সালেহ আহমদ (স’লিপক): মঈন মুরসালিন—সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক প্রতিশ্রুতিশীল নাম। কবিতা, শিশুসাহিত্য ও প্রকাশনা—এই তিন ভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি সমান দক্ষতায় সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ১৯৮৪ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার মগবাজারে জন্মগ্রহণকারী এই কবি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন মননশীল ও গভীর জীবনবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক হিসেবে। তাঁর লেখনীতে সমাজ, সময় ও মানুষের নানা অনুষঙ্গ সংবেদনশীলভাবে উঠে আসে। একই সঙ্গে তিনি একজন সফল শিশুসাহিত্যিক, যিনি শিশুদের জন্য নির্মাণ করেছেন কল্পনাময় ও আনন্দঘন এক জগৎ। বহুমাত্রিক সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করে চলেছেন বাংলা সাহিত্যকে।
মঈন মুরসালিনের সাহিত্যিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সরলতা ও গভীরতার চমৎকার সমন্বয়। সাধারণ বিষয়কেও তিনি অনন্য কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করতে পারেন। প্রেম, প্রকৃতি, মানবজীবন এবং সমকালীন সমাজের নানা টানাপোড়েন তাঁর কবিতায় অনায়াসে জায়গা করে নেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে রোদের মেয়ে বৃষ্টি বোঝে না, নাকফুলে ঝুলে আছে ঋতুবতী চাঁদ এবং দুর্বোধ্য মায়ার শহর। এসব গ্রন্থে তিনি নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণে সফল হয়েছেন, যা পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে।
শিশুসাহিত্য রচনাও মঈন মুরসালিনের সাহিত্যিক জীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। শিশুদের মনোজগৎ বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। ছড়া, কবিতা ও গল্পের মাধ্যমে তিনি শিশুদের জন্য এমন এক জগৎ নির্মাণ করেন, যেখানে আনন্দ, শিক্ষা ও কল্পনা একসঙ্গে পথ চলে। তাঁর রচিত ছড়ার বাড়ি অচিনপুর, ১০০ ছড়া, ছড়া কাটে ছড়াকার বই কাটে ইঁদুরে এবং পাখির শহর পাখির বহর গ্রন্থগুলো শিশুদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গল্পগ্রন্থ পরির হাতে নীল চুড়ি-তে তিনি রূপকথার আবহে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ ও নৈতিক শিক্ষাকে চমৎকারভাবে যুক্ত করেছেন, যা শিশুদের মানবিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া তিনি দীর্ঘ দুই দশক ধরে ছোটদের পত্রিকা ‘কানামাছি’ সম্পাদনার মাধ্যমে শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। স্কুলগামী শিশুদের উপযোগী এই পত্রিকাটি শিশুদের সৃজনশীলতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি একজন প্রকাশক হিসেবেও মঈন মুরসালিনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘প্রতিভা প্রকাশ’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তুলেছেন, যেখানে নিজের বইয়ের পাশাপাশি নতুন ও প্রতিভাবান লেখকদের রচনাও প্রকাশিত হচ্ছে। একজন প্রকাশক হিসেবে তিনি সাহিত্যাঙ্গনে নতুন কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে এবং মানসম্মত বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন, যা তাঁর সাহিত্যপ্রেম ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার পরিচায়ক।
সব মিলিয়ে কবি, শিশুসাহিত্যিক ও প্রকাশক—এই তিন পরিচয়ে মঈন মুরসালিন বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর কবিতা পাঠকের হৃদয়ে সাড়া তোলে, তাঁর শিশুসাহিত্য শিশু-কিশোরদের মনে কল্পনার বীজ বপন করে এবং তাঁর প্রকাশনা নতুন লেখকদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দেয়। সৃষ্টিশীলতার এই বহুমাত্রিক প্রয়াসে তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন প্রকৃত সাহিত্যিক শুধু নিজেই সৃষ্টি করেন না, অন্যদের সৃষ্টির পথও প্রশস্ত করে দেন।
কবি মঈন মুরসালিনের জন্মদিনে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
