো—‘শ্রী’ ও ‘মঙ্গল’ সংস্কৃত ভাষার শব্দ এবং এগুলোর সঙ্গে ভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে—
প্রথমত, শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক উৎস।
দ্বিতীয়ত, শব্দটির বর্তমান সামাজিক ও ভৌগোলিক ব্যবহার।
‘শ্রীমঙ্গল’ বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট শহর ও উপজেলার ভৌগোলিক নাম। একজন মানুষ যখন ‘শ্রীমঙ্গল’ বলেন, তখন তিনি কি কোনো দেবতার উপাসনা বা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় আকিদা ঘোষণা করছেন, নাকি একটি স্থানকে চিহ্নিত করছেন—এটাই মূল প্রশ্ন।
তাই শরয়ী আলোচনায় প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
‘শ্রীমঙ্গল’ নামটি বর্তমান ব্যবহারে কোন নির্দিষ্ট শিরকি আকিদা প্রকাশ করছে—তার সুস্পষ্ট দলিল কী?
শুধু শব্দের প্রাচীন উৎস দিয়ে বর্তমান ব্যবহারকে একই অর্থে বিচার করা সবসময় যথাযথ নয়।
৪. ‘হারাম’ ঘোষণা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমাদের জিহ্বা যে মিথ্যা বর্ণনা করে তার ভিত্তিতে বলো না—এটি হালাল এবং এটি হারাম—যাতে তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করো।” —সূরা আন-নাহল, ১৬:১১৬
অতএব কোনো বিষয়কে ‘হারাম’ বলা আবেগ বা অনুমানের বিষয় নয়।
কোনো নামের বিরুদ্ধে শরয়ী আপত্তি থাকলে তার অর্থ, উদ্দেশ্য, প্রচলিত ব্যবহার এবং আকিদাগত তাৎপর্য বিবেচনা করতে হবে।
শুধু—
সংস্কৃত শব্দ → ভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত → তাই মুসলমানের জন্য হারাম
—এই সরলীকৃত সূত্র দিয়ে একটি ভৌগোলিক নামকে হারাম সাব্যস্ত করা শরয়ীভাবে যথেষ্ট নয়।
৫. রাসুলুল্লাহ ﷺ নাম পরিবর্তন করেছেন—এখানে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
সুন্নাহতে নাম পরিবর্তনের একাধিক উদাহরণ রয়েছে। সহিহ মুসলিমে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ‘আসিয়া’ নাম পরিবর্তন করে ‘জামিলা’ রেখেছেন। একইভাবে ‘বাররাহ’ নাম পরিবর্তনের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে।
এসব ঘটনা থেকে অন্তত বোঝা যায়, নামের অর্থ ও তাৎপর্য ইসলামে বিবেচনার বিষয় হতে পারে।
কিন্তু এখান থেকে এমন কোনো সাধারণ বিধান তৈরি হয় না যে—
“যে নাম ইসলাম-পূর্ব কোনো ভাষা বা সংস্কৃতি থেকে এসেছে, মুসলমানদের তা অবশ্যই বাদ দিতে হবে।”
বরং দেখতে হবে—নামটি নিজেই কি শরিয়তবিরোধী কোনো অর্থ, বিশ্বাস বা ধর্মীয় প্রতীক বহন করছে?
এটাই অধিক সতর্ক ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি।
৬. মসজিদে কুবা: নামের চেয়ে তাকওয়াই মুখ্য
ইসলামী ইতিহাসে মসজিদে কুবা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
কুরআনে এমন একটি মসজিদের প্রশংসা করা হয়েছে, যা প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—সূরা আত-তাওবা, ৯:১০৮। তাফসিরে এই আয়াতের সঙ্গে মসজিদে কুবার সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মসজিদে নববীকেও তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করে সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—
মসজিদের মর্যাদা শুধু তার নামের বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়; তার তাকওয়া, উদ্দেশ্য ও আমলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কুবা একটি স্থাননাম হয়েও ইসলামের ইতিহাসে মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অতএব কোনো স্থাননামকে ইসলামী পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে সেই স্থাননাম অবশ্যই বিলুপ্ত করতে হবে—এমন কোনো সাধারণ নীতি ইসলামী ইতিহাস থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
৭. মক্কা, মদিনা, বদর ও উহুদ—স্থাননাম ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে
ইসলামী ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান তাদের ভৌগোলিক পরিচয় নিয়েই মুসলিম উম্মাহর স্মৃতি ও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
মক্কা, মদিনা, বদর, উহুদ ও কুবা—এসব নাম আজ মুসলমানদের ঈমানি ও ঐতিহাসিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখানে মূল শিক্ষা হলো—ইসলাম প্রতিটি পুরোনো ভৌগোলিক নাম মুছে ফেলার কোনো সাধারণ নীতি দেয়নি। বরং কোনো স্থান ইসলামী আকিদা, ইবাদত, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হলে সেই স্থাননামও ইসলামী ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ‘শ্রীমঙ্গল’ নামটির বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
৮. নাম পরিবর্তন করলেও ঠিকানা থেকে ‘শ্রীমঙ্গল’ বাদ যাবে না
এটি বিতর্কের অন্যতম বাস্তব প্রশ্ন।
ধরা যাক, ‘শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদ’-এর পরিবর্তে কোনো সুন্দর ইসলামী নাম রাখা হলো—যেমন ‘আর-রহমান জামে মসজিদ’ বা অন্য কোনো নাম।
তারপরও মসজিদের ঠিকানা হবে—
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।
অর্থাৎ নাম থেকে ‘শ্রীমঙ্গল’ বাদ দেওয়া গেলেও মসজিদের ভৌগোলিক অবস্থান থেকে শ্রীমঙ্গলকে বাদ দেওয়া যাবে না।
পুরোনো দলিল, নথি, সংবাদ, মানুষের স্মৃতি এবং ঐতিহাসিক পরিচিতিতেও পুরোনো নাম থেকে যাবে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—
শুধু মসজিদের নাম থেকে ‘শ্রীমঙ্গল’ শব্দ বাদ দিলে তাওহিদ বা ইসলামী আকিদার ক্ষেত্রে বাস্তব কী পরিবর্তন ঘটবে?
যদি উদ্দেশ্য হয় মসজিদের ইসলামী পরিচয় আরও স্পষ্ট করা, তাহলে প্রশ্ন হতে পারে—
সেই ইসলামী পরিচয় কি ‘শ্রীমঙ্গল’ ভৌগোলিক নাম অক্ষুণ্ণ রেখেও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়?
৯. ‘ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কর্তৃত্ব’—এই ধারণার শরয়ী ভিত্তি কী?
যদি বলা হয়, ‘শ্রীমঙ্গল’ নাম থাকলে এর মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কর্তৃত্ব বা প্রভাব প্রকাশ পায়, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—
একটি ভৌগোলিক নাম ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়?
একজন মুসলমান যখন বলেন—
“শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদ”
তখন তিনি কি কোনো ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করছেন?
নাকি তিনি শুধু মসজিদের অবস্থান জানাচ্ছেন?
দুটিকে এক করে দেখলে একটি সাধারণ স্থাননামকে ধর্মীয় আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই ‘কর্তৃত্ব’ বা ‘ধর্মীয় প্রভাব’-এর মতো গুরুতর দাবি করলে তারও সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক ও শরয়ী ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
১০. সরকারি অনুদানের বিষয়টি: সম্মান থাকবে, স্বচ্ছতাও থাকবে
মসজিদের উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য সরকারি পর্যায় থেকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ।
একই সময়ে প্রচলিত নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক।
এখানে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুলে একটি স্বচ্ছ প্রশ্ন রাখা যায়—
আর্থিক সহায়তা ও নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক শর্ত বা সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা কি পরিষ্কার করা হয়েছে?
যদি দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা হয়, তাহলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া ভালো।
আর যদি কোনো আর্থিক সহায়তার সঙ্গে নাম পরিবর্তনের শর্ত যুক্ত থাকে, তাহলে প্রশ্ন হবে—
একটি শতবর্ষী মসজিদের ঐতিহাসিক পরিচয় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কী এবং এর বাস্তব ধর্মীয় বা সামাজিক সুবিধা কী?
কারণ সরকারি সহায়তা বা অনুদান একটি স্বাগত বিষয়; কিন্তু তার সঙ্গে যদি কোনো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি স্বচ্ছতা, পরামর্শ ও সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করাই অধিক গ্রহণযোগ্য।
১১. নতুন ইসলামী নামের বিরোধিতা নয়
এখানে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান জরুরি।
কেউ যদি মসজিদের নামে তাওহিদ, সুন্নাহ, নূর, তাকওয়া বা অন্য কোনো সুন্দর ইসলামী শব্দ যুক্ত করতে চান, সেটি নিজে আপত্তিকর নয়।
কিন্তু নতুন নাম রাখা বৈধ কি না এবং পুরোনো নামটি হারাম বা অনৈসলামী কি না—এই দুটি প্রশ্ন এক নয়।
নতুন নাম রাখা যেতে পারে—যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় মুসল্লি ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ মতামত থাকে এবং তা আইনগত ও শরয়ী বিবেচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
কিন্তু পুরোনো নাম বাদ দেওয়ার জন্য আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে—
কেন বর্তমান নামটি রাখা শরিয়তসম্মত নয়?
১২. ঐতিহ্য সংরক্ষণ কি তাওহিদের বিরুদ্ধে?
একটি ঐতিহাসিক নাম সংরক্ষণের দাবি মানেই ইসলামী পরিচয়ের বিরোধিতা—এমন ধারণা সঠিক নয়।
একটি মসজিদ একই সঙ্গে—
- ঐতিহাসিক হতে পারে,
- ভৌগোলিক পরিচয় বহন করতে পারে,
- এবং তাওহিদের কেন্দ্র হতে পারে।
প্রায় এক শতাব্দীর একটি প্রতিষ্ঠানের নাম মানুষের স্মৃতি, নথি, ইতিহাস ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে গেলে তা পরিবর্তনের আগে বাস্তব প্রয়োজনও বিবেচনা করা উচিত।
ইসলামী পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য সবসময় ঐতিহাসিক পরিচয় মুছে ফেলতে হয় না।
১৩. তাহলে প্রকৃত অগ্রাধিকার কী?
যদি সত্যিই তাওহিদ ও রেসালাতের পরিচয় শক্তিশালী করাই লক্ষ্য হয়, তাহলে মসজিদে—
- বিশুদ্ধ আকিদার শিক্ষা,
- কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর পাঠ,
- নিয়মিত জামাত,
- যুবকদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা,
- শিরক ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা,
- দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা,
- মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি
—এসব কার্যক্রম শক্তিশালী করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ—
তাওহিদের নাম লেখা সহজ; তাওহিদের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
১৪. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি প্রশ্ন
শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদের নাম পরিবর্তনের আগে তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত—
১. বর্তমান নামটি শরিয়তবিরোধী—এর নির্দিষ্ট দলিল কী?
২. ‘শ্রীমঙ্গল’ শব্দটি বর্তমান ব্যবহারে কোন শিরকি আকিদা প্রকাশ করছে?
৩. শুধু সংস্কৃত উৎস বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত হওয়ার কারণে একটি ভৌগোলিক নাম কি হারাম হয়ে যায়?
৪. নাম পরিবর্তন করলে মসজিদের তাওহিদি পরিচয়ে বাস্তব কী পরিবর্তন হবে?
৫. মসজিদের ঠিকানা যেহেতু শ্রীমঙ্গলই থাকবে, তাহলে নাম থেকে ‘শ্রীমঙ্গল’ বাদ দেওয়ার বাস্তব সুবিধা কী?
৬. মসজিদের পুরোনো দলিল, নথি ও ঐতিহাসিক রেকর্ডে কোন নাম রয়েছে?
৭. সরকারি আর্থিক সহায়তা ও নাম পরিবর্তনের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বা শর্ত আছে কি না?
৮. স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-উলামা, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে কি?
এই প্রশ্নগুলো কাউকে হেয় করার জন্য নয়; বরং সিদ্ধান্তকে স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত, শরয়ীভাবে সতর্ক এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য।
পরিশেষে
শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদের নাম পরিবর্তনের প্রশ্নে অবস্থান হওয়া উচিত না অন্ধ সমর্থনের, না অন্ধ বিরোধিতার।
যারা মসজিদের নামের মধ্যে তাওহিদ ও রেসালাতের পরিচয় আরও স্পষ্ট করতে চান, তাদের উদ্দেশ্যকে সম্মান করা উচিত। একইভাবে যারা প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহাসিক নাম সংরক্ষণ করতে চান, তাদের শুধু এই কারণে ধর্মীয়ভাবে অভিযুক্ত করাও সমীচীন নয়।
‘শ্রী’ ও ‘মঙ্গল’ শব্দের ভাষাগত উৎস একটি বিষয়; কিন্তু ‘শ্রীমঙ্গল’ নামের বর্তমান ভৌগোলিক ব্যবহার শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম কি না—এটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।
শুধু কোনো শব্দ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ব্যবহারে আছে বলে সেটি মুসলমানের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায় না। কোনো নামের শরয়ী বিধান নির্ধারণে তার অর্থ, প্রচলিত ব্যবহার, উদ্দেশ্য ও আকিদাগত তাৎপর্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলামী ইতিহাসেও আমরা দেখি—কুবা, মক্কা, মদিনা, বদর ও উহুদের মতো স্থাননাম পরবর্তীতে ইসলামের ইতিহাস ও স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ইসলাম প্রতিটি পুরোনো ভৌগোলিক পরিচয় মুছে ফেলার কোনো সাধারণ নীতি দেয়নি; বরং কোনো স্থানকে তাওহিদ, তাকওয়া, ইবাদত ও ইসলামী চেতনার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
সুতরাং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
“শ্রীমঙ্গল নামটি কেন বাদ দিতে হবে—এর সুস্পষ্ট শরয়ী প্রয়োজন কী, বাস্তব সুবিধা কী এবং সামাজিক মূল্য কতটুকু?”
মসজিদের নাম পরিবর্তন করলেও যদি তার ঠিকানা শ্রীমঙ্গল থাকে, ইতিহাসে শ্রীমঙ্গল থাকে, নথিতে শ্রীমঙ্গল থাকে এবং মানুষের পরিচিতিতেও শ্রীমঙ্গল থাকে—তাহলে শুধু নামের একটি অংশ পরিবর্তনের মাধ্যমে কী অর্জিত হবে, সেটিও ভাবার বিষয়।
তাওহিদ প্রতিষ্ঠিত হোক আকিদায়,
রেসালাত প্রতিষ্ঠিত হোক অনুসরণে,
ইসলামী পরিচয় প্রকাশ পাক মসজিদের শিক্ষা ও আমলে,
আর ঐতিহ্য সংরক্ষিত হোক ন্যায়, পরামর্শ ও পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে।
কারণ একটি নাম পরিবর্তন করা সহজ; কিন্তু একটি সমাজের ঐতিহাসিক স্মৃতি, পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখা অনেক বড় দায়িত্ব।
শতবর্ষী শ্রীমঙ্গল জামে মসজিদ কোনো বিভেদের কারণ না হয়ে তাওহিদ, রেসালাত, ইবাদত, দ্বীনি শিক্ষা ও মুসলিম ঐক্যের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি: মুহাম্মদ আনিসুল ইসলাম আশরাফী
প্রধান সম্পাদক, আমার সিলেট টুয়েন্টিফোর ডটকম
সভাপতি, শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেস ক্লাব
