স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট নগর ও জেলার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ, অনটেস্ট এবং কাগজপত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সিএনজি চালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়মিত রুট পারমিট ও নিবন্ধনের বাইরে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা বিভিন্ন ‘টোকেন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়কে চলাচল করছে। এতে একদিকে যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সিএনজি চালিত ফোর-স্ট্রোক অটোরিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বর্তমানে ১৫ বছর। ২০০২ সালে পেট্রোলচালিত টু-স্ট্রোক অটোরিকশা তুলে দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা চালুর সময় এর প্রাথমিক আয়ুষ্কাল ৯ বছর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হয়।
প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সিএনজি অটোরিকশা ১৫ বছর পূর্ণ করলে তার বাণিজ্যিক চলাচলের অনুমতি বা রুট পারমিট আর নবায়ন করার কথা নয়। মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ডাম্পিং বা স্ক্র্যাপ করার পর ধ্বংস করা গাড়ির চেসিস ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের বিপরীতে নতুন গাড়ি প্রতিস্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
তবে সিলেটে এই নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সিলেটে বিআরটিএ অনুমোদিত সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ২০০ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে বিভিন্ন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও শ্রমিকদের দাবি, বর্তমানে সিলেট নগরীতে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে।
তাদের দাবি, নগর ও আশপাশের এলাকায় চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ হাজারের মতো হতে পারে। তবে এ সংখ্যার স্বাধীন সরকারি যাচাই পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নগরীতে প্রায় ৫০টি স্থানে অনুমোদনহীন বা অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড রয়েছে। এসব জায়গা থেকে বিপুলসংখ্যক গাড়ি নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বৈধ কাগজপত্র বা রুট পারমিট না থাকা অনেক অটোরিকশা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ‘টোকেন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়কে চলাচল করছে। তাদের দাবি, এমন গাড়ির সংখ্যা কয়েক দশ হাজার হতে পারে।
তবে ‘টোকেন’ কারা দিচ্ছে, এর আইনগত ভিত্তি কী এবং এর মাধ্যমে কোনো গাড়ি চলাচলের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সিএনজি মালিকদের একটি অংশের অভিযোগ, টোকেন থাকার কারণে কিছু গাড়ি নিয়মিত ট্রাফিক তল্লাশি বা আইনি ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বা ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শোরুম থেকে কেনার পর নিবন্ধন সম্পন্ন না হওয়া কিছু সিএনজি অটোরিকশা ‘অনটেস্ট’ পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে সড়কে চলাচল করছে। আইন অনুযায়ী একটি অস্থায়ী বা নির্দিষ্ট মেয়াদের অনুমতির সুযোগ থাকলেও সেটিকে বছরের পর বছর ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্থান থেকে চুরি হওয়া সিএনজি অটোরিকশা সিলেটে এসে ‘অনটেস্ট’ বা স্থানীয়ভাবে ‘রিফুজি’ নামে চলাচল করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের গাড়ির সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে। তবে চোরাই গাড়ির প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে পুলিশ ও বিআরটিএর সমন্বিত তথ্য প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশা চালানোর ক্ষেত্রে ভুয়া নিলাম বা ‘অকশন’ কাগজ ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। কিছু মালিকের দাবি, পুরোনো গাড়িকে বৈধ দেখাতে নিলামের কাগজপত্রের অপব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে এসব কাগজের বৈধতা যাচাই এবং প্রকৃতপক্ষে ভুয়া নথি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়।
সিএনজি অটোরিকশার মালিকদের একটি অংশের অভিযোগ, একটি বৈধ নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক—কখনো ৮ থেকে ১০টি পর্যন্ত—গাড়ি চলাচল করছে। এমনটি হয়ে থাকলে তা পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
এ অবস্থায় বৈধ কাগজপত্র থাকা মালিকরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তাদের দাবি, অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বৈধ গাড়ির চালক ও মালিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
সিলেট নগরীতে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি রাস্তার ওপর যত্রতত্র সিএনজি অটোরিকশার অবস্থান ও যাত্রী ওঠানামা যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয়দের কাছে আলোচিত। বিশেষ করে অনুমোদনহীন স্ট্যান্ডগুলো সড়কের জায়গা দখল করে থাকলে তা পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনিবন্ধিত গাড়ির ফিটনেস, ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর রয়েছে, সেটিও জননিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
সিলেটে প্রকৃতপক্ষে কতটি সিএনজি অটোরিকশা বৈধভাবে চলাচল করছে, কতটি মেয়াদোত্তীর্ণ, কতটি অনটেস্ট এবং কতটি চোরাই—এ বিষয়ে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
একই সঙ্গে অনুমোদিত ও অননুমোদিত স্ট্যান্ডের তালিকা, রুট পারমিট, ফিটনেস, নিবন্ধন এবং কথিত ‘টোকেন’ ব্যবস্থার আইনগত ভিত্তি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত উল্লিখিত সংখ্যা ও অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
