“সময়ের বিশ্বাসঘাতকতায় হতাশ হয়ো না। নখ ভোঁতা হয়ে গেলেও সিংহ সিংহই থাকে, আর নখ-দাঁত ধারালো থাকলেও কুকুর কখনো সিংহ হয় না। লোহার খাঁচায় বন্দি থাকলেও সিংহ সিংহই, আর স্বর্ণের খাঁচায় থাকলেও কুকুর কুকুরই। সিংহের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কুকুর যতই নাচুক না কেন, কুকুর কখনো তার প্রভুর চেয়ে বড় হয়ে যায়নি”
উপরের ওই লাইন গুলো মিশরের একটি প্রবাদকে কেন্দ্র করেই মূলত আজকের এই প্রবন্ধের অবতারণা।
সময়ের আবর্তে মানুষের জীবন রূপ নেয় নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতায়। কখনো অনুকূল সময় মানুষকে পৌঁছে দেয় সাফল্যের চূড়ায়, আবার কখনো প্রতিকূল পরিস্থিতি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকেও ফেলে দেয় চরম বিপাকে। কিন্তু সমসাময়িক সমাজে একটি প্রবণতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে—সময় ও সুযোগের সাময়িক সুবিধা পেয়ে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং অন্যের কঠিন সময়কে তার দুর্বলতা ভেবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
প্রকৃতির একটি চিরন্তন শিক্ষা হলো—সংকট কিংবা বন্দিদশা কোনো মানুষের প্রকৃত পরিচয় ও আত্মমর্যাদা মুছে দিতে পারে না। সিংহ যখন শিকারির লোহার খাঁচায় বন্দি হয়, কিংবা সময়ের আঘাতে তার নখ ও দাঁত ভোঁতা হয়ে আসে, তখনও তার সিংহত্ব বিলুপ্ত হয় না। তার পরিচয় শুধু শারীরিক শক্তিতে নয়, তার স্বকীয় অস্তিত্বেও। অন্যদিকে, একটি কুকুরকে দামি স্বর্ণের খাঁচায় রেখে হীরা-জহরত দিয়ে সাজানো হলেও তার প্রকৃত পরিচয় বদলে যায় না। এমনকি সে যদি কোনো সিংহের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয়ের উল্লাসে নাচতেও থাকে, তবুও সেই উল্লাস তাকে সিংহের মর্যাদায় উন্নীত করতে পারে না। প্রভুর অনুগ্রহে পাওয়া আড়ম্বর কখনো স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের বিকল্প হতে পারে না।
আজকের সমাজে বহু মানুষ স্বর্ণের খাঁচায় থাকা সেই কুকুরের মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। ক্ষমতার প্রভাব, অর্থবিত্তের সাময়িক প্রাচুর্য কিংবা কোনো সুবিধাজনক অবস্থান পেয়ে তারা ভাবতে শুরু করে, বুঝি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে গেছে। তারা ভুলে যায়, বাহ্যিক সুযোগ সব সময় নিজস্ব যোগ্যতার প্রমাণ নয়; অনেক সময় তা পরিস্থিতির সাময়িক অনুকূলতার ফল। সেই সুযোগকে পুঁজি করে আত্মমর্যাদাবান ও ত্যাগী মানুষকে ছোট করা শুধু চারিত্রিক সংকীর্ণতার পরিচয় নয়, নিজের অবস্থান ও যোগ্যতা সম্পর্কে আত্মপ্রবঞ্চনারও প্রমাণ।
অন্যের দুর্দিনে উল্লাস করা সহজ, কিন্তু সেই দুর্দিনের মধ্যেও আত্মমর্যাদা ধরে রাখা কঠিন। অন্যের পতনের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় ভাবা যায়, কিন্তু তাতে প্রকৃত উচ্চতা অর্জন করা যায় না।
অহংকার ও বাহ্যিক শ্রেষ্ঠত্বের এই মোহ কখনো স্থায়ী হয় না। সময় কারও জন্য চিরকাল অনুকূল থাকে না। আজ যে ক্ষমতার দাপটে অন্যকে তুচ্ছ করছে, আগামীকাল তাকেও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। আজ যে মানুষটি অবহেলিত, তার জীবনেও পরিবর্তন আসতে পারে। বাহ্যিক চাকচিক্য ও সাময়িক সুযোগের ওপর প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম সম্মান বাতাসে নির্মিত প্রাসাদের মতো—সময়ের সামান্য ঝাপটায় যার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
তবে অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সাফল্য অর্জন নিজে কোনো দোষ নয়। দোষ হলো, এগুলোকে অন্যকে অপমান করার অধিকার মনে করা; সুযোগকে যোগ্যতা এবং প্রভাবকে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া। প্রকৃত ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে ক্ষমতার ব্যবহারে, আর প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায় অন্যের প্রতিকূল সময়ে তার প্রতি আচরণের মধ্য দিয়ে।
অতএব, খাঁচা যত দামি হোক না কেন, তার বাহ্যিক জৌলুশ বন্দিত্বকে স্বাধীনতা কিংবা অনুগ্রহনির্ভর অবস্থানকে স্বতন্ত্র শ্রেষ্ঠত্বে রূপান্তর করতে পারে না। সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত থাকে ব্যক্তিত্বে, নীতি-নৈতিকতায় এবং কঠিনতম প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মমর্যাদা অটুট রাখার ক্ষমতায়।
সময়ের বিশ্বাসঘাতকতায় ভেঙে পড়ো না। অন্যের সাময়িক দাপট দেখে নিজের মূল্য ভুলে যেয়ো না। নিজের আত্মসম্মান ও স্বকীয়তা ধরে রাখো, কিন্তু সেই আত্মমর্যাদাকে অন্যকে হেয় করার অস্ত্র বানিয়ো না।
মনে রেখো, সিংহের পরিচয় তার খাঁচায় নয়, আর কুকুরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না সিংহের পতনে। বাহ্যিক অবস্থান সাময়িক হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রকৃত মর্যাদার বিচার হয় তার চরিত্র, নৈতিকতা ও আচরণে।
