অতীত, বর্তমান, উদ্দেশ্য ও পরিচয়ের অপব্যবহার নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। এর মূল শক্তি সত্য, নৈতিকতা, জনস্বার্থ এবং মানুষের আস্থা। একজন সাংবাদিকের কাজ সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ ও বৈষম্য তুলে ধরা; ক্ষমতাবান কিংবা প্রভাবশালীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য তথ্য অনুসন্ধান করা। কিন্তু যখন সাংবাদিকতার পরিচয়ই কারও ব্যক্তিগত ব্যবসা, স্বার্থ, প্রভাব বিস্তার কিংবা অতীতের কর্মকাণ্ড আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—সাংবাদিকতার এই পরিচয়ের পেছনে আসলে কী উদ্দেশ্য কাজ করছে?
সাংবাদিকতায় প্রবেশের অধিকার সবার আছে। কারও অতীত পেশা বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে তাঁকে চিরস্থায়ীভাবে বিচার করা যায় না। একজন মানুষ অতীতের ভুল থেকে ফিরে এসে সৎ ও দায়িত্বশীল পেশাজীবী হতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয় গ্রহণের পর তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ড, স্বার্থের সংঘাত, পেশাগত আচরণ এবং পরিচয় ব্যবহারের উদ্দেশ্যও অবশ্যই বিবেচনায় আসতে হবে।
সাংবাদিকতার পরিচয় গ্রহণ করলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। পরিচয়ের আগে তাঁর অবস্থান কী ছিল, পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কী করছেন এবং এই পরিচয় ব্যবহার করে কী অর্জন করতে চাইছেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকতায় প্রবেশের আগে কার অবস্থান কোথায় ছিল?
আমার গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে এমন কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের বিষয় সামনে এসেছে, যাঁদের কেউ কেউ সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার আগে বিভিন্ন ব্যবসা ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে পাহাড়ের গাছ কাটা ও কাঠ বিক্রি, জলমহাল নিয়ন্ত্রণ বা দখলসংক্রান্ত তৎপরতা, বিভিন্ন অনিয়মপূর্ণ ব্যবসা, বিদেশি পণ্যের বাণিজ্য, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত যানবাহন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড।
কিছু ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তির কথাও সামনে এসেছে, যাঁরা রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে একসময় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন; রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর সাংবাদিকতার পরিচয় গ্রহণ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ নিজেদের নিরপেক্ষ পরিচয়ে উপস্থাপন করছেন।
এখানে প্রশ্নটি কারও অতীত পেশা নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো নয়। প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতায় আসার পর তাঁর কর্মকাণ্ডে কী পরিবর্তন এসেছে? তিনি কি সত্যিই পেশাগত নীতি গ্রহণ করেছেন, নাকি সাংবাদিক পরিচয়কে আগের ব্যবসা ও স্বার্থ রক্ষার নতুন উপায় হিসেবে ব্যবহার করছেন?
কেউ অতীতে কাঠের ব্যবসা করেছেন বলেই তিনি অসৎ সাংবাদিক—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। একইভাবে কেউ জলমহাল, যানবাহন কিংবা অন্য কোনো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও তাঁকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু কোনো ব্যবসা যদি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং সেই ব্যবসা রক্ষায় সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করা হয়, তখন বিষয়টি অবশ্যই অনুসন্ধান ও জবাবদিহির দাবি রাখে।
সাংবাদিকতার পরিচয় কি নিরাপত্তার ঢাল?
সাংবাদিক পরিচয়ের একটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। এই সুযোগ জনস্বার্থে কাজে লাগানোই সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ এই পরিচয়কে ব্যবহার করছেন নিজেদের ব্যবসা, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা প্রভাব বিস্তারের জন্য। কোনো ব্যবসায় প্রশাসনিক নজরদারি এড়ানো, প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাপে রাখা, নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিতব্য সংবাদ বন্ধ করা কিংবা অন্যের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের কাজে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
কেউ কেউ সাংবাদিকতার পরিচয়কে এমন একটি নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে বিবেচনা করেন, যার আড়ালে তাঁদের অন্য কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ সাংবাদিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না। বরং এই পরিচয়ের সঙ্গে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
সাংবাদিকের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করেন, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নয়; বরং পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত।
প্রেসকার্ড: পেশাগত স্বীকৃতি, নাকি পরিচয় বিক্রির মাধ্যম?
সাংবাদিকতার পরিচয় নিয়ে আলোচনায় প্রেসকার্ডের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নামে পরিচয়পত্র বা প্রেসকার্ড দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব পরিচয়পত্র দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেশাগত যোগ্যতা, সংবাদ সংগ্রহের দক্ষতা, নৈতিকতা, পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড এবং সাংবাদিকতায় নিয়মিত সম্পৃক্ততা কতটা যাচাই করা হয়?
কোনো সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব পরিচয়পত্র আর সরকারের দেওয়া প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য না বুঝে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রেখে কোনো পরিচয়পত্রকে সরকারি স্বীকৃতির মতো উপস্থাপন করাও বিভ্রান্তিকর।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে পরিচয়পত্র দিয়ে থাকে। কোথাও কোথাও পরিচয়পত্র দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদৌ সংবাদ সংগ্রহ করছেন কি না, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ আছে কি না, কিংবা তিনি পরিচয়পত্রের অপব্যবহার করছেন কি না—সেসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে।
একটি সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র দেওয়ার অর্থ শুধু একটি কার্ড ছাপিয়ে দেওয়া নয়। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের নাম, পেশাগত মর্যাদা ও জনআস্থার প্রশ্ন জড়িত। তাই যাঁকে পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে, তাঁর কাজের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানকেও নিতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকের দায় কোথায়?
কোনো সংবাদমাধ্যম যদি শুধু প্রতিনিধি বাড়ানো, প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী বা লাইক বাড়ানো কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে পেশাগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, নৈতিক অবস্থান, সংবাদ সংগ্রহের সক্ষমতা এবং জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতা বিবেচনা করা জরুরি। শুধু পরিচিতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা অর্থনৈতিক লেনদেনের ভিত্তিতে কাউকে সাংবাদিকতার পরিচয় দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানও দায় এড়াতে পারে না।
পরিচয়পত্র দেওয়ার পরও দায়িত্ব শেষ হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশের নামে কাউকে হয়রানি করছেন কি না, নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে সংবাদ ব্যবহার করছেন কি না, পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রশাসনিক বা সামাজিক প্রভাব বিস্তার করছেন কি না—এসব বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও কর্তৃপক্ষের নজরদারি থাকা প্রয়োজন।
ছায়ার আড়ালে থাকা বাস্তবতা: সবকিছুর প্রমাণ কি সরকারি নথিতে থাকে?
সামাজিক ও পেশাগত জীবনের সব অনিয়ম সরকারি নথিতে পাওয়া যায় না। সব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা হয় না, সব লেনদেনের রসিদ থাকে না, সব স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ্যে আসে না। অনেক বিষয় থাকে আড়ালে—কখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগে, কখনো ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যে, কখনো প্রভাব ও সুবিধা আদান-প্রদানের নেপথ্যে।
আমার অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে এমন কিছু বিষয় সামনে এসেছে, যেগুলোর সবকিছুর প্রকাশ্য সরকারি নথি পাওয়া যায় না। কিন্তু নথি না থাকলেই কোনো ঘটনা ঘটেনি—এমন সিদ্ধান্ত যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি শুধু ব্যক্তিগত ধারণা বা শোনা কথার ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়।
অনুসন্ধানের উপাদান হতে পারে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, একাধিক স্বাধীন সূত্রের বক্তব্য, ঘটনার ধারাবাহিকতা, ছবি, ভিডিও, অডিও, লেনদেনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য কিংবা স্বীকারোক্তি। তবে প্রতিটি উপাদানের বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রাসঙ্গিকতা ও সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
কিছু কর্মকাণ্ড ছায়ার মতো আড়ালে থাকে বলেই অনুসন্ধান কঠিন। কিন্তু অনুসন্ধান কঠিন বলে প্রশ্ন তোলা বন্ধ করা যায় না। একই সঙ্গে যাচাই না করা তথ্যকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করাও যায় না।
এই লেখায় যেসব বিষয় এসেছে, সেগুলো আমার গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত প্রশ্ন ও অভিযোগ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার উদ্দেশ্য এখানে নেই। বরং এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং প্রমাণসাপেক্ষ জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও পারিবারিক গোপনীয়তাকে হাতিয়ার করার অভিযোগ
সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহারের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে সুবিধা আদায়ের অভিযোগ।
সমাজে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, পারিবারিক যৌন সহিংসতা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে কোনোটি গুরুতর অপরাধ, কোনোটি পারিবারিক নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়, আবার প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তাই প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি, সম্মতি, জবরদস্তি ও আইনি অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি এসব সংবেদনশীল বিষয়কে সংবাদ প্রকাশের দায়িত্বশীল উপকরণ হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কারও পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত দুর্বলতা কিংবা যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে সামনে এনে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা আর্থিক ও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা—এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
বিশেষ করে শিশু যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা কোনোভাবেই কৌতূহল, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের উপকরণ হতে পারে না। শিশুর পরিচয়, ছবি, ঠিকানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা যায়। ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে আরও বিপন্ন করে তোলা সাংবাদিকতার দায়িত্ব নয়।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি যথাযথভাবে যাচাই করে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিয়ে এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে প্রকাশ করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়কে চাঞ্চল্যকর ভাষায় উপস্থাপন করে কাউকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা সুবিধা আদায় করা সংবাদকর্মীর কাজ হতে পারে না।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে—কোনো সাংবাদিক যদি ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা সংবেদনশীল তথ্যকে ব্যবহার করে কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর পরিচয় কি আর জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে? নাকি সেটি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম?
সাংবাদিক পরিচয়ে দলবদ্ধ চাপ সৃষ্টি ও ভয়ভীতি
কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা অন্য কোনো পরিচয় ব্যবহার করে তিন-চারজনের দল তৈরি করে সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার অভিযোগও পাওয়া যায়। কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ব্যক্তিগত সমস্যা, জমিজমা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান করার হুমকি দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সুবিধা চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়। কিন্তু সেই প্রশ্নের আড়ালে যদি ভয়ভীতি, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কিংবা আর্থিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সেটি সাংবাদিকতা নয়; সেটি পরিচয়ের অপব্যবহার।
সাংবাদিকের কাজ দুর্বল মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া, দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাদের আরও অসহায় করে তোলা নয়।
সংবাদ প্রকাশ, সংবাদ গোপন ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব
একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশ করা নয়; জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল না করাও তাঁর নৈতিক দায়িত্ব।
কিন্তু যদি কোনো সাংবাদিক নিজের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ, ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ না করেন, তাহলে সেটিও প্রশ্নের বিষয়। আবার ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কাউকে লক্ষ্য করে একপেশে সংবাদ প্রকাশ করাও একইভাবে অনৈতিক।
কেউ প্রভাবশালীর মুখপাত্র হয়ে যান, কেউ আবার ব্যক্তিগত শত্রুতাকে সংবাদে রূপ দেন। কেউ সুবিধার বিনিময়ে কোনো বিষয় আড়াল করেন, কেউ প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেন—এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে নিজের ইচ্ছামতো কাউকে আক্রমণ করার অধিকার নয়। আর নিরপেক্ষতার অর্থ নিজের স্বার্থের জায়গায় নীরব থাকা নয়।
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিনটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি
সাংবাদিকতার পরিচয় দেওয়ার আগে এবং পরিচয় দেওয়ার পর তিনটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, অতীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কী ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? তাঁর পেশাগত ও সামাজিক অবস্থান কী ছিল? তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগ থাকলে সেগুলোর সত্যতা কী?
দ্বিতীয়ত, বর্তমানে তিনি কী করছেন? সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে জনস্বার্থে কাজ করছেন, নাকি নিজের ব্যবসা, রাজনৈতিক যোগাযোগ, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছেন?
তৃতীয়ত, তাঁর বর্তমান আচরণ ও পেশাগত প্রবণতা ভবিষ্যতে সাংবাদিকতার মর্যাদা, সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে খুঁজতে হবে। অতীতের কারণে কাউকে চিরতরে বাতিল করা যেমন অন্যায়, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয় পাওয়ার পর তাঁর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি না থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়।
সাংবাদিকতা কি পেশা, নাকি প্রভাব বিস্তারের কৌশল?
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির ব্যবসায়িক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক আশ্রয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে পারে না। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি নিজের স্বার্থ রক্ষা করেন, অন্যকে ভয় দেখান, ব্যক্তিগত তথ্যকে পুঁজি করেন কিংবা জনস্বার্থের সংবাদ আড়াল করেন, তাহলে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এখানে সব সাংবাদিককে এক কাতারে দাঁড় করানোর কোনো উদ্দেশ্য নেই। অসংখ্য সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সততা, সাহস ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের শ্রম ও ত্যাগের কারণেই সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা এখনো টিকে আছে।
কিন্তু কিছু ব্যক্তির অপকর্মের অভিযোগকে উপেক্ষা করলে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে তাঁর কাজ, বক্তব্যের চেয়ে তাঁর আচরণ এবং প্রচারের চেয়ে তাঁর পেশাগত সততাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
শেষ কথা: পরিচয় নয়, কাজই হোক সাংবাদিকতার প্রমাণ
সাংবাদিকতার পরিচয় কোনো ঢাল নয়, কোনো ব্যবসায়িক লাইসেন্স নয়, কোনো রাজনৈতিক নিরাপত্তাপত্রও নয়। এটি জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার।
যে ব্যক্তি অতীতের ভুল থেকে ফিরে এসে সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতা করতে চান, তাঁর জন্য দরজা খোলা থাকা উচিত। কিন্তু যে ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয়কে নিজের স্বার্থ, প্রভাব, ভয়ভীতি কিংবা অনিয়ম আড়াল করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন, তাঁর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবারই দায়িত্ব রয়েছে পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা, পেশাগত আচরণে নজরদারি এবং অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
কারণ সাংবাদিকতার পরিচয় কার্ডে লেখা কয়েকটি শব্দের নাম নয়। সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ, সাহস, জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতায়।
প্রশ্ন তাই একটাই—কেউ সাংবাদিক হয়েছেন মানুষের কথা বলার জন্য, নাকি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে নিজের কথাই প্রতিষ্ঠা করার জন্য?
