দুর্নীতি–চাঁদাবাজি–অবৈধ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে তোলপাড়
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবুল কালাম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের তারাপুর চা বাগান এলাকা থেকে জালালাবাদ থানা পুলিশ তাকে আটক করে।
পুলিশ জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংক্রান্ত ০৬/২৪ নম্বর মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। জালালাবাদ থানার ওসি মোহাম্মদ তারেক গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে
ছাতক পৌরসভা গঠনের পর ১৯৯৯ সালে প্রথম নির্বাচনে চেয়ারম্যান হন আব্দুল ওয়াহিদ মজনু মিয়া। পরবর্তীতে ২০০৪, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনে টানা চারবার মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম চৌধুরী। দীর্ঘদিন পৌর এলাকায় তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রেখেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তার চাচা সুজন মিয়া চৌধুরী ছিলেন ছাতক উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। পরিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এলাকায় তাদের আধিপত্য ছিল দীর্ঘদিন।
রাজনৈতিক পটভূমি
ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা আবুল কালাম চৌধুরী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে তিনি ছাতক পৌর এলাকায় প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
পৌরসভার তহবিল, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার বাণিজ্যে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি প্রায় তিন হাজার পাতার অনিয়মের নথি সামনে আসে, যা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তদন্ত সূত্র জানায়, অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
ভুয়া রেজুলেশন তৈরি
রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ
বিজ্ঞাপন বিল ও টেন্ডারে অনিয়ম
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার
শ্রমিক সরবরাহে দুর্নীতি
এ বিষয়ে পৌর কাউন্সিলর তাপস চৌধুরীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে তারা দু’জনই পলাতক ছিলেন।
শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ছাতকের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহন বাণিজ্যে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছেন আবুল কালাম চৌধুরী ও তার পরিবার। লাফার্জ হোলসিম, সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল, ছাতক সিমেন্ট কারখানা ও আকিজ প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সরবরাহ ও ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
মেয়র থাকাকালে ‘কালাম অ্যান্ড কোং’ নামে শ্রমিক সরবরাহের ঠিকাদারি পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
মাটি কেটে কোটি টাকা আয়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেয়র থাকাকালে কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হতো। এতে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি বিপুল অর্থ উপার্জন করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসছে।
পৌর পরিষদে অসন্তোষ
পৌর কাউন্সিলরদের একাংশ অভিযোগ করেন, মেয়র কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়াই অনেক সিদ্ধান্ত নিতেন। ভুয়া রেজুলেশন, ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতা
স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র দীর্ঘদিন তার কর্মকাণ্ড আড়াল করেছিল। ফলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গ্রেপ্তারের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া
আবুল কালাম চৌধুরীর গ্রেপ্তারের খবরে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সমর্থকরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বললেও অধিকাংশ নাগরিক এটিকে দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখছেন।
দুদকের বক্তব্য
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান,
“ছাতক পৌরসভায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বহু নথি যাচাই করা হচ্ছে। এই গ্রেপ্তার তদন্তে নতুন গতি আনবে।”
পারিবারিক পরিচয়
ছাতক পৌর শহরের বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম চৌধুরী সাত ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ। তার বাবা মরহুম আরজ মিয়া চৌধুরী ছিলেন ব্যবসায়ী ও সালিশ ব্যক্তিত্ব।
তদন্ত চলমান, আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, টেন্ডার বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, ভূমি দখল ও মাটি বিক্রিসহ নানা অভিযোগে আরও কয়েকজনকে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে।
জনগণের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিচার নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে।
একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন,
“ছাতকের মানুষ বহু বছর ধরে অবিচার সহ্য করেছে। এখন অন্তত ন্যায়ের পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।”
