“বোন ও ফুফুদের ফরায়েজের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়া ভাই বা ভাইপোদের দয়া নয়; বরং এটি তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব। আর নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করা কোনো বোন বা ফুফুর অপরাধ নয়—এটি আল্লাহর নির্ধারিত হক”
আমাদের সমাজে নারীদের পৈতৃক সম্পত্তি বা ফরায়েজের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এটি এখন অনেক পরিবারে এমন এক নীরব সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, যার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য নারী। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এক শ্রেণির মানুষকে দেখা যায়—যাঁরা সমাজের সর্বত্র ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে সোচ্চার থাকেন, অথচ নিজের বোন কিংবা ফুফুর প্রাপ্য উত্তরাধিকার দেওয়ার প্রশ্নে নীরব হয়ে যান। কখনো নানা অজুহাত দেখান, কখনো সামাজিক প্রথার দোহাই দেন, আবার কখনো পারিবারিক সম্পর্কের আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।
প্রশ্ন হলো, ইসলামের বিধান কি শুধু অন্যের ওপর প্রয়োগ করার জন্য? নিজের স্বার্থের বেলায় সেই বিধান উপেক্ষা করার অধিকার কে দিয়েছে?
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ৭ নম্বর আয়াতে পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নির্ধারিত অংশের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সূরার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকার বণ্টনের নিয়মও নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নারীর উত্তরাধিকার কোনো পারিবারিক অনুগ্রহ, ভাইয়ের দয়া কিংবা সামাজিক সমঝোতার বিষয় নয়; এটি আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার।
অথচ বাস্তবতা হলো, অনেক পরিবারে বোনের প্রাপ্য সম্পত্তিকে ভাইয়েরা নিজেদের সম্পদ হিসেবেই বিবেচনা করেন। বোনের নীরবতাকে সম্মতি, সম্পর্কের মায়াকে দুর্বলতা এবং অধিকার দাবি না করাকে স্থায়ী ত্যাগ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। বিষয়টি শুধু সম্পত্তির লোভ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক কুসংস্কার, মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং অজ্ঞতাপূর্ণ সামাজিক বিচারব্যবস্থা।
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এই বঞ্চনার পেছনে চারটি প্রধান কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. প্রাক-ইসলামি সংস্কৃতির অবশিষ্টাংশ ও বংশপরম্পরায় লালিত কুসংস্কার
মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করলেও তার দীর্ঘদিনের সামাজিক অভ্যাস, সংস্কার ও পারিবারিক মানসিকতা রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না। আমাদের উপমহাদেশের সমাজেও তার প্রতিফলন রয়েছে। প্রাক-ইসলামি আরব সমাজের একটি বড় অংশে নারীরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। ইসলাম এসে সেই বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে নারীর জন্য উত্তরাধিকারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
কিন্তু আমাদের সমাজের কিছু পরিবারে পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এখনো রয়ে গেছে। সেখানে মেয়েকে মনে করা হয় অন্যের বাড়ির মানুষ, আর বাবার সম্পত্তিকে বিবেচনা করা হয় শুধু ছেলেদের ভবিষ্যৎ সম্পদ হিসেবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু সামাজিক কুসংস্কার। যেমন—’বোন বাবার সম্পত্তি নিলে ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট হবে’, ‘মেয়ের সম্পত্তি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে’, কিংবা ‘মেয়েরা বাবার বাড়ির সম্পত্তি দাবি করে না’। এসব ধারণা ধর্মীয় বিধান নয়; বরং সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লালিত মনগড়া সংস্কার।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, অনেক নারীও এসব ধারণায় বিশ্বাস করে নিজের অধিকার দাবি করতে সংকোচ বোধ করেন। অথচ যে অধিকার আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করেছেন, তা গ্রহণ করাকে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হিসেবে দেখানো ধর্মীয় ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
২. নারীর নিরাপত্তাহীনতার মনস্তত্ত্ব এবং ভাই-ভাবিদের সম্পত্তির মোহ
নারীর ফরায়েজ বঞ্চনার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। অনেক বোন মনে করেন, বাবার বাড়ির সম্পত্তি দাবি করলে ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। ভবিষ্যতে স্বামী যদি ছেড়ে যায়, সংসারে অশান্তি দেখা দেয়, সন্তানরা দায়িত্ব না নেয় কিংবা জীবনে কোনো বড় বিপর্যয় আসে, তখন বাবার বাড়িই হয়তো তাঁর শেষ আশ্রয় হবে।
এই আশঙ্কা থেকেই অনেক নারী নিজের প্রাপ্য সম্পত্তি দাবি করেন না। তাঁরা মনে করেন, সম্পত্তি না নিয়ে ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেউ কেউ আবার ভাইদের সংসারের অবস্থা বিবেচনা করে স্বেচ্ছায় ছাড় দেন।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয় এক ভয়ংকর বাস্তবতা।
বোনের এই আবেগ, উদারতা কিংবা নীরবতাকে অনেক ক্ষেত্রে ভাই ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। ভাই, ভাবি ও ভাতিজারা ধীরে ধীরে ওই সম্পত্তিকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পদ বলে ভাবতে শুরু করেন। একসময় বোনের প্রাপ্য অংশের কথা তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত বা অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন ওই নারী জীবনের কোনো সংকটে পড়ে নিজের প্রাপ্য সম্পত্তির কথা বলেন। তখন অনেক ক্ষেত্রে তাঁর অতীতের ত্যাগের কথা স্মরণ না করে উল্টো তাঁকে স্বার্থপর আখ্যা দেওয়া হয়। কখনো সম্পর্কের দোহাই, কখনো পারিবারিক সম্মানের কথা, আবার কখনো নানা অজুহাতে তাঁর দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, বোন যখন নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন তাঁর আবেগকে গ্রহণ করা হয়েছিল; কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাঁর অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে এত অনীহা কেন?
এখানে মনে রাখা জরুরি, কোনো নারী স্বেচ্ছায় নিজের অধিকার ছাড়লেও তা হতে হবে প্রকৃত স্বাধীনতা, পূর্ণ সচেতনতা ও চাপমুক্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। সম্পর্ক হারানোর ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে অধিকার ছাড়তে বাধ্য করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।
৩. ধর্মীয় মোড়কে কুসংস্কার এবং স্বার্থান্বেষী ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভূমিকা
নারীর ফরায়েজ বঞ্চনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো ধর্মীয় বিধানের অপব্যাখ্যা। সমাজে এক শ্রেণির ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা ধর্মীয় পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পারিবারিক বিরোধে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন। তাঁদের কেউ কেউ প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞান ও দলিলের পরিবর্তে প্রভাবশালী পক্ষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেন।
যখন কোনো নারী তাঁর উত্তরাধিকার দাবি নিয়ে স্থানীয় আলেম, মৌলভী কিংবা ধর্মীয় সালিশদারের কাছে যান, তখন প্রত্যাশা থাকে—কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ন্যায়সংগত সমাধান পাবেন। কিন্তু কোথাও কোথাও দেখা যায়, প্রভাবশালী পরিবারের চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা আর্থিক সুবিধার কারণে শরিয়তের বিধানকে পাশ কাটিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
কখনো বলা হয়, বোনের সম্পত্তি নেওয়া উচিত নয়; কখনো পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার নামে তাঁকে নীরব থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়। আবার কোথাও তাঁর প্রাপ্য অংশের পরিবর্তে সামান্য কিছু সম্পদ দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
এ ধরনের আচরণ শুধু একজন নারীর অধিকার ক্ষুণ্ন করে না; ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে।
এখানে একটি কথা স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সব আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিকে এক কাতারে ফেলা যায় না। বহু আলেম আছেন, যাঁরা নারীর ফরায়েজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। সমালোচনা তাঁদের বিরুদ্ধে নয়; বরং তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা ধর্মের জ্ঞান, পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাবকে অন্যায়ের পক্ষে ব্যবহার করেন।
ধর্মের নামে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া ধর্মীয় দায়িত্ব পালন নয়; বরং ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে প্রতারণা।
৪. ইসলামী উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অজ্ঞ বিচারক ও পক্ষপাতদুষ্ট সালিশব্যবস্থা
আমাদের গ্রামীণ ও স্থানীয় সমাজব্যবস্থায় পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার জন্য অনেক সময় মুরব্বি, মাতবর কিংবা স্থানীয় সালিশদারদের ওপর নির্ভর করা হয়। তাঁদের সামাজিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও সবাই যে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন কিংবা প্রচলিত আইন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেন, তা নয়।
ফরায়েজের হিসাব নির্ধারণ একটি বিশেষজ্ঞ জ্ঞাননির্ভর বিষয়। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী কারা, কে কতটুকু অংশ পাবেন, কোনো উত্তরাধিকারী আগে মারা গেলে তাঁর সন্তানদের অধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয় নির্দিষ্ট বিধান ও প্রযোজ্য আইনের আলোকে বিবেচনা করতে হয়।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব না জেনেই স্থানীয় সালিশে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। সামাজিক প্রথা, পারিবারিক সম্মান কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে নারীদের বোঝানো হয় যে, তাঁরা যা পাচ্ছেন সেটুকুই গ্রহণ করা উচিত।
কখনো চাপ সৃষ্টি করে, কখনো সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় দেখিয়ে, আবার কখনো সামান্য সম্পত্তি দিয়ে আপস করিয়ে তাঁদের প্রকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
এভাবে অজ্ঞতা ও পক্ষপাত যখন বিচারব্যবস্থার জায়গা দখল করে, তখন ন্যায়বিচারের পরিবর্তে অন্যায়ই সামাজিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করে।
সালিশের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি; কোনো পক্ষের সম্পত্তি আত্মসাতের পথ সহজ করে দেওয়া নয়। ফরায়েজ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তার ব্যবস্থা করাই দায়িত্বশীল আচরণ।
এই সর্বগ্রাসী সমস্যা থেকে উত্তরণ ও মুক্তির উপায়
নারীর ফরায়েজ বঞ্চনা দূর করতে শুধু আইন থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন, ধর্মীয় সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা।
১. পিতার জীবদ্দশায় ন্যায়সংগত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও হেবা
পিতা জীবিত অবস্থায় সুস্থ মস্তিষ্কে ও স্বেচ্ছায় সন্তানদের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। তবে হেবা এবং মৃত্যুর পর ফরায়েজ বণ্টন দুটি পৃথক বিষয়। হেবা করার নামে মেয়েদের বঞ্চিত করা কিংবা সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সন্তানদের অধিকার ও প্রয়োজন বিবেচনায় ন্যায়সংগতভাবে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। আর পিতা মৃত্যুবরণ করলে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি ঋণ, বৈধ ওসিয়ত এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান বিবেচনা করে শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে।
২. পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন
কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই তাকে পরিবারের সমান মর্যাদার সদস্য হিসেবে দেখতে হবে। মেয়েকে শুধু অন্যের বাড়ির মানুষ কিংবা অন্য পরিবারের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—বোনের ফরায়েজ দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার। যে ভাই বোনের অধিকার রক্ষা করে, সে বোনের প্রতি দয়া করে না; বরং নিজের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করে।
৩. নারীর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
নারী যেন নিজের অধিকার দাবি করতে গিয়ে ভাই কিংবা বাবার বাড়ির আশ্রয় হারানোর ভয়ে অসহায় বোধ না করেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পদ ব্যবস্থাপনার জ্ঞান এবং আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসও অর্জন করেন। তবে মনে রাখতে হবে, নারী স্বাবলম্বী হোক বা পরনির্ভরশীল—ফরায়েজ পাওয়ার অধিকার তাঁর সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত।
৪. ধর্মের অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান
যাঁরা ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নারীর অধিকার হরণের পক্ষে অবস্থান নেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সচেতন ও নীতিগত অবস্থান নিতে হবে। মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ-মাহফিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর উত্তরাধিকার অধিকার সম্পর্কে সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রচার করতে হবে।
প্রকৃত আলেমদের দায়িত্ব হলো কোরআন-সুন্নাহর বিধান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা, কোনো প্রভাবশালী পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করা নয়।
৫. সচেতন আইনি সহায়তা ও সামাজিক প্রতিরোধ
নারীর উত্তরাধিকার অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সম্পত্তি আত্মসাৎ, জাল দলিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জোরপূর্বক অধিকার ত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
নারীরা যেন সহজে আইনজীবীর পরামর্শ, সরকারি আইনি সহায়তা এবং আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন, সেই সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে।
অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়, আবার অযথা সামাজিক সংঘাতও নয়—প্রয়োজন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় ও আইনসম্মত উদ্যোগ।
শেষ পরিণতি: পরকালের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে
দুনিয়ার সম্পদ, প্রভাব, ক্ষমতা কিংবা পারিবারিক কর্তৃত্ব দিয়ে হয়তো কোনো নারীকে সাময়িকভাবে তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা সম্ভব। কিন্তু মানুষের হক আত্মসাৎ করে চিরস্থায়ী মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ নেই।
ইসলামে মানুষের হক বা হক্কুল ইবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে, তাকে সেই অন্যায়ের জবাবদিহি করতে হবে। কিয়ামতের দিন সম্পদের অহংকার, পারিবারিক প্রভাব কিংবা সামাজিক পরিচয় কোনো কিছুই অন্যায়কে ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
একজন ভাই হয়তো মনে করেন, বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি নিজের কাছে রেখে তিনি লাভবান হয়েছেন। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন, যে বোনের সঙ্গে শৈশব কেটেছে, যে বোন বাবার বাড়ির মায়ায় নিজের অধিকার দাবি করেননি, সেই বোনের হক আত্মসাৎ করে তিনি পরকালের জন্য কী সঞ্চয় করছেন?
সম্পদের ভাগ নিয়ে বোনের সঙ্গে বিরোধ হতে পারে, কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান হতে হবে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। বোনের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাঁকে সম্পর্কের দোহাই দেওয়া কিংবা ধর্মের নাম ব্যবহার করে নীরব রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলাম নারীকে যে উত্তরাধিকার অধিকার দিয়েছে, তা কোনো দয়া, অনুগ্রহ কিংবা পারিবারিক উপহার নয়; এটি তাঁর প্রাপ্য অধিকার। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যেমন ধর্মীয় দায়িত্ব, তেমনি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও অপরিহার্য শর্ত।
সময় এসেছে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চাই, নাকি শুধু নিজের স্বার্থের অনুকূলে থাকা বিধানগুলোই মানতে চাই?
বোনের ফরায়েজ আত্মসাৎ করে কেউ প্রকৃত অর্থে সম্পদশালী হতে পারেন না; বরং তিনি নিজের আমলনামায় এমন এক দায় তৈরি করেন, যার জবাব একদিন তাঁকে দিতেই হবে।
“বোন ও ফুফুদের ফরায়েজের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়া ভাই বা ভাইপোদের দয়া নয়; বরং এটি তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব। আর নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করা কোনো বোন বা ফুফুর অপরাধ নয়—এটি আল্লাহর নির্ধারিত হক”
