ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় যৌতুকের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা না পেয়ে লুবনা বেগম (৩১) নামে এক গৃহবধূকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানোর সময় তার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী মো. সুমন পলাতক রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গত ২৯ জুন দুপুরে উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রামে স্বামীর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত লুবনা বেগমকে প্রথমে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে অবস্থার অবনতি হলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাই সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার জয়নগর গ্রামের মৃত আলকাছ আলীর ছেলে আজাদ মিয়া (৪৩) গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাতক থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
নির্যাতনের পটভূমি ও যৌতুকের দাবি
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে বিশ্বনাথ উপজেলার জয়নগর গ্রামের লুবনা বেগমের সঙ্গে ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রামে সুন্দর আলীর ছেলে মো. সুমনের (২৮) ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আরিয়ান (৭) নামে একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই শ্বশুর সুন্দর আলী ও শাশুড়ি আনেছা বেগমের প্ররোচনায় স্বামী সুমন লুবনার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। একপর্যায়ে স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন। দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করার পর প্রায় এক বছর আগে লুবনা তার সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
পরে স্থানীয় রাজারগাঁও গ্রামের মৃত তফজ্জুল আলীর ছেলে সাজ্জাদুর রহমান (৪৫) নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে লুবনাকে আবার স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু সংসারে ফেরার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কেনার জন্য বাবার বাড়ি থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এনে দেওয়ার চাপ দেওয়া শুরু হয়। যৌতুকের টাকা আদায়ের জন্য প্রায়ই লুবনার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। বিষয়টি মধ্যস্থতাকারী সাজ্জাদুর রহমানকে জানানো হলেও তিনি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
নৃশংস হামলা ও জখমের বিবরণ
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৯ জুন দুপুরে স্বামী সুমন, শ্বশুর সুন্দর আলী ও শাশুড়ি আনেছা বেগম লুবনার কক্ষে গিয়ে পুনরায় যৌতুকের টাকা দাবি করেন। লুবনা পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা জানিয়ে টাকা এনে দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
একপর্যায়ে শ্বশুরের নির্দেশে এবং শাশুড়ির সহায়তায় স্বামী সুমন হাতে থাকা ধারালো দা দিয়ে লুবনার ওপর এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে তার দুই হাত, পা, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের কোপ লাগে।
| আক্রান্ত স্থান | আঘাতের প্রকৃতি |
|---|---|
| ডান পা | ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। |
| বাম হাত | বৃদ্ধাঙ্গুলের গোড়া এবং কনুইয়ের নিচে গভীর ক্ষত। |
| ডান হাত | হাতের পাতায় গভীর জখম। |
| অন্যান্য অংশ | বাম পায়ের হাঁটুর নিচে, পিঠের দুই পাশে, মাথা, কান ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষত। |
| লুবনার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে থেকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। |
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ও পুলিশের বক্তব্য
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই প্রধান অভিযুক্ত স্বামী সুমন আত্মগোপনে রয়েছেন। তারা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
“আমার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই।”
— আজাদ মিয়া (ভুক্তভোগী গৃহবধূর ভাই)এ বিষয়ে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো যৌতুকের দাবিতে নারী নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টার মতো ঘটনা ঘটছে। তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি যৌতুকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
