শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: শ্রীমঙ্গলে তাজা মুরগির আড়ালে মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগে পোলট্রি প্রতিষ্ঠান ‘ফ্যামিলি বাজার’কে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। জরিমানার পর প্রতিষ্ঠানের মালিক সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও তাঁর নিজের স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের স্টাফদের মাধ্যমে মৃত মুরগি বিক্রির বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে আইনগত প্রশ্নের পাশাপাশি বিষয়টি ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল শহরের নতুন বাজারে অবস্থিত ‘ফ্যামিলি বাজার’ (পরিচালনায়: বিসমিল্লাহ পোল্ট্রি হাউজ)-এর প্রোপাইটর মোঃ মাসুমুর রশিদের প্রতিষ্ঠানে তাজা মুরগির আড়ালে মরা মুরগি বিক্রি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেন শ্রীমঙ্গলের স্থায়ী বাসিন্দা ও সাংবাদিক রোমানা আক্তার শিপা।
অভিযোগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিওচিত্র সংযুক্ত করে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ আগস্ট মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মোঃ আল আমিনের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে অভিযুক্ত পক্ষের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪৫ ধারায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তার অধিকার রক্ষায় এ ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না। একই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটলে আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ৫৩ ধারার আওতায় প্রতিষ্ঠান বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
ঘটনার দুই দিন পর গত ১৫ আগস্ট রাতে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ফ্যামিলি বাজারের প্রোপাইটর মোঃ মাসুমুর রশিদ (মাসুম)। সেখানে তিনি নিজের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেন এবং দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার দাবি করেন।
তবে তাঁর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যের একটি অংশে প্রতিষ্ঠানের স্টাফদের মাধ্যমে মৃত মুরগি বিক্রির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
মালিকের স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, গরম বা পরিবহনজনিত কারণে কোনো মুরগি মারা গেলে তাঁর প্রতিষ্ঠানের স্টাফরা সেসব মৃত মুরগি আলাদা স্থানে সংরক্ষণ করতেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও দাবি করেন, কিছু ক্রেতা গৃহপালিত কুকুরের খাবার কিংবা চিড়িয়াখানার পশুর খাদ্য হিসেবে এসব মৃত মুরগি কম দামে কিনতেন। অনেক সময় ক্রেতারা দোকানের স্টাফদের কাছ থেকে এসব মুরগি নিয়ে যেতেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ওই বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—মালিক দাবি করেছেন, এসব মৃত মুরগির ক্রয়-বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং মৃত মুরগি বিক্রি করে পাওয়া টাকা স্টাফরা নিতেন; তিনি বা প্রতিষ্ঠান ওই টাকা নিত না।
অর্থাৎ মালিকপক্ষের লিখিত বক্তব্যে মৃত মুরগি বিক্রির ঘটনাটি অস্বীকার করা হয়নি; বরং বিক্রির সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও মালিকের আর্থিক সম্পৃক্ততা ছিল না—এমন দাবি করা হয়েছে।
দায় কার—প্রশ্ন উঠছে সেখানেই
মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত মুরগি বিক্রির অর্থ তিনি নিতেন না। কিন্তু একই বক্তব্যে তাঁর প্রতিষ্ঠানের স্টাফদের মৃত মুরগি সংরক্ষণ ও বিক্রির বিষয়টি উঠে এসেছে।
ফলে প্রশ্ন হচ্ছে—একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কোনো পণ্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করলে এবং মালিক বিষয়টি জানলে, শুধু বিক্রির অর্থ মালিক গ্রহণ করেননি—এ কারণে কি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও তদারকির প্রশ্ন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়?
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। ফলে বিষয়টি শুধু কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মালিক অভিযোগ করেন, সাংবাদিক রোমানা আক্তার শিপা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই সাংবাদিক নিজেই দোকানে এসে কম দামে তিনটি মৃত মুরগি কিনে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে এবং ১৩ আগস্টের ঘটনাটিও সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।
তবে এসব অভিযোগ মালিকপক্ষের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অভিযোগকারী সাংবাদিকের বক্তব্য ও এ দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন তদন্তের ফল পাওয়া গেছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাইয়ের বিষয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রায় ছয় মাস আগে তাঁর প্রতিষ্ঠানে পচা গরুর মাংস রাখার অভিযোগে ৫ হাজার টাকা জরিমানার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
মালিক দাবি করেন, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি বস্তায় পচা মাংস রেখে পালিয়ে গিয়েছিল এবং ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এমনটি করে থাকতে পারে।
তবে ওই দাবির সত্যতা বা এর পক্ষে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন/প্রমাণ রয়েছে কি না, তা মালিকের বক্তব্যের বাইরে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উপরোক্ত ঘটনায় ইসলামিক ফকিহদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাইতাহ বা শরিয়াহসম্মত জবাই ছাড়া মৃত প্রাণী।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে মৃত প্রাণীকে হারাম করেছেন। আর রাসুলুল্লাহ ﷺ সরাসরি মৃত পশু বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মৃত পশু, মদ, শূকর ও মূর্তি বিক্রি নিষিদ্ধ করেছেন। এমনকি মৃত পশুর চর্বি অন্য কাজে ব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠলেও তিনি তা নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছেন।
এ কারণে মৃত মুরগিকে মানুষের খাদ্য হিসেবে বিক্রি করা তো বটেই, মৃত প্রাণীর বিক্রয় থেকে অর্থ উপার্জনের বিষয়টিও সাধারণভাবে শরিয়াহর নিষিদ্ধ বেচাকেনার আওতায় পড়ে। হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববীর উদ্ধৃত মত অনুযায়ী মৃত প্রাণী, মদ ও শূকর বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ফ্যামিলি বাজারের মালিক দাবি করেছেন, এসব মৃত মুরগি মানুষের খাদ্য হিসেবে নয়, কুকুর বা চিড়িয়াখানার প্রাণীর খাদ্য হিসেবে বিক্রি করা হতো। তাই প্রতিবেদনে এই দাবিটিও যথাযথভাবে উল্লেখ করা হলো।
মালিক টাকা না নিলেও শরিয়াহর প্রশ্ন কেন থাকছে
এখানে মালিকের একটি বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ—তিনি মৃত মুরগি বিক্রির টাকা নিজে বা প্রতিষ্ঠান নিতেন না; স্টাফরা নিতেন।
কিন্তু ইসলামি নীতিতে শুধু অর্থ কে গ্রহণ করেছে—এটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অন্যকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না।”
—সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:২।
অর্থাৎ কোনো নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষ সহযোগিতা করা এবং তা চলতে দেওয়া শরিয়াহর দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয়। ইসলামি ফিকহের আলোচনায়ও নিষিদ্ধ কাজে সহযোগিতাকে এই আয়াতের আওতায় ধরা হয়েছে। ইসলামি ফতোয়া-ভিত্তিক ব্যাখ্যাগুলোতে বলা হয়েছে, কেউ যদি কোনো হারাম কাজে অন্যকে সহায়তা করেন—অর্থ, শারীরিক সহায়তা বা অন্য কোনো কার্যকর সহযোগিতার মাধ্যমে—তাহলে তা গুনাহের সহযোগিতার মধ্যে পড়তে পারে।
তাই মালিক নিজে টাকা না নিলেও, তাঁর নিজের লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী তিনি যদি প্রতিষ্ঠানের স্টাফদের মৃত মুরগি সংরক্ষণ ও বিক্রির বিষয়টি জানতেন, তাহলে এটি বন্ধ করা, কর্মচারীদের নিষেধ করা এবং প্রতিষ্ঠানের আওতায় এমন বিক্রি না হতে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ত কি না—এ প্রশ্নটি শরিয়াহর নীতির আলোকে সামনে আসে।
ইসলামি শিক্ষাবিদদের ফিকহি ব্যাখ্যায় বলেন-
ইসলামি ফিকহের আলোচনায় এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
প্রথমত, মৃত প্রাণীর বিক্রয়। সহিহ হাদিসে মৃত প্রাণী বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ায় এর বেচাকেনা থেকে অর্থ উপার্জনের বৈধতা নিয়ে গুরুতর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অন্যের মাধ্যমে নিষিদ্ধ কাজ করানো বা চলতে দেওয়া। ইসলামি শিক্ষাবিদদের ফতোয়া-ভিত্তিক ব্যাখ্যায় সূরা আল-মায়িদাহ ৫:২-এর আলোকে হারাম কাজে সহযোগিতা নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। ইসলামওয়েবের একটি ফতোয়ায় হারাম পণ্য বিক্রিতে সহযোগিতাকেও নিষিদ্ধ সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কর্মচারীর প্রতিটি ব্যক্তিগত অপরাধের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকের ওপর বর্তাবে। কর্মচারী নিজ উদ্যোগে কিছু করলে তার ব্যক্তিগত দায় তার নিজের। কিন্তু মালিক জানার পরও অনুমতি দিলে, সহযোগিতা করলে, ব্যবস্থা না নিয়ে তা চলতে দিলে অথবা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চলতে দিলে তাঁর নিজের জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি হয়। এ পার্থক্যটি ফিকহের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যামিলি বাজারের বিরুদ্ধে ১৩ আগস্টের অভিযোগের পর ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে এবং পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
এরপর ১৫ আগস্ট মালিক সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু একই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তাঁর নিজের স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের স্টাফদের মৃত মুরগি আলাদা করে রাখা ও তা বিক্রির বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, ওই বিক্রির অর্থ তিনি বা প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করতেন না; স্টাফরা নিতেন।
ফলে বিষয়টি এখন শুধু ভোক্তা-অধিকারের জরিমানা বা ব্যবসায়িক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক জেনেও তাঁর অধীনস্থদের মাধ্যমে নিষিদ্ধ বা অনৈতিক কোনো বেচাকেনা চলতে দিলে তার নৈতিক ও শরিয়াহগত দায় কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
চূড়ান্তভাবে আইনগত দায় নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আদালত এবং নির্দিষ্ট শরিয়াহগত প্রয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য আলেম/মুফতির মতামতই প্রাধান্য পাবে। তবে মৃত প্রাণীর বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে সহিহ হাদিস এবং হারাম কাজে সহযোগিতা না করার কুরআনিক নীতির আলোকে বিষয়টি যে ইসলামি নৈতিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, তা স্পষ্ট। নিউজ আপডেট
