নিজস্ব প্রতিবেদক:ঢাকা ১০ জুলাই, ২০২৬ বিদেশি জাহাজে ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে ১৬ বছরের কিশোরী উইন্টার হাতে হাতকড়া পরিয়ে একটি চেয়ারের সাথে টানা দুই দিন দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর চলে অমানুষিক মারধর। পুলিশি অভিযান থেকে বাঁচতে তাকে এক গোপন আস্তানা থেকে অন্য আস্তানায় সরিয়ে নেয় পাচারকারীরা। এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে আসা মানব পাচারের শিকার এক ভুক্তভোগীর বাস্তব অভিজ্ঞতা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কো-আঞ্চলিক পরিচালক মন্টসে ফেরের এক বিশেষ বার্তায় জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে কম্বোডিয়ায়, চাকরির নামে মানব পাচার এবং অনলাইন স্ক্যামিং বা সাইবার অপরাধের আস্তানাগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে।
লোভনীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে ‘আধুনিক দাসত্ব’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে লোভনীয় বেতনের চাকরির অফার দেওয়া হচ্ছে। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় মানুষ যখন এই ফাঁদে পা দিয়ে কম্বোডিয়া পৌঁছায়, তখনই তাদের আসল রূপ প্রকাশ পায়।
সেখানে নিয়ে যুবকদের বিশেষ কিছু দুর্ভেদ্য ক্যাম্পে বা কম্পাউন্ডে বন্দী করে রাখা হয়। এরপর তাদের দিয়ে জোরপূর্বক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন জালিয়াতি ও সাইবার স্ক্যামের কাজ করানো হয়। কেউ এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে বা পালানোর চেষ্টা করলে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন, বৈদ্যুতিক শক ও অনাহার। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘আধুনিক দাসত্ব’ (Modern Slavery) ও ‘জোরপূর্বক শ্রম’ (Forced Labour)।
যেভাবে পাতা হচ্ছে ফাঁদ
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে জানিয়েছে, এই চক্রগুলো অত্যন্ত চতুরতার সাথে কাজ করছে। মূলত ৩টি উপায়ে তারা সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে:
১. ফেসবুক, লিংকডইন বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া ও আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন।
২. অধিক বেতনের প্রলোভন দেখানো অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালাল।
৩. পরিচিত বা কাছের মানুষের মাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সচেতনতার আহ্বান
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই সংকট থেকে বাঁচতে হলে সরকারি পর্যায়ে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যেকোনো এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার আগে সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে উক্ত এজেন্সির বৈধতা যাচাই করা উচিত।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেটে বা চেনা মহলে এ সংক্রান্ত তথ্য বেশি বেশি শেয়ার করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি, যাতে আর কোনো উইন্টাকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
