সালেহ আহমদ( স’লিপক): সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম পশ্চিমপাড়া নিবাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীর সৈনিক, ব্রিটিশ রয়েল আর্মির অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার শাহ নুর মোহাম্মদ আর নেই। সোমবার (২৬ জানুয়ারী) ভোররাত পৌনে ৪টায় বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহির রাজিউন। তাঁর বয়স হয়েছিলো ১০৬ বছর। মৃত্যুকালে তিনি ৪ পুত্র ৪ কন্যা নাতি-নাতনি সহ অসংখ্যগ্রাহী রেখে গেছেন।
মরহুমের নামাজে জানাজা ২৬ জানুয়ারী সোমবার বেলা ২টায় সিলাম পশ্চিমপাড়া বায়তুল আমান জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা নজরুল ইসলাম। নামাজে জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবি সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার বিপুল সংখ্যক মুসল্লী অংশ নেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীর সৈনিক ব্রিটিশ রয়েল আর্মির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নুর মোহাম্মদ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারী সিলাম পশ্চিমপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা (মৃত) শাহ নাহার মোহাম্মদ ও মাতা (মৃত) অছিরা বিবি। তিনি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ রয়েল সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের পাঞ্জাবের পিরোজপুর ট্রেনিং একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর ও হাবিলদার এবং পরে অনারারি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ট্রেনিং শেষে তাকে ইতালিতে বদলি করা হয়। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। জার্মানরা সে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। পরে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন।
যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ও ব্রিটেনে যাওয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু অসুস্থ মায়ের সেবা করার উদ্দেশ্যে সরকারের অনুমতি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। দেশে আসার সময় ব্রিটিশ সরকার তাকে আত্মকর্মসংস্থানের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। তারপর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ ও দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের শেষে দেশে আসেন। দেশে ফিরে আসার পর শাহ নূর মোহাম্মদ ভারতের আসামে সরকারি ট্রান্সপোর্টে সহকারী স্টোর কিপার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে দেওয়ার পর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কার্যক্রম আসাম থেকে শিলংয়ে স্থানান্তর করা হলে তিনি সেখানে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে দেশ স্বাধীন হলে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সিলেট জেলা স্বাস্থ্য সহকারী এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেটেলমেন্ট বিভাগের বেঞ্চ সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রসেস সার্ভার হিসেবে যোগদানের পর তাকে বিশ্বনাথে সার্কেল অফিসের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখান থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি সিলাম পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের মোতোয়ালি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
শাহ নূর মোহাম্মদ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সৈনিক হিসেবে ৩৯৪৫ স্টার ইতালি স্টার, ডিফেন্স মেডেল, ওয়ার মেডেল লাভ করেন। আমৃত্যু তিনি ব্রিটিশ আর্মির বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। ২০১৬ খ্রিস্টব্দের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে জালালাবাদ সেনানিবাসের ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে শাহ নূর মোহাম্মদকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। তাছাড়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও সাবের মোস্তফা তার বাড়িতে এসে তাকে শুভেচ্ছা উপহার দেন। জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
