একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজে শাসন থাকবে, বিচার থাকবে এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন শাসনের নামে নির্যাতন, বিচারের নামে প্রতিশোধ এবং অপরাধ দমনের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কোন সমাজব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় শাসন, বিচার ও নির্যাতনের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রেই যেন অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনীতি থেকে প্রশাসন, এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আচরণেও এর নানা প্রকাশ দেখা যায়।
শাসন কি নির্যাতনের নাম?
শিশু-কিশোরদের ভুল সংশোধন, ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো এবং শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার জন্য শাসনের প্রয়োজন আছে। কিন্তু শাসনের নামে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পরিবারে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক সময় শিশুর ভুল সংশোধনের অজুহাতে তাকে মারধর, অপমান কিংবা ভয় দেখানো হয়। অথচ শাসনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সংশোধন ও শিক্ষা—ভয় সৃষ্টি করা নয়।
একজন শিশুকে ভুলের জন্য বোঝানো যেতে পারে, সতর্ক করা যেতে পারে, প্রয়োজনে নিয়মের মধ্যে আনা যেতে পারে। কিন্তু তাকে এমনভাবে আঘাত করা বা অপমান করা, যাতে তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়, তা শাসনের সীমা অতিক্রম করে নির্যাতনে পরিণত হয়।
শাসনের লক্ষ্য সংশোধন; প্রতিশোধ নয়।
বিচার কি প্রতিশোধের নাম?
বিচার হচ্ছে অপরাধ, অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে সত্য নির্ণয়ের একটি আইনসম্মত প্রক্রিয়া। সেখানে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ বিবেচনার সুযোগ থাকতে হয়।
কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক সময় আমরা বিচার ও প্রতিশোধকে এক করে ফেলি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া, তাকে অপমান করা কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করা—এসব কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
কেউ অপরাধ করেছে—এমন অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের আওতায় এনে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষ প্রমাণ করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কিংবা অপরাধের অভিযোগে কাউকে প্রকাশ্যে মারধর করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা জনতার নেই।
‘গণবিচার’ নামে আরেক অন্যায়
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো—কোনো ব্যক্তি ইভটিজিং, চুরি, ধর্ষণ কিংবা অন্য কোনো অপরাধে হাতেনাতে ধরা পড়লে অনেক সময় তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ না করে জনতা নিজেরাই শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে।
কখনো তাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়, কখনো প্রকাশ্যে অপমান করা হয়। অনেকে এটিকে ‘ন্যায়বিচার’ বলে মনে করলেও বাস্তবে এটি বিচারপ্রক্রিয়া নয়; এটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি—কেউ অপরাধী হলেও তাকে নির্যাতন করার অধিকার অন্য কারও জন্মায় না।
অপরাধের বিচার করার অধিকার আদালতের; জনতার নয়।
অপরাধ প্রমাণের আগে কাউকে শাস্তি দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অপরাধ প্রমাণিত হলেও আদালতের বাইরে তাকে শাস্তি দেওয়াও আইনের শাসনের পরিপন্থী।
কারণ আজ যে ব্যক্তিকে অপরাধী মনে করে জনতা মারধর করছে, আগামীকাল একই পদ্ধতি কোনো নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে। অভিযোগ, গুজব কিংবা ভুল পরিচয়ের ভিত্তিতেও মানুষ গণপিটুনির শিকার হতে পারে।
তাই অপরাধ দমনের নামে এমন প্রবণতা সমাজের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহার
শাসন ও বিচারব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতার ব্যবহার। রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব যদি কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি, দমন বা অন্যায়ভাবে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে সেখানে ন্যায়বিচারের মূলনীতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হচ্ছে আইন অনুযায়ী নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া। সেখানে ব্যক্তি, দল, পরিচয় বা প্রভাব যেন বিচারের মানদণ্ড হয়ে না ওঠে—এটাই প্রত্যাশা।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, প্রমাণ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা হবে এবং বিচার হবে নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে কাউকে দমন করা বা হয়রানি করা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না।
শাসন, বিচার ও নির্যাতনের সীমারেখা
শাসন, বিচার ও নির্যাতনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি।
শাসন মানুষের ভুল সংশোধন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য।
বিচার সত্য উদঘাটন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।
আইনগত শাস্তি অপরাধ প্রমাণের পর আইন অনুযায়ী প্রয়োগের জন্য।
আর নির্যাতন হলো ক্ষমতা, ক্ষোভ বা প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে কারও ওপর অন্যায়ভাবে শারীরিক বা মানসিক চাপ কিংবা সহিংসতা প্রয়োগ।
এই সীমারেখা যখন মুছে যায়, তখন শাসন নির্যাতনে এবং বিচার প্রতিশোধে পরিণত হতে পারে।
উত্তরণের পথ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই আমাদের সামাজিক ও মানসিক অবস্থানের পরিবর্তন দরকার।
অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী মনে হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করতে হবে। তদন্ত ও বিচার হবে প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায়।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাসনের নামে নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। শিশুদের সংশোধনের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পরিবর্তে শিক্ষা, বোঝানো ও ইতিবাচক শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়া যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই ন্যায়বিচারকে কার্যকর ও সময়োপযোগী করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা শুধু অপরাধের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় সেই সমাজ কতটা ন্যায়সংগত আচরণ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে—কিন্তু সেই কঠোরতা যেন আইন ও মানবিকতার সীমা অতিক্রম না করে।
শাসন মানে সংশোধন, নির্যাতন নয়।
বিচার মানে ন্যায়, প্রতিশোধ নয়।
আটক মানে আইনের কাছে সোপর্দ করা, গণপিটুনি নয়।
অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন আছে, আদালত আছে এবং রাষ্ট্রের নির্ধারিত ব্যবস্থা আছে। তাই অপরাধ দমনের নামে যদি আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিই, তাহলে একজন অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে আরেকটি অন্যায়ের জন্ম দিতে পারি।
শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে রাখতে হবে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা নয়; বরং অভিযোগকারী, অভিযুক্ত, নিরপরাধ—সবার জন্য ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে শাসন হবে মানবিক, বিচার হবে নিরপেক্ষ এবং অপরাধের প্রতিকার হবে আইনের পথেই।
মুহম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী,লেখক ও সাংবাদিক ।
