আমার সিলেট ডেস্ক: বাংলাদেশে যেকোনো অন্যায়—তা ধর্ষণ, হত্যা, চুরি, ছিনতাই, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা মাদক-সংক্রান্ত যা-ই হোক না কেন—মানুষ ক্ষোভে রাস্তায় নামে। মানববন্ধন, বিক্ষোভ আর বিচার দাবিতে সোচ্চার হওয়া একটি সচেতন সমাজের স্বাভাবিক লক্ষণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দৃশ্যমান প্রতিবাদের আড়ালে এক ভয়ানক ও অন্ধকার মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা আমাদের সমাজকে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
প্রশ্নটা সাধারণ আন্দোলনকারীদের নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—যারা এই প্রতিবাদের ফ্রন্টলাইনে থাকছেন, উসকানি দিচ্ছেন কিংবা মব তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের আসল পরিচয় কী?
আমরা যদি একটু গভীরভাবে অপরাধের নেপথ্য ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করি, তবে একটি গা শিউরে ওঠা সত্য বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, মব ভায়োলেন্স, উসকানিমূলক মিছিল বা মানববন্ধনে যারা সবচেয়ে বেশি মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসে, তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনে কোনো না কোনো অপরাধের সাথে জড়িত। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘সামাজিক ঢাল’ (Social Shield) তৈরির কৌশল। নিজের অতীত বা বর্তমান অপরাধকে আড়াল করতে এবং সমাজের চোখে নিজেকে ‘ন্যায়নিষ্ঠ বীর’ বা হিরো হিসেবে প্রমাণ করতে এরা প্রতিবাদের মঞ্চকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
অপরাধীর ‘হিরো সিনড্রোম’ ও মনস্তাত্ত্বিক ঢাল
রাজনীতি থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার সাধারণ অপরাধ—সবখানেই এই চতুর মনস্তত্ত্ব কাজ করে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে দেখা যায়, গতকাল যারা মব বা জুলুমের শিকার ছিলেন, আজ তারাই প্রতিপক্ষকে মারধর, লুটপাট কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
একই চিত্র দেখা যায় মাদকবিরোধী বা সামাজিক আন্দোলনের নামে গড়ে ওঠা মবগুলোতেও। অনেক সময় কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আগেই নিজেরা আইন হাতে তুলে নেয়, সন্দেহভাজনদের ধরে মারধর ও অপমান করে। অথচ পরবর্তীতে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই উসকানিদাতাদের অনেকেই নিজেরা মাদক কারবারের সাথে যুক্ত কিংবা নিয়মিত বখরা না পেয়ে প্রতিপক্ষকে দমনে এই ‘জনরোষ’কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় বিপদ। সাধারণ মানুষ যখন বছরের পর বছর বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখে ক্ষুব্ধ থাকে, এই চতুর অপরাধীরা সেই অবদমিত ক্ষোভ ও আবেগকে ‘জ্বালানি’ হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষ বুঝতেও পারে না যে, তারা ন্যায়বিচারের দাবিতে এসে আসলে একজন অপরাধীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এই কৃত্রিম জনপ্রিয়তার ঢাল ব্যবহার করে অপরাধীরা দুটি সুনির্দিষ্ট সুবিধা পায়:
- আইনি সুরক্ষা: প্রশাসন বা পুলিশ তাদের স্পর্শ করতে ভয় পায়, কারণ তাদের পেছনে একটা ‘জনতার নায়ক’ ভাবমূর্তি ও অন্ধ জনসমর্থন তৈরি হয়।
- অপরাধের সামাজিক বৈধতা: সমাজ মনে করে, “লোকটা হয়তো টুকটাক অন্যায় করে, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ তো করে!”
এই মনস্তত্ত্বের সুযোগ নিয়েই তারা এক সময় আরও শক্তিশালী অপরাধী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। যা বাইরে থেকে দেখতে ‘প্রতিবাদের মঞ্চ’ মনে হয়, তা আসলে ভেতরে ভেতরে একটি সুসংগঠিত অন্যায়ের কারখানা।
ভিড়ের মাঝেই আসল অপরাধী
অপরাধ তদন্তের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন বহু নজির পাওয়া যাবে, যেখানে প্রকৃত অপরাধী নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে ঘটনাস্থলে সবার আগে উপস্থিত হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে, লাশ খোঁজার দলে অংশ নিয়েছে, মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে ফাঁসি চেয়েছে, এমনকি তদন্তকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে গণমাধ্যমে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছে। পরে বৈজ্ঞানিক তদন্ত আর সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত ছিল, সেই ছিল মূল পরিকল্পনাকারী।
সাম্প্রতিক এক গৃহবধূ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও এর জ্বলন্ত প্রমাণ। দীর্ঘদিন পরিবারের আস্থাভাজন থাকা এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের পর বিচার দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন। অথচ তদন্ত শেষে জানা গেল, ঋণের চাপ থেকে বাঁচতে তিনিই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে স্বর্ণালংকার লুট করেছিলেন এবং নিজেকে বাঁচাতে প্রতিবাদের মুখোশ পরেছিলেন।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নিজের অপরাধ আড়াল করতে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া, শোকসভায় বক্তব্য দেওয়া কিংবা মব জাস্টিসে উসকানি দিয়ে প্রকৃত অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা—এসবই অপরাধীদের পুরনো কৌশল।
মুখোশের পোস্টমর্টেম জরুরি
এর অর্থ এই নয় যে, আমরা সব প্রতিবাদী মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখব। প্রতিটি আন্দোলনে প্রকৃত মানবিক ও বিবেকবান মানুষ থাকেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে ন্যায়বিচার চান। কিন্তু বিপদের জায়গাটি হলো, সাধারণ মানুষের এই পবিত্র আবেগকে পুজি করে অপরাধীরা যখন নিজেদের আখের গোছায়, তখন পুরো আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ সমাজে অপরাধীর বিচার যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি প্রতিবাদের সামনের সারিতে থাকা তথাকথিত ‘নৈতিকতার দাবিদারদের’ মুখোশ উন্মোচন করা। কারণ, প্রকাশ্য অপরাধীকে চেনা সহজ; কিন্তু নৈতিকতার মুখোশ পরে থাকা অপরাধী চেনা অসম্ভব রকম কঠিন।
একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি:
১. কোনো অবস্থাতেই মব জাস্টিস বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার উসকানিকে প্রশ্রয় না দেওয়া।
২. তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আবেগের বশে কাউকে ‘নায়ক’ বা ‘খলনায়ক’ বানিয়ে না ফেলা।
৩. প্রতিবাদের মঞ্চ যেন কোনো অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক ঢাল হতে না পারে, সে ব্যাপারে সাধারণ নাগরিকদের সচেতন থাকা।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুধু অপরাধীদের পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করে আসছি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, এখন সময় এসেছে প্রতিবাদের আড়ালে থাকা মুখোশগুলোরও পোস্টমর্টেম করার। কারা সত্যিকার অর্থে ন্যায়বিচারের জন্য রাস্তায় নামছে, আর কারা প্রতিবাদের মঞ্চকে নিজেদের অপরাধ ও স্বার্থ রক্ষার ঢাল বানাচ্ছে—এই প্রশ্নটি তোলার সময় এখনই। কারণ, সব অপরাধী অপরাধস্থল থেকে পালিয়ে যায় না; কেউ কেউ ভিড়ের মাঝেই থেকে যায়, সবচেয়ে জোরে স্লোগান দেয়, আর সেই ভিড়কে ব্যবহার করেই নিজের অন্যায়ের কারখানাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
