রেজওয়ান করিম সাব্বির,জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি:
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের একাংশে অবস্থিত লাল শাপলা বিল কচুরিপানার আগ্রাসনে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ সংগঠকরা। তারা অবিলম্বে বিলটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কচুরিপানার বিস্তার রোধসহ কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থার দাবি জানান।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল গত ২৪ জানুয়ারি শনিবার সকালে ডিবির হাওরের শাপলা বিল ও জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন দলে আরও উপস্থিত ছিলেন জার্মান প্রবাসী লেখক ও ঐতিহ্য গবেষক সাকি চৌধুরী, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও ধরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, ধরা সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী, সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট গোলাম সোবাহান চৌধুরী।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জৈন্তিয়া ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান করিম সাব্বির ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন মো. হানিফ পরিদর্শক দলকে স্থানীয় উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘তরুছায়া প্রকল্প’ সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রকল্পটির আওতায় শাপলা বিলের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ১৪ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা শাপলা বিল এলাকা পরিদর্শন শেষে সংবাদপত্রে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে পরিদর্শক দল জানান, যেভাবে কচুরিপানা বিস্তার লাভ করছে, তাতে অচিরেই বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মতবিনিময়কালে ডিবির হাওরের রাস্তার পাশে রোপণকৃত কিছু গাছ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মত প্রকাশ করা হয়।
এ সময় রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ সংরক্ষণে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয় এবং শাপলা বিলের প্রাণ–প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কচুরিপানাসহ অন্যান্য আগ্রাসী উপাদান প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি হিজল, করচ, তাল, সুপারি সহ দেশীয় প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা ডিবির হাওরের একাংশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভোরের আলোয় ফুটে ওঠা লাল শাপলা দেখতে পান। ২০১৬ সালের পর থেকে এ শাপলা বিল স্থানীয় পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে এর সৌন্দর্যের খবর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে সূর্যোদয় থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত এখানে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়, বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে পর্যটকদের জন্য এখনও কোনো স্থায়ী সুযোগ-সুবিধা গড়ে ওঠেনি।
পরিদর্শক দলের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, শাপলা বিলকে ঘিরে শুধু প্রাকৃতিক পর্যটন নয়, ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন শিল্পও বিকশিত হতে পারে। কারণ এই বিলটি জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের স্মৃতিবাহী। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৮৭ সালের দিকে রাজা বিজয় সিংহকে ডিবির হাওরের মধ্যস্থলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয় এবং ওই স্থানেই তার সমাধিসৌধ নির্মিত হয়।
পরিদর্শনকালে দুই শতাধিক বছরের পুরোনো এই সমাধিসৌধ অযত্নে পড়ে থাকতে দেখে পরিদর্শক দল গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা দ্রুত সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণের দাবি জানান। এ ছাড়া সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে রাজা বিজয় সিংহের করুণ মৃত্যু ও সংশ্লিষ্ট ইতিহাস তুলে ধরতে অচিরেই সেখানে একটি তথ্যবহুল বিলবোর্ড স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরিদর্শক দল শাপলা বিল ও আশপাশের এলাকা ময়লা-আবর্জনামুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
