নিজস্ব প্রতিবেদক, মাধবপুর (হবিগঞ্জ): হবিগঞ্জের মাধবপুরে জাতীয় গ্রিডের কনডেনসেটবাহী পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ স্থাপন করে গত দুই দিনে ৪ হাজার ২৯২ লিটার কনডেনসেট চুরি করে। চুরি করা এই তেল মাটির নিচে বিশেষভাবে তৈরি গোপন ট্যাংকে মজুদ করা হতো।
এ ঘটনায় বুধবার রাতে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) উপব্যবস্থাপক মো. জায়েদ হোসেন বাদী হয়ে মাধবপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় নোয়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও রতনপুর গ্রামের ইসলাম উদ্দিনসহ অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ ও জিটিসিএল সূত্র জানায়, গত ৪ নভেম্বর দিবাগত রাত ১টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উত্তর নোয়াপাড়া এলাকার রতনপুর ডাক্তার বাড়ি সংলগ্ন স্থানে এ চুরির ঘটনা হাতেনাতে ধরে ফেলেন জিটিসিএলের নিরাপত্তাকর্মীরা। এ সময় পাইপলাইনের আশপাশে ৫-৬ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা এগিয়ে গেলে চক্রের সদস্যরা পালানোর চেষ্টা করে। পরে নিবিড় অনুসন্ধানে পাইপলাইনে ছিদ্র করে অতিরিক্ত হোসপাইপ সংযোগের মাধ্যমে কনডেনসেট চুরির বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
জিটিসিএলের নিরাপত্তাকর্মীদের সুপারভাইজার দুলাল মিয়া জানান, ঘটনার সময় সাবেক ইউপি সদস্য ইসলাম উদ্দিন (৫০) ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিলেন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সেখানে যেতে বাধা দেন।
খবর পেয়ে মাধবপুর থানার এসআই সামসু উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তেল চুরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করে। জব্দকৃত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ছয় ইঞ্চি ব্যাসের একটি ক্ল্যাম্প, এক ইঞ্চি জিআই পাইপ ও দুটি বলভালভ। এছাড়া সাবেক ইউপি সদস্য ইসলাম উদ্দিনের বাড়ির পুকুর ও আশপাশ থেকে তেল মজুদের কাজে ব্যবহৃত দুটি বড় পানির ট্যাংক উদ্ধার করা হয়। এমনকি তাঁর বাড়িতে মাটির নিচে তেল সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি দুটি গোপন গর্ত বা ট্যাংকেরও সন্ধান পায় পুলিশ।
জিটিসিএলের আশুগঞ্জ অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক (সিকিউরিটি) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, সাবেক ইউপি সদস্য ইসলাম উদ্দিনসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিল। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জিটিসিএলের উপব্যবস্থাপক মো. জায়েদ হোসেন জানান, গত দুই দিনে পাইপলাইন থেকে ৪ হাজার ২৯২ লিটার কনডেনসেট চুরি হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২ লাখ ৭৬ হাজার ৭১২০ টাকা। ইতিমধ্যে পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হয়েছে।
উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শামীম হাসান বলেন, পাইপলাইনে ছিদ্র করে সুকৌশলে তেল বের করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হতো। এটি শুধু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং পাইপলাইনের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অভিযুক্ত ইসলাম উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার বিষয়ে মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জিটিসিএল কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। আসামিরা বর্তমানে পলাতক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আসামিরা পলাতক থাকলেও তাদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।” পুলিশি তদন্ত ও আলামত জব্দ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও এই অঞ্চলে জাতীয় গ্রিডের পাইপলাইন ছিদ্র করে অবৈধ কনডেনসেট চুরির একাধিক বিপজ্জনক ঘটনা ঘটেছে। এর আগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের শাসন এলাকার জৈতাছড়ায় ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ইংরেজি সালে একই কায়দায় তেল চুরির ঘটনা ঘটেছিল। ওই চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে জৈতা ছড়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, রহস্যজনকভাবে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়, যার সঠিক কারণ ও মূল রহস্য আজ পর্যন্ত উন্মোচিত হয়নি। মাধবপুরের এই চুরির ঘটনার পর আবারও জাতীয় গ্যাস ও তেল সঞ্চালন লাইনের নিরাপত্তা এবং অবৈধ চক্রগুলোর দৌরাত্ম্য নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
