এক মানুষ, এক নাম—আর এখন অসীম শূন্যতা
আনোয়ার হোসেন রনি: সিলেটের সাংবাদিকতা অঙ্গন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিউজ পোর্টাল ‘প্রথম সিলেট ডটকম’-এর প্রধান সম্পাদক, এটিএন বাংলার যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি এবং বিএনপি-সমর্থিত প্রবাসী রাজনীতির পরিচিত মুখ কায়ছারুল ইসলাম সুমন আর আমাদের মাঝে নেই।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার পর বড়লেখা যাওয়ার পথে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু পরিবার, সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও শুভানুধ্যায়ীদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।
পরিচয় থেকে আস্থা—এক আত্মিক বন্ধনের গল্প
লেখকের সঙ্গে কায়ছারুল ইসলাম সুমনের পরিচয় হয় প্রায় পাঁচ বছর আগে, ২০২০ সালের দিকে। শুরুতে পেশাগত সম্পর্ক থাকলেও ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় বিশ্বাস, আস্থা ও গভীর বন্ধনে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে নির্দ্বিধায় মনের কথা বলা যেত, মতভেদ থাকলেও যিনি কখনো অসম্মান করতেন না।
লেখকের সম্পাদনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া নিউজ পোর্টাল ‘প্রথম সিলেট’ পুনরায় চালুর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সুমন। তাঁর অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় ২০২৫ সালের জুনে ‘প্রথম সিলেট ডটকম’ নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। তিনি ছিলেন পোর্টালটির প্রধান সম্পাদক। এটি ছিল শুধু একটি মাধ্যমের পুনর্জন্ম নয়, বরং নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।
রাজনীতি ও দায়িত্ববোধ
রাজনীতিতে কায়ছারুল ইসলাম সুমন ছিলেন বিএনপি-মনোভাবাপন্ন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ঘনিষ্ঠজন। গত ১৬ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের আগেই তিনি যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন। উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশের রাজনীতিকে প্রাণবন্ত করতে তাঁর ছিল দৃঢ় প্রত্যয়। সম্প্রতি তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের যুক্তরাজ্যে বিদায় জানান। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি—সেটিই হবে পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ।
শেষ দেখা—শেষ আড্ডা
পরিবারকে বিদায় দিয়ে সিলেটে ফিরে এসে গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লেখকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন করেন। রাজনীতি, গণমাধ্যম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। চোখেমুখে ছিল দায়িত্ববোধ, কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা।
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বড়লেখার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। তখনও কেউ ভাবেননি—এটাই হবে তাঁর শেষ যাত্রা।
পরদিনের দেখা—নিথর দেহের সঙ্গে
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) আবার দেখা হওয়ার কথা ছিল। দেখা হয়েছে ঠিকই—কিন্তু নির্মম বাস্তবতায়। দেখা হয়েছে তাঁর নিথর দেহের সঙ্গে। এমন আকস্মিক প্রস্থান সহকর্মীদের জন্য ছিল মেনে নেওয়ার মতো নয়।
মানবিকতার প্রতীক
যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁরা জানেন—সুমন ছিলেন সৎ, নির্লোভ, নরম মনের কিন্তু নীতিতে অটল মানুষ। সাংবাদিকতায় ছিলেন পেশাদার, ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সহজ ও আন্তরিক।
রাজনীতিতে মতভেদ থাকলেও তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও মানবিক। বিতর্ক করতেন, কিন্তু অসম্মান করতেন না। এই গুণই তাঁকে আলাদা করে তুলে ধরেছিল।
অপূরণীয় শূন্যতা
কায়ছারুল ইসলাম সুমনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত করেছে পুরো সাংবাদিক সমাজ, সিলেটবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের। লেখকের কাছে এটি ব্যক্তিগত এক অপূরণীয় ক্ষতি।
মানুষের মৃত্যু অনিবার্য, তবুও কিছু মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। সুমন ভাই ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর অনুপস্থিতি প্রতিদিন অনুভূত হবে—প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে।
তিনি ছিলেন স্বপ্নের নির্মাতা, উদ্যমের উৎস ও নীরব শক্তি। তাঁর প্রস্থান একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
শেষ প্রার্থনা
হে আল্লাহ, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন ও কর্ম আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক।
কায়ছারুল ইসলাম সুমনের শূন্যতা অপূরণীয়—কিন্তু তাঁর স্মৃতি থাকবে চিরজাগরুক।
