ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: ‘বিদেশ নয়, নিজের মাটিতেই রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা’—এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিয়ে এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার এক প্রবাসফেরত তরুণ। দীর্ঘ ১০ বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে ইউটিউব থেকে অর্জিত জ্ঞান ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে তুলেছেন এক ব্যতিক্রমধর্মী আঙুর বাগান।
উপজেলার ছৈলা আফজলাবাদ ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের প্রবাসফেরত এই সফল তরুণ উদ্যোক্তার নাম মোহাম্মদ ফারুক আহমদ। তিনি ওই গ্রামের মৃত মখলিছুর রহমানের ছেলে। ফারুকের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সফলতা ইতোমধ্যে স্থানীয় বেকার যুবক ও কৃষকদের মাঝে ব্যাপক অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে।
জমিন ঘুরে দেখা যায়, ফারুক আহমদ তার নিজ বাড়ির পাশের মাঠে কয়েক একর জায়গাজুড়ে গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিক মিশ্র ফলের বাগান ও নার্সারি। সেখানে থোকা থোকা আঙুরের পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে লেবু, মাল্টা, পেয়ারা, হলুদ, আদা, বাংলা লাউসহ বিভিন্ন জাতের ফল ও কৃষিপণ্য। পরিকল্পিত পরিচর্যা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে বাগানটি ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিন ছাতকসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী, তরুণ উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ এই আঙুর বাগান দেখতে ভিড় করছেন।
উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ফারুক আহমদ জানান, প্রবাসে থাকাকালীন অবসর সময়ে তিনি ইউটিউবে বিভিন্ন দেশের আধুনিক কৃষি ও আঙুর চাষের ভিডিও দেখতেন। সেখান থেকেই তার মনে কৃষির প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মায়। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নেন। এরপর উন্নত জাতের চারা সংগ্রহ করে প্রায় দুই বছর আগে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক আঙুর চাষ শুরু করেন।
তিনি বলেন, “অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মিষ্টি আঙুর চাষ সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা, উন্নত জাতের চারা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ মাটিতেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। আমি সেই বিশ্বাস থেকেই কাজ শুরু করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ, এখন তার সুফল পাচ্ছি।” ফারুক আহমদ আশা প্রকাশ করেন, তার বাগানের প্রতিটি গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত আঙুর উৎপাদিত হবে। ইতোমধ্যে প্রতি গাছের ফল ২২০ টাকা দরে আগাম বিক্রি শুরু হয়েছে এবং আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ব আঙুর পুরোদমে বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
বাগানের মাঠপর্যায়ের দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত স্থানীয় এক কর্মী জানান, শুরুতে আঙুর চাষ সম্পর্কে তার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে নিয়মিত কাজ করতে করতে তিনি গাছের পরিচর্যা, ছাঁটাই, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন। গাছে আঙুরের বাম্পার ফলন দেখে তারা খুবই আশাবাদী এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণদের উদ্দেশে ফারুক আহমদ বার্তা দিয়ে বলেন, “শুধু চাকরি বা বিদেশ যাওয়ার পেছনে না ছুটে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। অল্প জমি লিজ নিয়েও আধুনিক কৃষিকাজ শুরু করা যায়। পরিশ্রম, ধৈর্য, সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশেই সফল উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব।”
বাগান পরিদর্শনে এসে ছাতক উপজেলা কৃষক দলের নেতা এমাদ উদ্দিন বলেন, “ফারুক আহমদের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি শুধু আঙুর নয়, একসঙ্গে বিভিন্ন জাতের ফলের চাষ করে আধুনিক কৃষির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”
তবে সফল এই উদ্যোক্তার কিছুটা আক্ষেপও রয়েছে। ফারুক আহমদ জানান, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ খুবই সীমিত। এখনো সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা তার এই ব্যতিক্রমী বাগানটি পরিদর্শনে আসেননি। সরকারিভাবে কারিগরি সহযোগিতা ও নিয়মিত পরামর্শ পেলে এই চাষকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো।
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা বিদ্যুৎ তালুকদার জানান, উপজেলায় ইতোমধ্যে অনেক কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ করছেন। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাবনাময় এই ফলের বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে থাকবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কৃষ্ণনগরে গড়ে ওঠা এই আঙুর বাগান শুধু একটি সফল কৃষি উদ্যোগই নয়, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে বাংলাদেশের মাটিতেও যেকোনো বিদেশি ফলের সফল চাষ সম্ভব। প্রবাসফেরত ফারুকের এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থানে দারুণভাবে উৎসাহিত করবে।
