ছাতক সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: হাজার কোটি টাকার আধুনিক প্রযুক্তির বিশাল কারখানা। কাজ শেষ দেড় বছর আগেই। যন্ত্রপাতি লাগানো আছে, স্থাপনকাজ শেষ, ট্রায়াল রানও চলছে নিয়মিত। অথচ উৎপাদন শুরু হচ্ছে না একদিনের জন্যও। কারণ—গ্যাস নেই, চুনাপাথর নেই। ফলে ধীরে ধীরে জং ধরছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের নতুন প্ল্যান্টে।
প্রকল্পের ব্যয় ১৪১৭ কোটি, বাস্তব অগ্রগতি ৯০%—তবু থেমে আছে উৎপাদন ২০১৬ সালে ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তর (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় বিসিআইসি।
প্রথমে ব্যয় ধরা হয় ৬৬৭ কোটি টাকা। পরে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯০ কোটি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ মে ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯০.৭০ শতাংশ। কিন্তু আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৮.৬৭ শতাংশ। কারণ রোপওয়ে ও গ্যাসলাইন—দুই প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থার কাজই বন্ধ।
ভারতীয় অংশে রোপওয়ে নির্মাণে জটিলতা—অপর দিকে বাংলাদেশ অংশ ভেঙে বিক্রি
১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাতক সিমেন্ট বহু বছর ধরে ভারতের মেঘালয়ের কোমোরাহ লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি (কেএলএমসি) থেকে রোপওয়ের মাধ্যমে চুনাপাথর আনত। ১৭ কিলোমিটারের এই রোপওয়ের মধ্যে ১১ কিলোমিটার বাংলাদেশে এবং ৪.৬ কিলোমিটার ভারতে।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ অংশের রোপওয়ে ভেঙে বিক্রি করে দেওয়া হয়। নতুন করেরোপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে থাকলেও ভারতের অনুমতি না পাওয়ায় পাঁচ বছরেও কাজ শুরু হয়নি।
কেএলএমসি বলছে, তারা চীনা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে রাজি নয়। ভারতও আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সংশ্লিষ্টতা চায় না। ফলে চুক্তি সংশোধন, অনুমতি, কূটনৈতিক জট—সব মিলিয়ে নতুন রোপওয়ে কাজ ক্রমে অনিশ্চয়তায়। কেএলএমসি আবার বলছে, সাধারণ ঠিকাদারের অর্থ থেকে তাদের অনুকূলে এলসি খুলে দিলেই তারা কাজ শুরু করবে। এর জন্য প্রয়োজন নতুন চুক্তি, আর তাতে লাগবে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত।
ফলে কবে রোপওয়ে হবে—কেউ জানে না।
গ্যাসলাইনেও জটিলতা: ৪৩ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের অনুমতি মেলেনি।ড্রাই প্রসেস প্ল্যান্ট চালু করতে আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি গ্যাস প্রয়োজন। বিদ্যমান লাইন এ চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই ৪৩ কিলোমিটার নতুন গ্যাস সঞ্চালন লাইন প্রয়োজন। ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।
কিন্তু এখনো পেট্রোবাংলার অনুমোদন মিলেনি। জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে—গ্যাসের নিশ্চয়তা না পেলে সংযোগলাইন স্থাপন সম্ভব নয়। বিসিআইসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গাজী কামরুল হোসেন বলেন—“টাকা পেয়েছি, লাইন টানার প্রস্তুতিও আছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগের অনুমতি মিলছে না। ফলে পুরো প্রকল্পই ঝুলে আছে।”
চুনাপাথরের প্রয়োজনীয়তা: দেশে জালালাবাদ খনিসম্পদ পড়ে আছে, তবু আমদানি নির্ভরতা
বিশেষজ্ঞদের দাবি—বাংলাদেশে সিলেটের জালালাবাদ এলাকায় বড় আকারের চুনাপাথর খনি রয়েছে। ৬৭৫ একর জমিতে উত্তোলন সম্ভব। কিন্তু সরকার তথ্য গোপন রেখে অতীতে ভারতের ওপর নির্ভর করেছে।
ফলে দেশি সম্পদ অক্ষত থাকা অবস্থায় বিদেশি আমদানিনির্ভর কাঠামোতে ছাতক সিমেন্ট বহু বছর চলে গেছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—
দেশে খনি থাকা সত্ত্বেও কেন এত বছর বিদেশের ওপর নির্ভরতা? দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করলে চাকরি, রাজস্ব, উন্নয়ন—সবই বাড়ত। নতুন কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা তিনগুণ—ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নষ্ট হচ্ছে ড্রাই প্রসেস প্ল্যান্টের উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক দেড় হাজার মেট্রিক টন, যা আগের তুলনায় তিনগুণ। কিন্তু উৎপাদন শুরু হতে দেরি হওয়ায়—যন্ত্রাংশে জং ধরার ঝুঁকি
দক্ষ জনবল হারানোর আশঙ্কা,প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়া
ভারতীয় অনুমতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক—মূল বাধা
৫ আগস্টের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি হয়েছে উল্লেখ করে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেন—“ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ার পর রোপওয়ে অনুমতিও ঝুলে গেছে। চীনা কোম্পানির সংশ্লিষ্টতাও ভারতের অনাগ্রহের কারণ।”
ফলে রোপওয়ে না হলে চুনাপাথর আসবে না, চুনাপাথর না এলে উৎপাদনও অসম্ভব। ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যায় কারখানা—চুনাপাথর আমদানির পথ রুদ্ধ করোনা মহামারির সময় ভারত চুনাপাথর রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে ছাতক সিমেন্ট কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও কেএলএমসির নিবন্ধন নবায়ন হয়নি। অথচ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চুক্তি ছিল।
উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনে নতুন আশ্বাস—কিন্তু তারও নেই সুস্পষ্ট সময়সীমা গত শুক্রবার দুপুরে শিল্প মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
সঙ্গে ছিলেন শিল্প সচিব, বিসিআইসি চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের প্রশ্নে উপদেষ্টা স্পষ্ট করে তারিখ না জানিয়ে বলেন—“বিসিআইসি চেয়ারম্যান থেকে জানুন।”বিসিআইসি চেয়ারম্যান জানান—গ্যাস ও চুনাপাথরের জটিলতা দ্রুত সমাধান করে কারখানা চালু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ‘দ্রুত’ বলতে কতদিন—সেটার কোনো সীমা কেউই দিতে পারেননি। অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা: দ্রুত সমাধান না হলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ডুবে যাবে
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন—হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। চুনাপাথর ছাড়া এ কারখানা চালু সম্ভব নয়। ভারত যদি না দেয়—বিকল্প সোর্স দেখতে হবে। স্টেট-টু-স্টেট আলোচনায় দ্রুত সমাধান জরুরি। তিনি আরও বলেন“ভারতকে আমাদের দরকার, আমাদেরও ভারতকে দরকার। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান না হলে এ বিনিয়োগ পানিতে যাবে।”
প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব—২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিসিআইসি বলছে—
ভারতীয় অংশে রোপওয়ে নির্মাণে কমপক্ষে আরও ১ বছর লাগবে বর্ষার মৌসুমে কাজ হয় না
গ্যাসলাইন স্থাপনের অনুমতি পেয়েছেন ফলে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা অসম্ভব। এজন্য মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জনস্বার্থের প্রশ্ন: কে নেবে দায়িত্ব? হাজার কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ। দেড় বছর ধরে পড়ে থাকা আধুনিক কারখানা। জং ধরার ঝুঁকিতে যন্ত্রাংশ। বন্ধ থাকা উৎপাদনের কারণে রাজস্ব ক্ষতি। গ্যাসলাইন, রোপওয়ে—দুই প্রধান খাতেই স্থবিরতা। প্রশ্ন উঠছে—এর দায় নেবে কে?
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প এমনভাবে আটকে থাকলে উন্নয়ন হবে কীভাবে? দেশীয় খনিসম্পদ ব্যবহার না করে কেন বিদেশ নির্ভরতা? সার্বিক চিত্র
ছাতক সিমেন্ট কোম্পানার আধুনিকায়ন শুধু একটি শিল্প প্রকল্প নয়—এটি দেশের নির্মাণ খাত ও সীমান্ত এলাকার অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার কথা ছিল। কিন্তুৎআমলাতান্ত্রিক জট, আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা, প্রকৌশলগত ত্রুটি, নীতিমালা জট—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
