আমার সিলেট: সমাজে এখন একটি অস্বস্তিকর এবং ক্রমবর্ধমান প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক ধরনের “অবিচ্ছেদ্য নিরাপত্তা বলয়” তৈরি করার চেষ্টা করছে। এই বলয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে তারা যেন সমালোচনা, জবাবদিহি কিংবা আইনের সাধারণ মানদণ্ডের ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে—এমন একটি ধারণা সমাজে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন ঘটনায় এমন অভিযোগও সামনে এসেছে যেখানে নিরীহ নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের মতো গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। যদিও প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাইসাপেক্ষ, কিন্তু ধারাবাহিক অভিযোগ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি একটি গভীর সংকেত বহন করে।
এখানে সমস্যা শুধু কিছু ব্যক্তির আচরণ নয়—সমস্যা হলো একটি মানসিক কাঠামো তৈরি হওয়া, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জবাবদিহির সংস্কৃতি দুর্বল করা হয়। যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেকে নৈতিকতার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন আইনের সমান প্রয়োগ কার্যত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
আরও একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রবণতা হলো—সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, জোরজুলুম বা আইন অমান্যের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় সংগঠন বা ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার ইঙ্গিত বহন করে। তবে এটিকে কোনো সার্বজনীন বা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, বরং একটি সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রবণতা হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ ব্যক্তিগত অপরাধ বা আচরণকে শুধুমাত্র পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
তবুও এই প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—ধর্মীয় বা আদর্শিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কি কখনো কখনো ব্যক্তিগত আচরণের নৈতিক দায়বদ্ধতাকে প্রভাবিত করছে, নাকি এটি কেবল একটি কাকতালীয় মিল?
এখানে আরও কঠিন বাস্তবতা হলো—এই ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজের একটি বড় অংশ নীরব দর্শকে পরিণত হয়। ভয়ের কারণে হোক, সামাজিক চাপের কারণে হোক কিংবা প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে হোক—ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। এই নীরবতাই অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ধর্মীয় মূল্যবোধের মূল ভিত্তি কখনোই অন্যায়, সহিংসতা বা অবিচারকে সমর্থন করে না। বরং ন্যায়, দায়িত্ব এবং মানবিকতার প্রতি কঠোর অবস্থানই ধর্মীয় নৈতিকতার মূল শিক্ষা। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে ধর্মের সমার্থক করে তোলা শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, বরং এটি সামাজিক ভারসাম্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তবে পরিচয় বা প্রভাব নয়—শুধুমাত্র আইনই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড। অন্যথায় সমাজ ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোবে, যেখানে জবাবদিহি দুর্বল হবে, আর ক্ষমতার বেষ্টনীই হবে ন্যায়বিচারের বিকল্প।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.