আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজেদের অত্যন্ত বিবেকবান, নীতিবান ও নিরপেক্ষ বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখা যায়—তাদের বিবেকেরও যেন দল, পক্ষ ও পছন্দ-অপছন্দ আছে। নিজের লোকের অন্যায় তাদের চোখে যুক্তিসঙ্গত; প্রতিপক্ষের সামান্য ভুলও তাদের কাছে মহাঅপরাধ।
এটি প্রকৃত বিবেক নয়। এটি সুবিধাবাদী বিবেকের অভিনয়।
প্রকৃত বিবেকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সে নিজের পক্ষের অন্যায় দেখেও অন্ধ থাকে না এবং প্রতিপক্ষের ন্যায়কে ঘৃণা করতে শেখে না। সত্য যদি নিজের বিপক্ষে যায়, তবুও সত্যকে সত্য বলার যে নৈতিক সাহস—সেখানেই বিবেকের প্রকৃত পরীক্ষা।
কিন্তু আমাদের সমাজে এর বিপরীত একটি প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। কেউ কেউ নিজেদের রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী, সামাজিক বলয় কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের মানুষের প্রতি এমনভাবে অনুগত হয়ে পড়েন যে, তাদের বিচারবোধের একটি অংশ যেন অকার্যকর হয়ে যায়।
মানবদেহের কোনো অঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলে সেখানে আঘাত লাগলেও স্বাভাবিক অনুভূতির মতো ব্যথা অনুভূত হয় না। চিন্তার জগতেও অনেকটা তেমনই একটি পক্ষাঘাত দেখা যায়। নিজের পক্ষের মানুষের অন্যায় যত বড়ই হোক, সেখানে তাদের বিবেকের কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না। কিন্তু একই কাজ যখন প্রতিপক্ষ করে, তখন সেই বিবেক হঠাৎ জেগে ওঠে—এবং কখনো কখনো অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এটাই হলো নৈতিক পক্ষাঘাত।
আর যখন এই পক্ষাঘাত ব্যক্তিগত পর্যায় ছাড়িয়ে দলগত রূপ নেয়, তখন জন্ম নেয় তথাকথিত “গ্যাং-মনস্তত্ত্ব”। সেখানে সত্য আর সত্য থাকে না; সত্য হয়ে যায়—“আমাদের পক্ষে যা সুবিধাজনক।” ন্যায় আর ন্যায় থাকে না; ন্যায় হয়ে যায়—“আমাদের লোকের স্বার্থ যেদিকে।”
একটি গ্যাং যেমন নিজেদের সদস্যের অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখতে চায় না, তেমনি এই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীও নিজেদের পছন্দের মানুষ বা গোষ্ঠীর ভুলকে ঢাকার জন্য যুক্তি, আবেগ, অপপ্রচার এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্যন্ত ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।
অনলাইন জগতে যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকাশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
একজন ব্যক্তি যদি কোনো দল, মত বা গোষ্ঠীর পক্ষ না নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক কথা বলেন, তখন অনেকেই সেটিকে পাশ কাটিয়ে যান। কেউ কেউ আবার দলবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে আক্রমণে নেমে পড়েন।
অথচ একই সময়ে কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক গোষ্ঠীর অন্ধ সমর্থক যদি ভিত্তিহীন, উসকানিমূলক কিংবা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ কোনো বক্তব্য দেন, তখন সেই গোষ্ঠীর লোকজন সম্মিলিতভাবে তাতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দিয়ে সেটিকে এমন এক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনই সত্যতার প্রমাণ!
কিন্তু শত শত লাইক কোনো মিথ্যাকে সত্য বানাতে পারে না। হাজারো শেয়ার কোনো অন্যায়কে ন্যায় বানাতে পারে না। আর একটি গ্যাংয়ের সম্মিলিত উল্লাস বিবেকের বিকল্প হতে পারে না।
সত্য কখনো ভোটের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না।
গোষ্ঠী নয়, নীতিই হোক বিচারকের আসনে
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু রাজনৈতিক বিভাজন নয়; বরং নৈতিকতার মানদণ্ডের বিভাজন।
আমরা একই কাজকে একেক পক্ষের জন্য একেকভাবে বিচার করতে শিখে গেছি। নিজের লোক করলে “ভুল”, প্রতিপক্ষ করলে “অপরাধ”; নিজের পক্ষ করলে “আন্দোলন”, অন্য পক্ষ করলে “নৈরাজ্য”; নিজের লোক বললে “মতপ্রকাশ”, প্রতিপক্ষ বললে “অপপ্রচার”—এই দ্বৈত মানদণ্ডই ধীরে ধীরে সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ—কোনোটিই স্থায়ী নীতির ওপর দাঁড়াতে পারবে না।
কারণ যে সমাজে ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বোধের সংজ্ঞা বদলে যায়, সেখানে ন্যায়বিচার কখনো স্থায়ী হতে পারে না।
ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি অপরাধের সংজ্ঞা বদলে যায়, বিচারবোধ বদলে যায়, সামাজিক নৈতিকতা বদলে যায়—তাহলে আমরা আসলে কোনো আদর্শের সমাজ তৈরি করছি না; আমরা কেবল এক গোষ্ঠীর জায়গায় আরেক গোষ্ঠীকে বসাচ্ছি।
আজ যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছে, কাল তারা ক্ষমতায় গিয়ে একই অন্যায় করলে যদি আমরা নীরব হয়ে যাই, তাহলে আমাদের প্রতিবাদও নীতির জন্য নয়—শুধু পক্ষের জন্য।
নিজের পক্ষের অন্যায়কে “অন্যায়” বলাই সবচেয়ে কঠিন
প্রতিপক্ষের ভুল ধরিয়ে দেওয়া খুব সহজ। কঠিন হলো নিজের প্রিয় মানুষের ভুল স্বীকার করা।
কারও বিরুদ্ধে সমালোচনা করা সহজ; কিন্তু নিজের দল, নিজের মতাদর্শ, নিজের গোষ্ঠী কিংবা নিজের প্রিয় ব্যক্তির অন্যায়কে অন্যায় বলা—সেখানেই চরিত্রের পরীক্ষা।
একজন সত্যিকারের বিবেকবান মানুষ বলবেন—
“সে আমার লোক হলেও অন্যায় করেছে।”
এবং একইভাবে বলবেন—
“সে আমার প্রতিপক্ষ হলেও এখানে সে ন্যায়ের পক্ষে।”
এই দুই বাক্য বলার মতো নৈতিক সাহস যার আছে, তিনিই প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ।
বাকি সবই অনেক সময় পক্ষপাতের পরিশীলিত সংস্করণ।
এই লেখা কারও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়
স্পষ্ট করে বলতে চাই—এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল, মত বা গোষ্ঠীকে টার্গেট করা নয়। এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও নৈতিক বাস্তবতার একটি বিশ্লেষণ।
একজন লেখক হিসেবে আমিও ভুলের ঊর্ধ্বে নই। আমার বিচারেও ভুল হতে পারে, আমার বক্তব্যেও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তাই নিজের মতকে চূড়ান্ত সত্য দাবি করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার চেষ্টা করা একজন লেখকের নৈতিক দায়িত্ব।
কোনো লেখা যদি কারও নিজের চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায় এবং তিনি মনে করেন লেখাটি তাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা—সেটি লেখকের উদ্দেশ্য নাও হতে পারে।
আয়না কারও মুখ তৈরি করে না; শুধু মুখটি যেমন, তেমনই দেখায়।
বিবেক কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়
মনে রাখতে হবে—বিবেক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার নয়, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদও নয়।
বিবেক হলো মানুষের ভেতরের সেই নৈতিক আলো, যা তাকে নিজের স্বার্থ, আবেগ, দলীয় আনুগত্য ও ব্যক্তিগত পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখায়।
নিজের লোকের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া আনুগত্য হতে পারে, কিন্তু তা নৈতিকতা নয়।
প্রতিপক্ষের ন্যায়কে স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই নৈতিক শক্তি।
আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেই কোনো অন্যায় ন্যায় হয়ে যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোলাহল সত্যের মানদণ্ড নয়। গ্যাংয়ের সম্মিলিত প্রচারণা বিবেকের সার্টিফিকেট নয়।
বিবেক কখনো দলকানা হতে পারে না।
বিবেক কোনো গোষ্ঠীর গোলাম হতে পারে না।
বিবেক সংখ্যার কাছে মাথা নত করে না।
প্রকৃত বিবেক বরং মানুষকে নিজের পক্ষের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর সাহস দেয়—যখন নিজের পক্ষ ভুল করে।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ প্রথমে জিজ্ঞেস করবে না—“কে করেছে?”
বরং জিজ্ঞেস করবে—“কী করেছে?”
প্রথম প্রশ্নটি গোষ্ঠী খোঁজে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি সত্য খোঁজে।
আর শেষ পর্যন্ত আমাদের লড়াই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; আমাদের লড়াই নিজের ভেতরের সেই পক্ষপাতের বিরুদ্ধে, যা সত্যকে নিজের সুবিধামতো দেখতে শেখায়।
আসুন, আমরা এমন বিবেকের চর্চা করি—যে বিবেক নিজের পক্ষের অন্যায়েও ব্যথা অনুভব করবে, প্রতিপক্ষের ন্যায়েও সত্যকে স্বীকার করবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের কোলাহলের মধ্যেও একা দাঁড়িয়ে সত্য বলার সাহস রাখবে।
আল্লাহ আমাদের এমন বিবেক দান করুন, যা সত্যকে চিনবে, সত্যকে গ্রহণ করবে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে—যদিও সেই সত্য আমাদের নিজেদের স্বার্থ, পক্ষ, দল বা প্রিয়জনের বিরুদ্ধে যায়।
আল্লাহ আমাদের সরল ও সঠিক পথে পরিচালিত করুন—যে পথে তিনি সন্তুষ্ট; যে পথে তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত সৎ ব্যক্তিগণ আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে গোঁড়ামি, অহংকার, পক্ষপাত, অন্ধ আনুগত্য ও সুবিধাবাদী মানসিকতা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের অন্তরকে সত্য গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করুন এবং অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখার সাহস দিন।
যারা সত্য থেকে বিচ্যুত, যারা অন্যায়কে সমর্থন করে এবং যারা গোষ্ঠীগত অন্ধত্বে নিজেদের বিবেককে বন্দী করে ফেলেছে—তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আর যদি আমরা নিজেরাই কখনো সেই পথে পা বাড়াই, তবে আমাদেরও সংশোধনের তাওফিক দিন।
আমাদের বিবেককে কোনো গ্যাংয়ের গোলাম নয়, সত্য ও ন্যায়ের অনুগত করুন।আমিন।
লেখক:
সাংবাদিক ও কলামিস্ট মুহাম্মদ আনিসুল ইসলাম আশরাফী
সম্পাদক, আমার সিলেট টুয়েন্টিফোর ডটকম
সভাপতি, শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেসক্লাব
