জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি: সিলেটের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র জাফলংসহ আশপাশের সীমান্ত বাজারগুলোতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় চোরাচালানের পণ্য। অথচ সেই পণ্য কিনে বাড়ি ফেরার পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি ও জব্দের শিকার হচ্ছেন সাধারণ পর্যটকরা। বাজারে বিক্রির সময় কোনো বাধা না থাকলেও, রাস্তায় পণ্য অবৈধ ঘোষণার এই দ্বিমুখী নীতিতে চরম ভোগান্তি, হয়রানি ও ক্ষোভের মুখে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা। এর ফলে সিলেটের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
বাজারে রমরমা বাণিজ্য, চোখে পড়ে না অভিযান
সরেজমিনে দেখা যায়, ভারতের সীমান্তবর্তী হওয়ায় জাফলং ও সংলগ্ন পর্যটন হাটগুলোর দোকানপাট ভারতীয় কম্বল, চকলেট, মসলা ও কসমেটিকস পণ্যে ভরপুর। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে এসব চোরাচালানের পণ্য বিক্রি করছেন। বাজারগুলোতে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত উপস্থিতি চোখে পড়লেও সেখানে রহস্যজনক কারণে কোনো অভিযান চালানো হয় না। ফলে পর্যটকরা সরল বিশ্বাসে এবং নিরাপদ মনে করে দোকানদারদের কাছ থেকে রসিদসহ এসব পণ্য কেনাকাটা করছেন।
মহাসড়কে চেকপোস্ট: আনন্দের সফর শেষে হয়রানি
আসল বিপত্তি ঘটে পর্যটকরা যখন কেনাকাটা শেষ করে নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্টে পর্যটকদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। স্থানীয় দোকান থেকে রসিদ দিয়ে কেনা পণ্য হলেও সেগুলোকে ‘অবৈধ ও চোরাচালানের পণ্য’ আখ্যা দিয়ে জব্দ করা হচ্ছে। অনেক সময় পর্যটকদের দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ ও নানাভাবে হয়রানি করার অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন
ভুক্তভোগী পর্যটকদের দাবি, বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়া পণ্য যদি অবৈধই হয়, তবে প্রশাসন বিক্রেতা বা মূল চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? উৎসস্থলে পণ্য বিক্রি করতে দিয়ে, ক্রেতারা বৈধ টাকা দিয়ে কেনার পর রাস্তায় তাদের আটক করা চরম বিভ্রান্তি ও অন্যায়। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, পণ্য অবৈধ হলে বিক্রয় চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় বাজারে বিক্রির অনুমতি থাকলে ক্রেতাদের হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) উসমান গনি বলেন, “বৈধ শুল্ক বা কর পরিশোধ ব্যতীত যেকোনো বিদেশী পণ্য দেশে প্রবেশ, পরিবহন বা বাজারজাত করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে আসা অবৈধ চোরাচালান পণ্য আটক ও পাচার রোধে থানা পুলিশ নিয়মিত এই অভিযান পরিচালনা করছে।”
অন্যদিকে, জাফলং টুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ তপন তালুকদার জানান, “আমরা পর্যটন এলাকায় পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা, চুরি-ছিনতাই রোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করি। অবৈধ পণ্য বা চোরাচালান আটক করার আইনি এখতিয়ার টুরিস্ট পুলিশের নেই।”
বিষয়টি নিয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, “বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকারি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়, যা জাফলং পর্যটন এলাকার ব্যবসায়ীরা তেমনটা মানছেন না। তবে আমরা বসে নেই; বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্ট বা অভিযানের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য জব্দসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
সিলেটের পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
