ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: নিজের বসতভিটা থাকা সত্ত্বেও প্রায় ছয় বছর ধরে বাড়িছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ৭২ বছর বয়সী মো. মস্তাব আলী। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ঘর ভাঙচুর করে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর গত ৭ সেপ্টেম্বর নিজ ভিটায় ঘর তুলতে গিয়ে তিনি ফের বাধার মুখে পড়েন। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মস্তাব আলীর অভিযোগ ও মামলা প্রসঙ্গ
মস্তাব আলীর অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর বসতঘর ও দরজা ভাঙচুর করে তাঁকে স্ত্রী-সন্তানসহ তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি ছাতক থানায় অভিযোগ করলে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি মামলা (নম্বর ০৬(০২)২১) রুজু হয়। মামলা দায়েরের পর বিবাদীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠায় নিরাপত্তাহীনতায় তিনি নিজ ভিটায় ফিরতে পারেননি। বাধ্য হয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রেলওয়ের একটি পরিত্যক্ত ঘরে দীর্ঘ সময় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাঁকে।
নিজেকে বিএনপির একজন কর্মী দাবি করে মস্তাব আলীর অভিযোগ, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান এবং সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবু সাদাত মোহাম্মদ লাহিনের নাম এবং তাঁদের অনুসারীদের ইন্ধনে তাঁকে বাড়িছাড়া করা হয়েছিল।
৭ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া ঘটনা
দীর্ঘদিন পর গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজ বসতভিটায় ঘর নির্মাণ করতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে মারধরের চেষ্টা করেন বলে দাবি করেন মস্তাব আলী। আশপাশের লোকজনের হস্তক্ষেপে তিনি সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও তাঁকে নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি ছাতক থানায় স্থানীয় সমুজ আলীসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে একটি লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযুক্ত ছয়জন হলেন—ছাতক উপজেলার সৈয়দেরগাঁও ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও (তকিপুর) গ্রামের সমুজ আলী (৪০), লায়েক (৩৫), রাসেল (৩২), মতছির (৫০), মর্তুজ আলী (৩৩) ও বুলবুল (৩০)।
জমির মালিকানা ও প্রতিপক্ষের দিক
অভিযোগপত্রে মস্তাব আলী দাবি করেছেন, ব্রাহ্মণগাঁও মৌজার জেএল নম্বর-২৪২ (হালে ১৭৩), খতিয়ান নম্বর-২৭, নামজারি খতিয়ান নম্বর-১৩ এবং দাগ নম্বর-১৫ (হালে ৪৪) এর ভূমিটি তাঁর মৌরসি ও খরিদা সূত্রে দখলীয় সম্পত্তি। সম্প্রতি তিনি ভূমিটি নিজের নামে নামজারিও করেছেন।
তবে ঘটনাটির অনুসন্ধানে ভিন্ন দিকও উঠে এসেছে। অভিযোগে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের অনেকেই মস্তাব আলীর সৎভাই, চাচাতো ভাই কিংবা ভাতিজা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জটিলতাও রয়েছে। অভিযুক্ত পক্ষ বা তাঁদের স্বজনদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ পারিবারিক বা সম্পত্তিগত বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়, যাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগে তৎকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নাম আসলেও তাঁদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বা অন্য নেতাদের তরফ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য
ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান মিজান লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ২০২০ সালের মামলাটির বর্তমান আইনি অবস্থা, জমির বৈধ কাগজপত্রের সঠিক মূল্যায়ন এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে। অন্যদিকে, ৭২ বছর বয়সী মস্তাব আলী বর্তমানে প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও নিজ ভিটায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
@@@@@@
বিএনপি করার ‘অপরাধে’ ৬ বছর বাড়িছাড়া!
ছাতকে ৭২ বছরের মস্তাবের ঘর ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ
সাবেক এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের নাম জড়িয়ে বিস্ফোরক দাবি; ৭ সেপ্টেম্বর ফের ভিটায় ঘর তুলতে গিয়ে হামলার অভিযোগ, ১২ সেপ্টেম্বর থানায় ৬ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি :: নিজের বসতভিটা থাকা সত্ত্বেও প্রায় ছয় বছর ধরে বাড়িছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন ৭২ বছর বয়সী মো. মস্তাব আলী। বিএনপির রাজনীতি করার কারণে তাঁর বসতঘর ভাঙচুর করে স্ত্রী-সন্তানসহ তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর নিজ ভিটায় ফিরে ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সেখানে ফের বাধার মুখে পড়েছেন বলে দাবি তাঁর।
মস্তাব আলীর অভিযোগ, গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকালে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজ বসতভিটায় ঘর নির্মাণ করতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে মারধরের উদ্দেশ্যে হামলার চেষ্টা করেন। তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাঁকে রক্ষা করেন। এরপরও তাঁকে সুযোগমতো মারধর ও খুন-জখম করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে ছাতক থানায় স্থানীয় সমুজ আলীসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মস্তাব আলী।
থানায় দেওয়া অভিযোগে মস্তাব আলী উল্লেখ করেন, ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর বসতঘর ও দরজা ভাঙচুর করে স্ত্রী-সন্তানসহ তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি ছাতক থানায় অভিযোগ করেন। পরে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছাতক থানার মামলা নম্বর ০৬(০২)২১ রুজু হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মস্তাব আলীর দাবি, মামলা দায়েরের পর বিবাদীরা তাঁর ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি হত্যার হুমকি দিতে থাকেন। এ কারণে নিরাপত্তাহীনতায় তিনি নিজ বসতভিটায় ফিরতে পারেননি। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ সময় রেলওয়ের একটি পরিত্যক্ত ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
অভিযোগে মস্তাব আলী নিজেকে বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তৎকালীন সময়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁর অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান এবং সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবু সাদাত মোহাম্মদ লাহিনের নাম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাঁকে হয়রানি করে বাড়িছাড়া করেছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগপত্রে মস্তাব আলী তাঁর বসতভিটার জমির বিস্তারিত তফসিলও উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও মৌজার জেএল নং-২৪২, হালে ১৭৩, খতিয়ান নং-২৭, নামজারি খতিয়ান নং-১৩, দাগ নং-১৫, হালে ৪৪ নম্বর দাগের ভূমিটি তাঁর মৌরসি ও খরিদা সূত্রে দখলীয় সম্পত্তি। সম্প্রতি তিনি ওই ভূমি নিজের নামে নামজারিও করেছেন বলে অভিযোগে দাবি করেছেন।
লিখিত অভিযোগে অভিযুক্ত ছয়জন হলেন—ছাতক উপজেলার সৈয়দেরগাঁও ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও (তকিপুর) গ্রামের সমুজ আলী (৪০), লায়েক (৩৫), রাসেল (৩২), মতছির (৫০), মর্তুজ আলী (৩৩) ও বুলবুল (৩০)।
মস্তাব আলীর অভিযোগ করা ঘটনাগুলোর বিষয়ে স্থানীয় মরম আলী, সজ্জাদ আলী, মুক্তা বেগম ও হুসনা বেগমসহ কয়েকজন ঘটনার বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন এবং অভিযোগের কিছু বিষয় সম্পর্কে সত্যতা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি পারিবারিক বিরোধ?
ঘটনাটিকে ঘিরে উঠেছে ভিন্ন প্রশ্নও। মস্তাব আলী একদিকে বিএনপির রাজনীতি করার কারণে বাড়িছাড়া ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, তাঁর অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজনকে তাঁর সৎভাই, চাচাতো ভাই ও ভাতিজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নাকি এর পেছনে পারিবারিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, জমির কাগজপত্র যাচাই, পূর্বের মামলার নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
পুলিশের বক্তব্য
ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ মিজানুর রহমান মিজান মস্তাব আলীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগটি পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “অভিযোগটি তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশের তদন্ত শেষ হলে ২০২০ সালের ঘটনার প্রকৃত কারণ, ৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে কোনো বিরোধ রয়েছে কি না এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
এদিকে, প্রায় ছয় বছর ধরে নিজ বসতভিটায় ফিরতে না পারার অভিযোগ তুলে ৭২ বছর বয়সী মস্তাব আলী এখন প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও নিজের ভিটায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ দাবি করেছেন।
