পিবিআইয়ের সহায়তায় শনাক্ত বড়লেখার রিজিয়া, ১৩ দিন পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর
আফজাল হোসেন রুমেল, বড়লেখা প্রতিনিধিঃ সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসা মানসিক ভারসাম্যহীন রিজিয়া বেগম অবশেষে ফিরে পেলেন তাঁর পরিবার। তিন সন্তান ফিরে পেল তাদের মাকে—১৩ দিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে Saudi Arabian Airlines–এর একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাঁর কাছে কোনো পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাঁকে আশকোনায় BRAC Migration Welfare Center–এ হস্তান্তর করে Civil Aviation Security (এভসেক) সদস্যরা। সেখানে ১৩ দিন ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলে।
পরবর্তীতে Police Bureau of Investigation (পিবিআই) রিজিয়ার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে। জানা যায়, তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদনগর গ্রামে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকায় পরিবার ধরেই নিয়েছিল—রিজিয়া আর বেঁচে নেই। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রিজিয়ার মেয়ে লিজা আক্তার জানান, ২০১৯ সালে গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার এটিবি ওভারসিজ লিমিটেডের সহায়তায় তাঁর মা সৌদি আরবে যান। সেখানে নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। ২০২১ সালের পর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে Bureau of Manpower Employment and Training–এ লিখিত অভিযোগ দিলেও সাড়া পাননি। সম্প্রতি ব্র্যাকের কর্মীরা বাড়িতে গিয়ে জানান—রিজিয়া দেশে ফিরেছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিজা বলেন, “নির্যাতনে মায়ের চেহারা এত বদলে গেছে যে চিনতেই পারছি না। তিনি কোনো কথাও বলছেন না।”
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, পরিচয় শনাক্তে পিবিআইয়ের সহায়তা না পেলে পরিবারকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, অপরাধী শনাক্তে কাজ করলেও বিদেশফেরত ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীদের পরিচয় শনাক্তে এই প্রথম পিবিআই সরাসরি ভূমিকা রাখল। তিনি বলেন, “যে চক্র নারীদের এমন দুর্ভোগে ফেলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অনুষ্ঠানে রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) নামে সৌদি ফেরত আরেক নারী তাঁর বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ছোটবেলায় মা-বাবা হারিয়ে এতিমখানায় বড় হওয়া রিমা দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। সেখানে কাজ দেওয়ার বদলে তাঁকে চারবার বিক্রি করা হয় এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে দেশটির পুলিশ তাঁকে আটক করে। তখন তিনি জানতে পারেন—তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বিচারের বদলে গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিরাপদ আশ্রয় ও চিকিৎসার জন্য এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ তাঁকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে।
মানব পাচারের শিকার এই নারীরা এখন শুধু নিরাপত্তা নয়—ন্যায়বিচারও চান।
