কাজ না করেই বিলের খাতা ভারী—‘সিন্ডিকেট-ঠিকাদারের’ যোগসাজশের অভিযোগ, কর্মকর্তা বদলি নিয়েও প্রশ্ন!
আনোয়ার হোসেন রনি, জেলা প্রতিনিধি (সুনামগঞ্জ):
সড়কে সংস্কারের দৃশ্য নেই, মাঠে নেই কাঙ্ক্ষিত কাজের চিহ্ন—তবু কাগজপত্রে যেন কাজ শেষ! কোথাও মাটির কাজ হয়নি, কোথাও বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট কিংবা ওয়্যারিং কোর্সের কাজ দৃশ্যমান নয়। অথচ প্রকল্পের হিসাব, পরিমাপ ও বিল-ভাউচারে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সরকারি অর্থ ছাড়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ২৩ থেকে ৪৬ কিলোমিটার অংশের সংস্কার প্রকল্প ঘিরে এমন অভিযোগ নিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ছয় কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
কাগজে কাজ, মাঠে নেই
জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামতের জন্য ‘মেসার্স সালেহ অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের চারটি নির্দিষ্ট চেইনেজে মাটির কাজ, বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট, ওয়্যারিং কোর্সসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়কের তকিপুর এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের জাউয়াবাজার, লক্ষণসোম, খারাই ও জানধরটুপিসহ কয়েকটি এলাকায় কাজ দেখানো হলেও তার বড় অংশই বাস্তবায়ন করা হয়নি।
প্রকল্পের ৪৩ কিলোমিটার অংশে প্রায় ২৮ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মোট কাজের হিসাব করার সময় সেতুর অংশটি যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয়নি। এতে বাস্তবে কাজ সম্পন্ন না করে বা প্রকল্পের আওতাবহির্ভূত কাজের বিপরীতে সরকারি অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
সংস্কারকাজের গুণগত মান নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট মানের বিটুমিনাস মিশ্রণ তৈরিতে প্রয়োজনীয় ‘ব্যাচিং প্ল্যান্ট’ ব্যবহারের কথা থাকলেও নিম্নমানের ড্রাম মিক্স ও হট মিক্স প্ল্যান্ট ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ল্যাব টিম সাইটে গিয়ে মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করতে চাইলে তাদের বাঁধা দেওয়া হয়।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমানের আকস্মিক বদলির বিষয়। অভিযোগকারীদের মতে, প্রকল্পের অনিয়ম ও অসম্পূর্ণ কাজের বিল নিয়ে আপত্তি জানানোর পরই অল্প সময়ের ব্যবধানে তাকে সিলেট থেকে দিনাজপুর সওজ সার্কেল অফিসে বদলি করা হয়। ২০২৬ সালের ১৯ মে এই প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়। অভিযোগ উঠেছে, অনিয়ম ঢাকতে ও বিল পাসের রাস্তা পরিষ্কার করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সওজের সিলেট জোন, সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগ, ছাতক সড়ক উপবিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র পুরো প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে আমাকে রাতারাতি সিলেট থেকে দিনাজপুরে বদলি করা হয়েছে বলে মনে করি। আমি এ বিষয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলাম।”
অন্যদিকে, ছাতক সড়ক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহদাৎ হোসেন মুঠোফোনে জানান, “সংস্কার কাজ কোথায় হচ্ছে, তা আমি জানি না।” তাঁর এই বক্তব্যে প্রকল্পের তদারকি ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সিলেট সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) আবু সাইদ মো. নাজমুল হুদা এবং সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্ল্যাহর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় ও সচেতন মহলের দাবি, সড়ক সংস্কারের এই বিশাল অঙ্কের অনিয়ম উন্মোচনে নিরপেক্ষ কারিগরি ও আর্থিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। প্রতিটি চেইনেজে পুনঃপরিমাপ ও নথিপত্র যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
