আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক (সুনামগঞ্জ): সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা—অভিজ্ঞ, পরীক্ষিত ও তৃণমূলভিত্তিক কোনো নেতাকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের নাম।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কারণে তার সমর্থকদের একটি অংশ তাকে মন্ত্রিসভায় দেখতে চান।
ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৫ আসনটি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকা। এ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসও বেশ বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এখানে জয়লাভ করেছেন।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বিজয়ী হন। একই বছরের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মুহিবুর রহমান মানিক জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন।
এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মিলন। আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা ও নানা রাজনৈতিক সংকটের সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়েও সাংগঠনিক দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। ফলে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; সংগঠন পরিচালনা ও তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে তার বিজয়কে অনেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নতুন স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সংসদে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে ছাতক-দোয়ারাবাজারের ভোটাররা তার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন বলে মনে করছেন তার সমর্থকরা।
সুনামগঞ্জের বাস্তবতা অন্য অনেক জেলার চেয়ে আলাদা। বিশাল হাওরাঞ্চল, নদী, সীমান্ত, কৃষি ও মৎস্যনির্ভর অর্থনীতি, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট—সব মিলিয়ে এ জেলার মানুষের সমস্যা বহুমাত্রিক।
বর্ষাকালে অনেক এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কৃষকের জীবন অনেকাংশেই নির্ভর করে আবহাওয়া ও হাওরের ফসলের ওপর। অকালবন্যা কিংবা বাঁধ ভেঙে গেলে এক মৌসুমের ফসল হারিয়ে বিপাকে পড়েন হাজার হাজার কৃষক ও তাদের পরিবার।
অন্যদিকে ছাতক একটি ঐতিহাসিক শিল্পাঞ্চল। শিল্প, রেল যোগাযোগ, নদীপথ ও সীমান্তবাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জাতীয় পর্যায়ের কার্যকর উদ্যোগ। দোয়ারাবাজারেও কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
এ কারণে সুনামগঞ্জবাসীর একটি অংশ মনে করেন, সংসদে জেলার একজন অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিনিধি আরও বড় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে এলে জেলার উন্নয়ন ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক সামছুর রহমান সামছু, যুগ্ম আহ্বায়ক শামছুর রহমান বাবুল, ইউপি বিএনপির নেতা নজির আহমদ, উপজেলা বিএনপির সদস্য আশরাফুর রহমান এলাম, বিএনপি নেতা সাদিকুর রহমান সাদিক, এমাদ উদ্দিন এমাদ, সাবেক ছাত্রদল নেতা আমিন উদ্দিনসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হলে সুনামগঞ্জের মানুষ উপকৃত হতে পারেন।
তবে মন্ত্রিত্ব কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তাই যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতাই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। সেই বিবেচনায় কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি তার সমর্থকদের কাছে শুধু রাজনৈতিক আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সুনামগঞ্জের উন্নয়ন-প্রত্যাশার বিষয়টিও যুক্ত বলে তারা মনে করেন।
হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি ও মৎস্য খাতের আধুনিকায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ছাতকের শিল্প সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার।
স্থানীয়দের মতে, জাতীয় নীতিনির্ধারণের টেবিলে এসব বিষয় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে সুনামগঞ্জের একজন শক্তিশালী প্রতিনিধি প্রয়োজন।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সুনামগঞ্জ থেকে একজন পূর্ণ মন্ত্রী পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে জেলার মানুষের মধ্যে। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে বলে জানান তার সমর্থকরা।
তাদের ভাষ্য, এটি শুধু একজন নেতার পদ-পদবি পাওয়ার দাবি নয়; বরং হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-সংকট, সম্ভাবনা ও মানুষের প্রত্যাশাকে জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
সুনামগঞ্জের মানুষ এখন দেখতে চান—তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি শুধু সংসদেই নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও জেলার মানুষের কথা বলার সুযোগ পান। কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে কাজে লাগানো হলে তা সুনামগঞ্জের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা ছাতক-দোয়ারাবাজারের তার সমর্থকদের।
হাওরাঞ্চলের মানুষের ভাষায়, সময় এসেছে সুনামগঞ্জকে আরও গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়নের। আর সেই মূল্যায়নের অংশ হিসেবে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে মন্ত্রিসভায় দেখার প্রত্যাশাই এখন অনেকের মুখে মুখে।
