দরূদ-সালামের মিছিলে আপত্তি, কিন্তু হুমকির মিছিলে ছাড়? বিরোধীদের দ্বিমুখী নীতির মুখোশ উন্মোচন
“আল্লাহ যাকে হেদায়েত দান করেন, তাকে বিভ্রান্ত করার কেউ নেই; আর তিনি যাকে গোমরাহ করেন, তাকে পথ দেখাবারও কেউ নেই।” — (আল-কুরআন)
পবিত্র কুরআনের এই শাশ্বত ও অমিয় বাণীকে পাথেয় করে আমাদের আজকের মূল আলোচনা। রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জগতে শুভাগমন সমগ্র সৃষ্টিজগতের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরম আনন্দের ঘটনা। কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তি, ইতিহাস ও উসুলে হাদিসের আলোকে সুমহান এই আশেকে রাসুল দর্শনের সত্যতা এবং বিরোধীদের উত্থাপিত যাবতীয় আপত্তির অকাট্য ও প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব নিচে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো:
১. উৎসের শুদ্ধতা ও আত্মিক সংবেদনশীলতা
কৃষিবিজ্ঞানের শাশ্বত নিয়ম—সুস্থ-সবল গাছ ও সঠিক বীজ ছাড়া কখনোই উৎকৃষ্ট ফলন সম্ভব নয়। মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আত্মার ক্ষেত্রেও দ্বীনি শিক্ষার শুদ্ধতা ও আত্মিক বিশুদ্ধতা অপরিহার্য। পারিবারিক ও সামাজিক শুদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ শৈশব থেকেই পরম শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার চর্চা দেখতে পায়।
পক্ষান্তরে, যার আত্মিক বিকাশে গাফিলতি কিংবা আকিদাগত মলিনতা থাকে, তার পক্ষে সর্বাংশে পবিত্র ও নিখুঁত সত্তার (রাসূলুল্লাহ ﷺ) সুউচ্চ মর্যাদা অনুধাবন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই আত্মিক বিচ্যুতি ও উপলব্ধির চরম অভাবের কারণেই একশ্রেণির মানুষ ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ-এর মতো পরম আনন্দের বিষয় অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় এবং উগ্রতায় লিপ্ত হয়।
২. এটি সাধারণ কোনো জন্মদিন নয়: সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির আবির্ভাব ও ঈমানের পরাকাষ্ঠা
ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ সাধারণ কোনো জাগতিক ব্যক্তির জন্মদিন নয়; এটি কুল কায়েনাত ও সকল সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের শুভাগমনের সুমহান দিন।
- ঈমানদার বনাম রাসুল-বিদ্বেষী: মিলাদুন্নবী বা আশেকে রাসুলদের এই আনন্দ প্রকাশ মূলত খাঁটি ঈমানদারদের আত্মিক খোরাক। যাদের অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিখাদ প্রেম লালিত হয়, কেবল তারাই এই নেয়ামতের মহান গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।
- ঈমানের পরীক্ষা: যাদের অন্তরে ঈমানের আলো বা রাসুলপ্রেম নেই, ঈদে মিলাদুন্নবী তাদের জন্য নয়। কারণ, যার অন্তরে প্রেমই নেই, সে প্রেমের মহিমান্বিত আনন্দ বুঝবে কীভাবে?
৩. মিলাদ-বিরোধীদের সাথে তর্কে না জড়ানোর প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত
বাংলা ভাষার বিখ্যাত প্রবাদ—“যারে দেখতে নারে, তার চরণ বাঁকা”। যে ব্যক্তির দৃষ্টিতেই হিংসা ও বিদ্বেষের ঠুলি পরা, সে নবীজি ﷺ-এর মর্যাদা ও নেয়ামতের হাজারো স্পষ্ট দলিল দেখলেও কখনোই সত্য গ্রহণ করবে না।
- ভালোবাসা জোর করে শেখানো যায় না: যে অন্তরে ভালোবাসা নেই, তাকে যুক্তি বা তর্ক দিয়ে জোর করে রাসুলপ্রেম শেখানো সম্ভব নয়।
- তর্ক এড়িয়ে চলা সুন্নাহ: রাসুল-বিদ্বেষী বা উগ্র বিরোধীদের সাথে অযথা তর্কে জড়িয়ে নিজের ঈমানী অনুভূতি ও মূল্যবান সময় নষ্ট না করাই একজন প্রকৃত ঈমানদারের প্রজ্ঞা। ঈমানদারগণ তাঁদের আমল, ভালোবাসা ও দরূদের চর্চা চালিয়ে যাবেন, বিদ্বেষীদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হবেন না।
৪. শিরক থেকে সুরক্ষার শাশ্বত প্রাচীর: নবীজি শ্রেষ্ঠ ‘সৃষ্টি’ ও ‘বান্দা’
পূর্ববর্তী নবীদের (যেমন হযরত ঈসা আ.) উম্মতগণ সময়ের ব্যবধানে তাঁদের নবীর অলৌকিকত্ব দেখে একপর্যায়ে তাঁকে ‘স্রষ্টা’ বা ‘আল্লাহর পুত্র’ বানিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু আখেরি নবীর উম্মতকে আল্লাহ তাআলা সেই পরম বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছেন।
- ঈদে মিলাদুন্নবীর মূল বার্তা: মিলাদুন্নবী উদযাপনের মূল ভিত্তিই হলো নবীজি ﷺ-এর ‘শুভ জন্ম’ বা মহিমান্বিত আগমনকে স্মরণ করা।
- যুক্তি: যে সত্তার শুভ জন্ম বা আগমন রয়েছে, তিনি কখনোই স্রষ্টা বা ইলাহ হতে পারেন না; তিনি আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও বিশ্বস্ত ‘আব্দ’ (বান্দা)। ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন বিশ্ববাসীকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ পরম অলৌকিক ও সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি মহান আল্লাহর পরম প্রিয় ‘সৃষ্টি’। এই অনুধাবন উম্মতকে যুগে যুগে শিরকের অতল গহ্বর থেকে নিরাপত্তা দিয়েছে।
৫. স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক জন্মদিনের শুকরিয়া ও উদযাপন (সহিহ হাদিস)
প্রিয় নবী ﷺ-এর শুভ জন্ম উপলক্ষে আনন্দ ও শুকরিয়া প্রকাশ করা কোনো অনাবিষ্কৃত বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নববী সুন্নাহ।
হযরত আবু কাতাদা আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সোমবারের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এরশাদ করেন:
ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيْهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيْهِ
(উচ্চারণ: জাকা ইয়াওমুন উলিদতু ফিহি, ওয়া ইয়াওমুন বুইছতু আও উনজিলা আলাইয়া ফিহি)
অর্থ: “এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর কুরআন নাজিল করা হয়েছে।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
আল্লাহর রাসুল ﷺ প্রতি সোমবারে রোজা রাখার মাধ্যমে নিজের জন্মদিনের শুকরিয়া ও ইবাদত স্বয়ং নিজে আদায়ে ব্রতী হতেন, যা প্রমাণ করে যে তাঁর শুভাগমনের দিনকে সম্মান জানানো এবং শুকরিয়া আদায় করা স্বয়ং নবীজির নিজস্ব আমল।
৬. আপত্তি নিরসন ১: “নবীজি সোমবারে রোজা রেখেছেন, বাৎসরিক উৎসব পালন করেননি”
বিরোধী পক্ষ প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন যে, নবীজি ﷺ ও সাহাবীগণ কেবল রোজা রেখেছেন, বাৎসরিক মিলাদুন্নবী বা আনন্দ উৎসব করেননি। এর উসুলী ও যৌক্তিক জবাব হলো:
- সুন্নাহর মূল উদ্দেশ্য বনাম মাধ্যম: শরীয়তের মূলনীতি হলো—কোনো নেক আমলের ‘মূল উদ্দেশ্য’ যদি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়, তবে সময় বা পরিবেশের প্রয়োজনে তার মাধ্যম বা কাঠামোর বিস্তার ঘটতে পারে।
- দৃষ্টান্ত: সাহাবীগণের যুগে আধুনিক মাদরাসা ছিল না, বুখারী বা মুসলিমের মতো বই আকারে হাদিস সংকলন ছিল না, কুরআনে জের-জবর বা সিপারা ভাগ ছিল না। দ্বীন সুরক্ষার স্বার্থে পরবর্তীতে আলেমগণ তা করেছেন।
- যুক্তি: রাসুলুল্লাহ ﷺ সোমবারে রোজা রেখে নিজের জন্মদিনের সম্মান ও শুকরিয়া আদায়ের মূল সুন্নাহ (মূলনীতি) আমাদের শিখিয়ে গেছেন। স্বয়ং নবীজি যেখানে নিজের জন্মদিনের মর্যাদা দিয়েছেন, সেখানে উম্মত যদি সিরাত আলোচনা, দরূদ পাঠ, জিকির ও গরিবদের খাবার বিতরণের মাধ্যমে সেই শুকরিয়াকে আরও সুসংগঠিতভাবে পালন করে—তা মূল সুন্নাহরই প্রসার।
৭. প্রচলিত ‘জন্মদিন উদযাপন’ বনাম ‘ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ’-এর পার্থক্য
সাধারণ পশ্চিমা অপসংস্কৃতির ‘জন্মদিন পালন’ (কেক কাটা বা মোমবাতি নেভানো) আর ঈদে মিলাদুন্নবীর দর্শনে আসমান-জমিন তফাৎ রয়েছে:
- তারিখের বাধ্যবাধকতা নেই: প্রচলিত জন্মদিন বছরে কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রিয় নবী ﷺ-এর মিলাদ ও সীরাত চর্চা বছরের ৩৬৫ দিনই অনুষ্ঠিত হয়—কখনো দিনে, কখনো রাতে, কখনো যেকোনো শুভ সামাজিক অনুষ্ঠানে।
- আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া: মিলাদুন্নবীতে নবীর ইবাদত করা হয় না, বরং নবীজিকে পাঠানোর কারণে সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরই অসীম দরূদ, তাসবীহ, জিকির ও শুকরিয়া আদায় করা হয়। আর এর সাথে যুক্ত থাকে দরূদ পাঠ, সীরাত আলোচনা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে দান-সদকা ও গরিবদের খানা খাওড়ানো।
৮. কাফেরের আজাব শিথিল ও মুমিনের মহা প্রতিদান
হাদিস ও সিরাতের বিখ্যাত বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শুভ জন্মের সুসংবাদ নিয়ে আসার কারণে চরম কাফের আবু লাহাব খুশিতে দাসী ‘সুওয়াইবা’-কে মুক্ত করে দিয়েছিল। সহিহ বুখারী-র ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহে এসেছে, এই সামান্য আনন্দের প্রতিদানস্বরূপ প্রতি সোমবারে জাহান্নামেও আবু লাহাবের আজাব শিথিল করা হয় এবং তার আঙুল থেকে পানীয় উপশম হিসেবে দেওয়া হয়।
তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত: একজন কুরআন দ্বারা স্বীকৃত কাফের যদি মহান নবীর জন্মের সংবাদে আনন্দিত হয়ে দাসী মুক্ত করার কারণে জাহান্নামে থেকেও এই নিয়ামত পেতে পারে, তবে যে মুমিন সারা জীবন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা বুকে ধারণ করে তাঁর জন্মদিনে আনন্দ প্রকাশ করবে, জিকির-সদকা করবে—পরকালে মহান আল্লাহ তাকে কত বড় নেয়ামত দান করবেন, তা কল্পনাতীত।
৯. আপত্তি নিরসন ২: “আবু লাহাবের ঘটনাটি ‘মুরসাল’ ও ‘স্বপ্ন’, তাই এটি প্রামাণ্য নয়”
কিছু লোক আপত্তি তোলেন যে ঘটনাটি তাবেঈর সূত্রে বর্ণিত ‘মুরসাল’ এবং হযরত আব্বাস (রা.)-এর দেখা একটি ‘স্বপ্ন’। এর হাদিস শাস্ত্রীয় (উসুলে হাদিস) অকাট্য জবাব:
- ইমাম বুখারী (র.)-এর নির্ভরযোগ্যতা: ইমাম বুখারী (র.) অহেতুক কোনো মিথ্যা বা অগ্রহণযোগ্য ঘটনা তাঁর গ্রন্থে স্থান দেননি। তিনি সহিহ বুখারী-র ‘কিতাবুন নিকাহ’-এ এই ঘটনা এনেছেন সুওয়াইবা (রা.)-এর মুক্ত হওয়া ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দুধপানের ঐতিহাসিক সত্য প্রমাণের অংশ হিসেবে।
- তাবেঈগণের গ্রহণযোগ্যতার দ্বিমুখী নীতি নিরসন: উক্ত ঘটনার বর্ণনাকারী বিখ্যাত তাবেঈ হযরত উরওয়াহ ইবনুজ জুবায়ের (র.)—যিনি হযরত আবু বকর (রা.)-এর দৌহিত্র। তাঁর অন্য সব হাদিস ও ইতিহাস যদি বিরোধীরা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেন, তবে কেবল নবীজির শুভাগমনের ফজিলত সম্পর্কিত এই তথ্যটিতে আপত্তি তোলা চরম দ্বিমুখী নীতি।
- স্বপ্নের ঐতিহাসিক মর্যাদা: ঘটনাটি দেখেছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আপন চাচা হযরত আব্বাস (রা.)। উম্মতের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণ (যেমন: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী র.) গ্রহণ করেছেন যে, আকিদার ফরজ-ওয়াজিবের জন্য নয়, বরং প্রিয় নবীর জন্মলগ্নের মহত্ত্ব ও ফজিলত প্রমাণের জন্য এই ঐতিহাসিক সত্যটি শতভাগ অকাট্য।
১০. সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও কুরআনি শুকরিয়ার নির্দেশ
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ একাধিক জায়গায় তাঁর দান করা নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় ও তা উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন:
- নিয়ামত বৃদ্ধির ওয়াদা: “যদি তোমরা শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।” (সূরা ইব্রাহিম: ৭)
- রহমত ও নিয়ামতে আনন্দ প্রকাশ: “বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে; সুতরাং এতে তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত।” (সূরা ইউনুস: ৫৮)
- নিয়ামতের প্রকাশ ও আলোচনা: “আর আপনার রবের নিয়ামতের কথা প্রকাশ/আলোচনা করুন।” (সূরা আদ-দুহা: ১১)
কুরআন অনুযায়ী উম্মতে মোহাম্মাদীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও ‘এহসান’ হলেন প্রিয় নবী ﷺ। ঈমান, কুরআন ও জান্নাতের পথ—সবই অর্জিত হয়েছে তাঁর আগমনের বরকতে। তাই এই সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত প্রাপ্তিতে আনন্দ ও শুকরিয়া প্রকাশ করা কুরআনি নির্দেশেরই বাস্তব প্রতিফলন।
১১. ‘রব্বিল আলামীন’ ও ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’: এক অপার্থিব প্রেমের বন্ধন
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজের পরিচয়ে বলেছেন رَبِّ الْعَالَمِينَ (রব্বিল আলামীন—সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক)। আর তাঁর হাবীবের পরিচয়ে বলেছেন رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ (রহমাতুল্লিল আলামীন—সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত)।
এই শব্দগত ও আত্মিক মিল প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহর রবুবিয়াত বা প্রতিপালনের পরম করুণা সৃষ্টিজগতে পৌঁছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রহমতের উসিলায়। এই শাশ্বত সম্পর্ক কেয়ামত পর্যন্ত এবং পরকালেও অবিচ্ছদ্য।
১২. বিদআতের সঠিক ফিকহি ব্যাখ্যা ও উদযাপনের ইতিহাস
ইসলামী ফিকহের প্রখ্যাত ইমামগণ (যেমন: ইমাম শাফেঈ ও ইমাম নববী র.) নতুন কোনো বিষয়কে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: বিদআতে হাসানাহ (উত্তম উদ্ভাবন যা শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়) এবং বিদআতে সাইয়্যিআহ (মন্দ বিচ্যুতি)। বর্তমানে উম্মতে মোহাম্মদীর বিরাট অংশ ঐক্যবদ্ধভাবে মিলাদুন্নবী উদযাপনে আনন্দ মিছিল করে, সেখানে উচ্চস্বরে দরূদ-সালাম, ছন্দাকারে প্রিয় নবীর শানে কাসিদা পাঠ, কুরআন তেলাওয়াত, সীরাত চর্চা ও দান-সদকার মতো নেক আমল সম্পন্ন করে। তাই এটি ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে ‘বিদআতে হাসানাহ’ বা উত্তম কাজ।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, হিজরি ৪র্থ শতকে ফাতেমী আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং পরবর্তীতে হিজরি ৭ম শতকে (৬০৪ হিজরি) এরবিলের ন্যায়পরায়ণ শাসক সুলতান মুজাফফরউদ্দীন কুকবুরী (র.)-এর আমলে বৃহৎ পরিসরে আহলে সুন্নাত অল জামাতের আলেমদের সমর্থনে ঈদে মিলাদুন্নবী ব্যাপকভাবে জনপরিসরে সুসংগঠিত হয়। এটিকে ঢালাওভাবে ‘বিদআত’ বা হারাম আখ্যা দেওয়ার ধারাটি মূলত পরবর্তীতে উদ্ভূত কিছু উগ্র ভাবধারার প্রভাবেই ছড়িয়ে পড়ে।
১৩. ব্যক্তির ভুল বনাম মূল আমলের পবিত্রতা
কোনো ইবাদত বা নেক আমলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ভুলভ্রান্তি বা অজ্ঞতাকে মূল আমলের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে ব্যবহার করা মারাত্মক অযৌক্তিক ও শরয়ী ভুল।
- বাস্তব উদাহরণ: হজ করতে গিয়ে কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে যেমন পুরো ‘হজ’ অনুষ্ঠান ভুল হয়ে যায় না, কিংবা নামাজে কেউ ভুল করলে যেমন পুরো নামাজ ব্যবস্থা দোষী হয় না—ঠিক তেমনি ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করতে গিয়ে সাধারণ কোনো মুসলিমের ব্যক্তিগত ভুল থাকলে সেটিকে প্রজ্ঞার সাথে সংশোধন করতে হবে। কিন্তু সেই ভুলের অজুহাতে প্রিয় নবী ﷺ-এর জিকির ও শুকরিয়া আদায়ের সুমহান ইবাদতকে বিদআত বা হারাম বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
১৪. জালিয়াতি, সন্ত্রাস ও চক্রান্তের ইতিহাস: ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জসহ সাম্প্রতিক বাস্তবতা
ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ-এর বিরোধীরা কীভাবে দ্বীন ও আইনের সীমা লঙ্ঘন করছে, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসমূহ। অতীতে ও বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, লাশ ফেলে দেওয়ার হুমকি, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া এবং মিলাদের মিছিলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নিরীহ নবীপ্রেমীকে কুপিয়ে হত্যা করার মতো নির্মম ও নির্লজ্জ ইতিহাস রয়েছে।
সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয় হলো—হামলাকারী ও হত্যাকারীরা তাদের অপরাধ ঢাকতে নিহত ব্যক্তিকেই নিজেদের লোক দাবি করে সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা প্রচার চালায় এবং উল্টো মিলাদপন্থীদের ওপর দায় চাপায়। এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং দ্বিগুণ জালিয়াতি ও চরম মুনাফিকি।
১৫. সুন্নাহর মানদণ্ড, মানবাধিকার ও ফৌজদারি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি হত্যা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সামিল। বিদআতের অজুহাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর হামলা, সম্পত্তি ভাঙচুর এবং পরবর্তীতে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো দেশের প্রচলিত ফৌজদারি দণ্ডবিধি, আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ আইন এবং মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
- সুন্নাহর মানদণ্ড: নবীজি ﷺ বলেছেন, “প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (সহিহ বুখারী)
- প্রতারণার শাস্তি: রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি ও চক্রান্ত করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)
১৬. বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধে আইনি ও সামাজিক দাবি
মিলাদুন্নবী ﷺ-এর অনুসারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে পরবর্তীতে ভিকটিমকেই আসাম বানানোর যে ঘৃণ্য চক্রান্ত চলছে, তা বন্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জসহ দেশের সকল স্থানে মিছিলে হামলা, ভাঙচুর, ভয়-ভীতি সৃষ্টি এবং নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত ফিতনাবাজদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- নবীপ্রেমীদের ওপর দায়ের করা চক্রান্তমূলক সকল হামলা-মামলা ও নির্লজ্জ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দ্রুত সচেতন হতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় অধিকার এবং স্বাভাবিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রের নীতিপ্রাকল্পিক ও প্রশাসনিক পর্যায়কে আরও সতর্ক হতে হবে; অন্যথায় অরাজকতা বৃদ্ধি পেয়ে দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার অপপ্রয়াস চরম আকার ধারণ করতে পারে।
পরিশেষে একটি প্রশ্ন রেখে আজকের লেখাটি শেষ করছি,ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন উপলক্ষে আনন্দ মিছিল যারা নিষিদ্ধ করে তারা দিনে ও রাতে শত জনতা একত্রিত হয়ে মিলাদুন্নবী পালন না করার জন্য প্রকাশ্য রাস্তায় শহরের অলিগলি প্রদক্ষিণ করে হুমকি প্রদান করে লাশ ফেলে দেওয়ার যে মিছিল কি করছে বা করে যাচ্ছে তাকে ঈদে মিলাদুন্নবীর মিছিলের চেয়েও পবিত্র?
না, ইসলামে নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট দলিল না থাকলেও মস্তিষ্কে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে পবিত্র এবং অপবিত্রতার পার্থক্য বোঝা মুশকিল হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের তাদের পথে পরিচালিত করুন যাদের পথে মুক্তি ও কল্যাণ ইহকাল এবং পরকালের।
