সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াছুরসহ গ্রেফতার ৪, কথিত ২০০ কোটি টাকার ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’সহ নানা সরঞ্জাম জব্দ
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: কথিত প্রাচীন কয়েন, সীমানা পিলার ও মূল্যবান ধাতব বস্তু ক্রয়-বিক্রয়ের নামে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার সাবেক ইউপি সদস্য এস.এম. ইলিয়াছুর রহমানসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ।
গ্রেফতার অন্যরা হলেন—শ্রীমঙ্গল থানার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু, প্রাচীন কয়েন ও সীমানা পিলার কেনাবেচার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করে আসছিলেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযানে তাদের কাছ থেকে কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, একটি নোহা গাড়ি, একটি পকেট রাউটার, আটটি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন নামে ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতা কথিত বিজনেস এগ্রিমেন্ট, তিনটি চেকবই, একটি কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম, একটি ডায়েরি, ১০টি সিমকার্ড, ছয়টি ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি সার্টিফিকেট জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
পুলিশ ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে পূর্বপরিচিত এস.এম. ইলিয়াছুর রহমানের মাধ্যমে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের পরিচয় হয়।
অভিযোগ রয়েছে, চাতলাপুর চা বাগানের কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে এবং এর মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি—এমন তথ্য দিয়ে আব্দুর রহিমকে প্রলোভিত করা হয়। ঢাকার একটি পক্ষ ওই বস্তু কিনতে আগ্রহী এবং মধ্যস্থতা করতে পারলে বিপুল অর্থ লাভের সুযোগ রয়েছে বলেও তাকে জানানো হয়।
প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস না করলেও পূর্বপরিচিত ইলিয়াছুর রহমানের কথায় আশ্বস্ত হয়ে আব্দুর রহিম বিষয়টি যাচাইয়ে আগ্রহী হন। পরে তাঁর আমেরিকাপ্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর চক্রের সদস্যরা কথিত ক্রেতা, বিশেষজ্ঞ ও চা-বাগানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে পুরো বিষয়টিকে একটি বৈধ ও বড় ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে উপস্থাপন করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট কথিত একজন ‘বিশেষজ্ঞ’কে সঙ্গে নিয়ে আব্দুর রহিম চাতলাপুর চা বাগানে যান। সেখানে কথিত বিশেষজ্ঞ ধাতব বস্তুটি পরীক্ষা করে সেটিকে মূল্যবান ও আসল বলে দাবি করেন। এর মাধ্যমে আব্দুর রহিম ও তাঁর মামাতো ভাইয়ের মধ্যে বস্তুটির বিষয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে কথিত লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়। বাগানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়ার জন্য ১ কোটি টাকা প্রয়োজন জানিয়ে আব্দুর রহিমের মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে মোট চারটি স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর কথিত মূল্যবান বস্তুটি ঢাকার ক্রেতা পক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা বলে আব্দুর রহিম, তাঁর মামাতো ভাই, কথিত ক্রেতা পক্ষের প্রতিনিধি এবং কথিত বিশেষজ্ঞকে চাতলাপুর চা বাগানে নেওয়া হয়।
সেখানে বস্তুটি পুনরায় পরীক্ষা করা হয় এবং কথিত বিশেষজ্ঞ সেটিকে সঠিক বলে দাবি করেন। পরে একটি বক্সে করে কথিত বস্তুটি আব্দুর রহিম ও তাঁর মামাতো ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে নগদ ২ কোটি টাকা নেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোট সাড়ে ৩ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে—এমন বিশ্বাস সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর বক্সটি তাঁদের কাছে রেখে দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা দিয়ে কথিত মূল্যবান বস্তুটি নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, বক্সটি সিলেটে নিয়ে যাওয়ার পর নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলে সেটি খুলে আব্দুর রহিম ও তাঁর মামাতো ভাই দেখতে পান, কথিত মূল্যবান বস্তুটির পরিবর্তে সেখানে একটি সাপ রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা নানা ব্যাখ্যা দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে চক্রের একজন সদস্য দাবি করেন, টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে কথিত ‘আইটেম’টি জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে এবং ২১ দিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
পরে আরও একটি মূল্যবান বস্তু পাওয়ার কথা বলে সেটি কেনাবেচার জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন বলে জানানো হয়। পূর্বের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আব্দুর রহিম আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে তাঁর ও তাঁর মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে কথিত মূল্যবান বস্তু বা দেওয়া অর্থ কোনোটিই ফেরত না পেয়ে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং কয়েকজন বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি পর্যালোচনায় কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ এবং বিপুল মুনাফার প্রলোভনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে বিশ্বাস অর্জন করে অর্থ ও স্বাক্ষরিত চেক নেওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় মামলা করা হয়।
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিরা বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের—বিশেষ করে ‘Heritage Auction’, ‘Lockheed Martin’, ‘Black Rock’, ‘Microsoft’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, ২০২৩ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছেও একই ধরনের প্রতারণার একটি মামলায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তাহের-উল-ইসলাম ওরফে আখতারুজ্জামান ওরফে মিজানুর রহমান মজনুসহ চারজন ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ সুদীপ্ত শেখর ভট্টাচার্যের দিকনির্দেশনায় এসআই আহলাদ ইবনে জামিল, পিপিএমের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে এস.এম. ইলিয়াছুর রহমান ও মো. ইকরাম মিয়াকে শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে এবং তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান ও মো. ইব্রাহিম বেপারীকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে অস্বাভাবিক ও দ্রুত বিপুল লাভের প্রলোভনে পড়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য জেলা পুলিশ, মৌলভীবাজারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
