মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীরে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলায় এবার প্রকাশ্যেই লঙ্ঘিত হচ্ছে দেশের মৎস্য সংরক্ষণ আইন। সংরক্ষিত ও নিষিদ্ধ প্রজাতির বাঘাড় (বাঘ) মাছ নির্বিঘ্নে বিক্রি হচ্ছে কোটি টাকার পণ্য처럼—আর সব দেখেও নিশ্চুপ প্রশাসন।
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, আড়ৎদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা নির্ভয়ে বিশাল আকৃতির বাঘাড় মাছ প্রদর্শন ও বিক্রি করছেন। কোনো গোপনীয়তা নয়, কোনো ভয় নয়—বরং প্রকাশ্যেই দরদাম ও হাঁকডাক চলছে, যেন এটি কোনো নিষিদ্ধ প্রাণী নয়, বরং উৎসবের আকর্ষণ।
শেরপুর মাছের মেলার আড়ৎদার জিতু আহমদের আড়তে একটি ৮০ কেজি ওজনের বাঘাড় মাছের দাম হাঁকা হয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ী আসবার আলী প্রায় ১০০ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম হাঁকেন ৩ লাখ টাকা—যা মেলার ইতিহাসে নজিরবিহীন ও একই সঙ্গে ভয়াবহ ইঙ্গিতবাহী।
মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বাঘাড় মাছ একটি সংরক্ষিত প্রজাতি। বড় ও প্রজননক্ষম বাঘাড় ধরা ও বিক্রি আইনত অপরাধ, কারণ এই মাছ ইতোমধ্যেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় বাঘাড় ধরা মানে ভবিষ্যতের হাজারো বাঘাড় ধ্বংস করা।
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন—এই বিপুল আকারের বাঘাড় মাছ এলো কোথা থেকে? স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুশিয়ারা নদী বা আশপাশের জলাশয়ে এখন আর এ ধরনের বড় বাঘাড় প্রায় নেই। স্পষ্টতই বোঝা যায়, এসব মাছ অবৈধভাবে গভীর নদী অঞ্চল বা সীমান্তবর্তী জলাশয় থেকে ধরে আনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন,
“এই সাইজের বাঘ মাছ ধরতে হলে জাল, মৌসুম—সবকিছুই আইন ভেঙে করতে হয়। কিন্তু টাকা থাকলে আইনও নরম হয়ে যায়।”
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এত বড় অপরাধ দিনের আলোয় সংঘটিত হলেও প্রশাসনের কোনো তৎপরতা নেই। মেলায় মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। ছোট জেলেদের জালে নিষিদ্ধ মাছ ধরা পড়লে যেখানে জরিমানা ও মামলা হয়, সেখানে এই রীতিমতো উন্মুক্ত অপরাধ কীভাবে উপেক্ষিত থাকে—তা নিয়েই জনমনে ক্ষোভ ও সন্দেহ দানা বাঁধছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বাঘাড় মাছ নদীর খাদ্যচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হলে পুরো নদীর বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়বে।
এক পরিবেশ সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন,
“মেলার ঐতিহ্যের নামে যদি নিষিদ্ধ মাছের বেচাকেনা বৈধ হয়ে যায়, তাহলে অচিরেই দেশি বড় মাছ জাদুঘরের স্মৃতিতে পরিণত হবে।”
শেরপুরের মাছের মেলা একটি সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও তার আড়ালে যদি আইন ভাঙা ও পরিবেশ ধ্বংসের উন্মুক্ত প্রদর্শনী চলে, তাহলে দায় এড়াতে পারে না কেউ—প্রশাসন, ব্যবসায়ী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবার জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
