নয়া দিল্লি থেকে আন্তর্জাতিক ডেস্ক: উদীয়মান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে শুরু হয়েছে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ভারত মণ্ডপমে। এবারের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্য—‘Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability’, অর্থাৎ স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া।
১১ সদস্যের ব্রিকস, বাড়ছে বৈশ্বিক প্রভাব
ব্রিকস বর্তমানে ১১টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ভারত সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ জনসংখ্যা, ৪০ শতাংশ বৈশ্বিক জিডিপি এবং ২৬ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে ব্রিকস এখন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ননীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণ
সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ২০১৯ সালের পর এটিই তাঁর প্রথম ভারত সফর। নয়া দিল্লিতে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকও হয়েছে, যেখানে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী মোদি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, মহাকাশ, দক্ষ জনশক্তি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
নয়া দিল্লি ঘোষণা গৃহীত
সম্মেলনের প্রথম দিনেই সদস্য দেশগুলোর নেতারা ‘নয়া দিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করেছেন। এতে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিরোধ সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতিনিধিত্ব
এবারের সম্মেলনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। নয়া দিল্লি ঘোষণায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ব্রাজিল ও ভারতের জাতিসংঘে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার আকাঙ্ক্ষার প্রতি চীন ও রাশিয়ার সমর্থনের বিষয়টি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্রিকস ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনতে চাইছে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় জোর
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নসহ বিস্তৃত অর্থনৈতিক বিষয় আলোচনায় এসেছে। একতরফা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কনীতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও সদস্য দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয় মুদ্রায় আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও ব্রিকসের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার অংশ। তবে এ সম্মেলনের ঘোষণায় মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে কোনো একক নতুন মুদ্রা চালুর বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বিদ্যমান আর্থিক সহযোগিতা ও স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে।
ভারত-চীন সম্পর্কেও নতুন বার্তা
এবারের ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম কূটনৈতিক তাৎপর্য ভারত ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা প্রশমনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সীমান্ত বিরোধসহ দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন মতপার্থক্য এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব চীনের হাতে
ভারতের ২০২৬ সালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের পর ২০২৭ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করবে চীন। নয়া দিল্লি ঘোষণায় চীনের পরবর্তী সভাপতিত্ব এবং ১৯তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছে।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকসের গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাণিজ্যিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস এখন আর শুধু উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি অর্থনৈতিক জোট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল বিশ্বের ভূমিকা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে।
দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আরও সমন্বিত ভূমিকা নেওয়ার পাশাপাশি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে।
