আমারসিলেট, বিশেষ সম্পাদকীয়: সমাজে সম্মাননা, পুরস্কার কিংবা স্বীকৃতির উদ্দেশ্য কেবল কাউকে ক্রেস্ট বা সনদ তুলে দেওয়া নয়; বরং যোগ্যতা, সততা, ত্যাগ ও জনকল্যাণমূলক অবদানের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে অনুসরণযোগ্য আদর্শ উপস্থাপন করা। একটি সুস্থ সমাজে সম্মাননা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে এবং যোগ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিছু অনভিজ্ঞ সংগঠন, নামমাত্র কিছু নব্য প্ল্যাটফর্ম কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভুঁইফোঁড় উদ্যোগ নিজেদের “বিশেষ সম্মাননা প্রদানকারী” প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিয়ে অবাধে ক্রেস্ট ও তথাকথিত অ্যাওয়ার্ড বিতরণ করছে। স্বাধীনতার পর থেকে টিকে থাকা দীর্ঘ ঐতিহ্যের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা কিংবা বহু সাধনার পিএইচডি ডিগ্রিধারী কোনো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বকে যদি দু-তিন বছরের কোনো নব্য ও অপেশাদার প্ল্যাটফর্ম বা কোনো স্কুলপড়ুয়া অপূর্ণাঙ্গ চেতনার ছাত্র ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ বা ‘নিরপেক্ষতার’ সার্টিফিকেট দিতে আসে—তখন তা কেবল চরম হাস্যরসই তৈরি করে না, বরং সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের দেউলিয়াত্বকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
খোলস যখন স্বীকৃতির, উদ্দেশ্য তখন ফায়দার
সমাজে এমন গুরুতর অভিযোগও রয়েছে যে, এসব সম্মাননা ও চটকদার পুরস্কারের আড়ালে এক শ্রেণীর নব্য মিডিয়া ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদীদের গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করে। কে কাকে কোন মানদণ্ডে সম্মানিত করছেন, সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া বা জুরি বোর্ডের কোনো স্বচ্ছতা বা নৈতিক ভিত্তি থাকে না। প্রকৃতপক্ষে, এই আয়োজনগুলো কোনো বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নয়; বরং এগুলো মূলত “গিভ অ্যান্ড টেক” বা পারস্পরিক আদান-প্রদানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এক সস্তা নাটক। নিজেদের নামসর্বস্ব প্ল্যাটফর্মের সস্তা ব্র্যান্ডিং করা এবং সমাজে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব জাহির করাই থাকে এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই সম্মাননা-বাণিজ্য কেবল সস্তা আত্মপ্রচারেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মঞ্চে এনে বড় বড় “অ্যাওয়ার্ড নাইট” বা জমকালো উৎসবের ফাঁদ পাতা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—নিজেদের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক লবিং, কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতার ওপর একটি সামাজিক ও আইনি বৈধতার প্রলেপ দেওয়া। সাধারণ মানুষ ও প্রতিপক্ষকে তারা পরোক্ষভাবে এই বার্তা দিতে চায় যে, “সরকার ও প্রশাসনের ওপরমহলে আমাদের হাত অনেক ওপরে”। এই ক্রেস্ট আর সেলফি সংস্কৃতির আড়ালে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মহলে চলে স্পনসরশিপের নামে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি ও অর্থনৈতিক শোষণ।
দুর্বলের ওপর আঘাত ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের হাতিয়ার
এই ধরনের সুবিধাবাদী চক্রের আরও একটি অন্ধকার দিক হলো—এরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বা সমাজসেবার খোলস পরে মূলত শক্তিশালী ও প্রভাবশালীদের দালালি করে। রাজনৈতিক বা স্থানীয় রাঘববোয়ালদের অঙ্গুলি হেলনে এরা সমাজ ও মাঠপর্যায়ের নিরীহ, দুর্বল ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও একপাক্ষিক সংবাদ বা কুৎসিত প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেনস্তা করে। আবার রাজনীতিতে যখনই কোনো অস্থিরতা বা কারো ব্যর্থতা সামনে আসে, এই অনভিজ্ঞ ও নীতিহীন লোকগুলো সেটিকে একটি “ব্যবসায়িক সুযোগ” হিসেবে লুফে নেয়। সংবাদ প্রকাশ বা সংবাদ চেপে রাখার ভয় দেখিয়ে চলে পর্দার আড়ালের আপস-সমঝোতা ও জঘন্য অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিং।
একজন মানুষকে “যোগ্য” বা “সেরা” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া কোনো ব্যক্তিগত খেয়াল, সস্তা উৎসব বা ব্যবসার বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং স্বার্থের সংঘাতমুক্ত নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত। যে প্রতিষ্ঠানের নিজেরই জবাবদিহি ও নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ, তার হাত থেকে সম্মাননা বা সার্টিফিকেট নেওয়া প্রকৃত গুণী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের জন্য এক ধরণের চরম অপমান ও আত্মমর্যাদাহানি।
যোগ্যদের নীরবতা ও জাতির ক্ষতি
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সমাজের প্রকৃত সৎ, প্রাজ্ঞ ও মেধারী মানুষের। দীর্ঘদিন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তিরা যখন দেখেন যে, একই মঞ্চে বা কখনো তাদের চেয়েও বড় সম্মাননা পাচ্ছেন নৈতিকভাবে বিতর্কিত, সুবিধাবাদী বা অর্থলিপ্সু ব্যক্তিরা, তখন তারা ধীরে ধীরে সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। কারণ তারা উপলব্ধি করেন—যেখানে অযোগ্যরাই যোগ্যতার বিচারক, সেখানে নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে নীরব থাকাই হয়তো সবচেয়ে বড় সম্মান। আর যখন জ্ঞানী ও সৎ মানুষেরা নেতৃত্বে এগিয়ে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তখন সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় কৃত্রিম নেতৃত্ব, সুবিধাবাদ ও সীমাহীন অযোগ্যতা।
প্রচার আর মর্যাদা এক জিনিস নয়। প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান যখন কাউকে সম্মাননা দেয়, তখন সেটি সাধারণত সস্তা প্রচারণানির্ভর বা সোশ্যাল মিডিয়ার ভিউ-সর্বস্ব হয় না। কিন্তু এই প্রশ্নবিদ্ধ আয়োজনগুলোতে দেখা যায়, আয়োজক ও তাদের দোসর গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম প্রচারণার সুনামি বইয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের কাছে তারা এমন ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করতে চায় যে, অতি-প্রচারই যেন গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
শেষ কথা ও আমাদের নিবেদন
오늘 সমাজকে একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি প্রকৃত যোগ্যতার মর্যাদা রক্ষা করব, নাকি এমন এক সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেব, যেখানে বিড়ালের মতো লোভী ও সুবিধাবাদী চরিত্রগুলো শুটকির নৌকার কাণ্ডারী হয়ে যোগ্যতার বিচারক সেজে বসবে?
“যে সমাজে বিচারকের আসনে অযোগ্যরা বসে, সেখানে প্রথমে অপমানিত হয় যোগ্য মানুষ; এরপর অপমানিত হয় যোগ্যতা নিজেই। আর যখন যোগ্য মানুষেরা অপমানিত হয়ে নীরব হয়ে যান, তখনই সমাজের চূড়ান্ত ধ্বংসের সূচনা হয়।”
সম্পাদকীয় নোট: পরিশেষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, এই লেখার মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিষোদগার করা নয়; বরং একটি সুস্থ, আদর্শ ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের সঠিক দিকনির্দেশনা ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এটি একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা মাত্র। এর পরেও যদি এই লেখার কোনো দৃশ্যপট বা চিত্র কারও ব্যক্তিগত চরিত্রের বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলে যায়, তবে তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সত্য ও প্রকৃত মূল্যবোধের জয় হোক।
