আমার সিলেট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় নবনির্বাচিত এমপিদের ঘিরে আচমকাই বদলে গেছে এক শ্রেণির মানুষের আচরণ। নির্বাচনের আগে যারা ছিলেন দূরে, নিষ্ক্রিয় কিংবা নীরব—তাদের অনেকেই এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পাশে ভিড় করছেন যেন হঠাৎ পাওয়া এক ‘সুযোগ’ হিসেবে। পাশে গিয়ে ছবি তোলার হিড়িকও চোখে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে দেখা যাচ্ছে কৃত্রিম প্রশংসা, অভিনন্দন বার্তা ও ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শনী। রাজনৈতিক অঙ্গনে যাদের ‘স্বার্থসন্ধানী’ বলা হয়, সেই চেনা গোষ্ঠীই আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে যারা প্রকৃত শ্রম দিয়েছেন, ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গেছেন, সমর্থন আদায়ে ঘাম ঝরিয়েছেন—তাদের অনেকেই এখন আড়ালে চলে যাচ্ছেন। কারণ নির্বাচনের পরপরই স্বার্থান্বেষী একটি মহল নতুন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। ক্ষমতার গন্ধ পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠা এই গোষ্ঠী দলীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা প্রশাসনিক যোগাযোগের সূত্র ধরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ছুটে যায় নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ দৃশ্য নতুন নয়; প্রায় প্রতি নির্বাচনের পরই এমন এক ধরনের ‘নতুন আনুগত্যের ককটেল’ তৈরি হয়। যারা ভোটের সময় মাঠে ছিলেন না, বরং ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন—তাদের লক্ষ্য থাকে নির্বাচিত এমপির ঘনিষ্ঠ হয়ে ভবিষ্যৎ সুবিধা আদায় করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে নির্বাচিত এমপির প্রশংসায় পোস্ট দেওয়া, ছবি আপলোড করা এবং নিজেদের ‘ঘনিষ্ঠ’ পরিচয় তুলে ধরার ব্যস্ততায়।
এমন পরিস্থিতিতে নবনির্বাচিত এমপিদের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ দাঁড়ায়। যদি প্রকৃত শ্রমিক, ত্যাগী নেতা-কর্মী ও নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকদের উপেক্ষা করে স্বার্থসন্ধানীদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে দলীয় কাঠামো ও সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা বারবার সতর্ক করেছেন—ক্ষমতা অর্জনের পরপরই একজন রাজনীতিবিদের চারপাশে ‘স্বার্থের বলয়’ তৈরি হয়। সেখান থেকে নিজেকে ও দলকে সুরক্ষিত রাখতে হলে শুরু থেকেই সচেতন ও বাছাই করে চলা জরুরি।
নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অনেকেই নতুন এমপির কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কেউ দৌড়ে গিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, কেউ আপ্যায়নের আয়োজন করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থনের প্রদর্শন করে পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। অথচ ভোটের সময় তাদের অনেকেই মাঠে ছিলেন না।
স্থানীয় জনগণও প্রশ্ন তুলছেন—যখন প্রার্থীকে প্রয়োজন ছিল, তখন তারা কোথায় ছিলেন? ভোট চাওয়া, গণসংযোগ, কর্মী সমাবেশ কিংবা বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে তাদের দেখা যায়নি। অথচ বিজয়ের পর তারাই সবচেয়ে সক্রিয়। জনগণের ধারণা, এরা মূলত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতেই অভ্যস্ত; কে ক্ষমতায়, কে নির্বাচিত—তা বুঝেই তারা নিজেদের অবস্থান বদলায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রকৃত নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। তাই নবনির্বাচিত এমপিদের উচিত স্বার্থসন্ধানী গোষ্ঠী থেকে দূরে থাকা এবং ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা। কারণ স্বার্থবাদীরা সাময়িকভাবে পাশে থাকলেও সংকটময় সময়ে তারাই সবার আগে সরে যায়।
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের চারপাশে কারা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং কারা কেবল স্বার্থে এগিয়ে আসছে—তা অনুধাবন করার ক্ষমতাই একজন জনপ্রতিনিধির দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। তাই দেশের নবনির্বাচিত এমপিদের প্রতি আহ্বান—স্বার্থসন্ধানীদের চাতুর্য থেকে সজাগ থাকুন, দল ও জনগণের স্বার্থে কাজ করুন এবং প্রকৃত ত্যাগীদের মর্যাদা দিন।
কারণ রাজনীতির প্রকৃত শক্তি স্বার্থসন্ধানী নয়—জনগণই।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
