নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকটির প্রশাসন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং বিশেষ তদারকির ফলে ব্যাংকের আর্থিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
শনিবার (২০ জুন) প্রকাশিত এক সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিতে ইসলামী ব্যাংক জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ফলে ব্যাংকের লেনদেন কার্যক্রম স্বাভাবিক হচ্ছে এবং গ্রাহকরা নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি, বিশৃঙ্খলা, অপপ্রচার বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে সতর্ক করা হয়েছে।
কেন হস্তক্ষেপ করল বাংলাদেশ ব্যাংক: সম্প্রতি ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং বিভিন্ন গুজবকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এর ফলে অনেক গ্রাহক একযোগে আমানত উত্তোলনের চেষ্টা করলে ব্যাংকটি তারল্য চাপে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনের ওপর পরিচালনা পর্ষদের সকল ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এককভাবে ব্যাংকটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবেন।
কে এই মোহাম্মদ জহির হোসেন:মোহাম্মদ জহির হোসেন বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজোলিউশন ডিপার্টমেন্টের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের ব্যাংকিং খাতে সংকট ব্যবস্থাপনা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তিনি একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম, এম.কম এবং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণপদকসহ ব্যাংকিং ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন। জার্মানির Frankfurt School of Finance & Management থেকে Certified Expert in Risk Management (CERM) ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আর্থিক নীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ফাইন্যান্স বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগদানের আগে তিনি বাণিজ্যিক ব্যাংকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করে ব্যাংকিং খাতে সংকট মোকাবিলা ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরিস্থিতির উন্নতি:সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা, নগদ অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক নজরদারি জোরদারের ফলে ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে শাখা, উপশাখা, এটিএম, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে অধিকাংশ লেনদেন স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর না করে শুধুমাত্র অফিসিয়াল সূত্র থেকে তথ্য গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধও জানানো হয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ:বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, তারল্য পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব লক্ষ্য অর্জনে মোহাম্মদ জহির হোসেনের নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
