আমার সিলেট,আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারত বর্তমানে ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা, জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং জবাবদিহির দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party-CJP)’ নামের ছাত্র-যুব আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলনটি দিল্লিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও বর্তমানে ভারতের একাধিক রাজ্যে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে।
সবকটি রাজ্যে না হলেও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী অন্তত ৬ থেকে ৮টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই আন্দোলন উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দিল্লি (জাতীয় রাজধানী অঞ্চল), উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও বিহার। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীরেও আন্দোলনের প্রতি সংহতি ও প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুসহ আরও কয়েকটি বড় শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
যেভাবে শুরু
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বারবার প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে তারা রাজপথে নামেন।
কেন ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’?
আন্দোলনের নামকরণটি বেশ ব্যতিক্রমী। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রতিক্রিয়া থেকে এর সূচনা। এক বিচারিক মন্তব্যে আন্দোলনকারী বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা (Cockroach)’ বলে অবমাননাকরভাবে উল্লেখ করা হলে যুবসমাজ সেই শব্দটিকেই প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)’ নামে সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে এটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো
আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি।
- NTA সংস্কার ও তদন্ত: জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (NTA)-এর সংস্কার এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত।
- কঠোর আইন প্রয়োগ: Public Examinations Act কঠোরভাবে কার্যকর করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
- ক্ষতিপূরণ প্রদান: প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী এবং আত্মহত্যাকারীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।
- শিক্ষার্থী অধিকার: শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড’ গঠন ও ‘শিক্ষার্থী অধিকার সনদ’ বাস্তবায়ন করা।
- মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি: আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানো সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার।
সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তাপ
গত কয়েক দিনে আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন অভিমুখে হাজারো শিক্ষার্থীর মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে, যাতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
এ ঘটনার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী শীর্ষ নেতারা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করায় আন্দোলনটি নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।
সরকারের অবস্থান
ভারত সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।
এদিকে গতকাল রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দেন। তিনি বলেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি মারাত্মক অপরাধ। এর বিরুদ্ধে সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং শিগগিরই সংসদেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তবে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র আশ্বাসে তারা রাজপথ ছাড়বেন না; নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ ও পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে কেবল শিক্ষা ও পরীক্ষা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলন এখন ভারতের তরুণ প্রজন্মের বৃহত্তর অসন্তোষ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবির প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এক কথায় বর্তমান পরিস্থিতি: আন্দোলনটি কোনো চূড়ান্ত বা স্থায়ী মীমাংসায় পৌঁছায়নি। এটি এখন ভারতের তরুণদের বেকারত্ব ও শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়ে বেশ উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
