“কোনো সাধারণ মানুষের মাধ্যমে নয়; বরং জান্নাতের এক পবিত্র মানবের হাত ধরেই পৃথিবীতে ইসলামের শুভ সূচনা।”
মানব ইতিহাস ও ধর্মীয় বিবর্তনের আলোচনায় ইসলামকে নিয়ে বহু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, যা আজও চলমান। সম্প্রতি অনলাইনে এ প্রসঙ্গে ইসলামের ইতিহাস বিকৃত করে লেখা কিছু মানগড়া স্ট্যাটাস আমার চোখে পড়ে, যা থেকে মূলত এই লেখাটির অবতারণা। কিছু লেখক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে বা অজ্ঞতাবশত দাবি করেন যে, ইসলামের সূচনা হয়েছে মাত্র ১,৫০০ বছর আগে এবং উপমহাদেশসহ বিশ্বে ইসলামের প্রসার ঘটেছে তরবারির মাধ্যমে বা অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যার মাধ্যমে।
পরিতাপের বিষয় হলো, কখনো কখনো কিছু নামধারী মুসলিম পণ্ডিত ও চিন্তাবিদও ইতিহাসের সঠিক প্রেক্ষাপট না বুঝে এই ভুল বয়ানটি আওড়ে যান, যা ইসলামের প্রকৃত, শাশ্বত ও উজ্জ্বল ইতিহাসকে চরমভাবে মলিন ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে দেয়। তবে নিরপেক্ষ তথ্য, ইসলামী আকীদা এবং প্রামাণ্য ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—এই দাবিগুলো কেবল ভিত্তিহীনই নয়, বরং চরম ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ।১. ইসলামের সূচনা ও নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা: ১,৫০০ বছর বনাম সৃষ্টিলগ্ন
ইসলামী বিশ্বাস ও ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, ইসলাম কোনো নতুন আবিষ্কৃত ধর্ম নয়। মানব সভ্যতার প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে ইসলামের পথচলা শুরু হয়েছিল। জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগত একজন পবিত্র মানুষের মাধ্যমে যে সত্যের সূচনা, তা কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত নূহ (আঃ), হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মুসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) এবং বিভিন্ন বর্ণনামতে প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার বা ২ লক্ষ ২৪ হাজার বা তারও কমবেশি নবী-রাসূলের মাধ্যমে যুগে যুগে একই তৌহিদ বা একেশ্বরবাদের বার্তা প্রচারিত হয়েছে।
আজ থেকে প্রায় ১,৫০০ বছর আগে (৬১০ খ্রিস্টাব্দে) আখিরী নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)এর আগমন এবং কুরআন নাজিলের মাধ্যমে সেই আদি দ্বীনকে চূড়ান্ত ও পরিপূরক রূপ (Perfection of Message) দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সমাপ্ত করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়িদাহ: ৩)অতএব, ১,৫০০ বছর হলো চূড়ান্ত নবুওয়াত ও পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত প্রতিষ্ঠার সময়কাল, যা কেবল হিজরী পঞ্জিকা গণনার সুবিধার্থে ধরা হয়। হিজরী সাল গণনার সূচনা নবী করিম (ﷺ) -এর হিজরতের সময় থেকে হলেও চন্দ্র ও মাস গণনার ব্যবস্থা সৃষ্টিজগৎ তৈরির সময় থেকেই বিদ্যমান ছিল। সুতরাং, ১,৫০০ বছরের ইতিহাস গণনার অর্থ এই নয় যে ইসলামের বয়স কেবল ১,৫০০ বছর; বরং ইসলাম মানব ইতিহাসের মতোই প্রাচীন।
২. ইসলাম প্রচারে ‘তরবারি তত্ত্ব’: অপপ্রচার বনাম বৈশ্বিক বাস্তবতা
ইসলামের প্রসার তরবারির মাধ্যমে হয়েছে—এই দাবিটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বড় উপকথা বা অপপ্রচার।
ক. কুরআনের স্পষ্ট নীতি ও বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা
ইসলামি আদর্শের মূল ভিত্তি পবিত্র কুরআন। এতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনো জোর-জবরদস্তির স্থান নেই:
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)যদি জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করাই ইসলামের উদ্দেশ্য হতো, তবে ইসলামি শরিয়াহতে জোর-জবরদস্তির কোনো সুযোগ থাকত না।
খ. সামরিক অভিযানবিহীন অঞ্চলে ইসলাম
ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের যেসব অঞ্চলে আজ সবচেয়ে বেশি মুসলিম বসবাস করেন, সেখানে কোনো দিন মুসলিম সামরিক অভিযান হয়নি:
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়া, পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইতে কোনো দিন যুদ্ধ হয়নি।
- দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা: ভারতের কেরালা, শ্রীলঙ্কা ও মধ্য আফ্রিকার বিশাল অঞ্চলে ইসলাম এসেছে মূলত আরব বণিক, সুফি-সাধক এবং আলেমদের সততা, উন্নত নীতি-নৈতিকতা ও চমৎকার আচরণের মাধ্যমে।
গ. নিরপেক্ষ অমুসলিম ইতিহাসবিদদের মত
পাশ্চাত্য ও অমুসলিম নিরপেক্ষ গবেষকরাও এই ‘তরবারি তত্ত্ব’কে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। বিখ্যাত অমুসলিম ইতিহাসবিদ ডি ল্যাসি ও’লিয়ারি (De Lacy O’Leary) তার Islam at the Crossroads গ্রন্থে লিখেছেন:
“ইতিহাস পরিষ্কার করে দেয় যে, উগ্র মুসলমানদের সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরা এবং পরাজিত জাতিগুলোর ওপর তলোয়ারের মুখে ইসলাম চাপিয়ে দেওয়ার যে গল্প বলা হয়, তা ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে অদ্ভুত এবং অবাস্তব উপকথা।”একইভাবে টি. ডব্লিউ. আর্নল্ড তার The Preaching of Islam গ্রন্থে প্রামাণ্য তথ্যের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, ইসলামের প্রসারের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল এর মানবিক আবেদন ও সুফি-সাধকদের ভূমিকা, কোনো সামরিক শক্তি নয়।
৩. ভারতের মুসলিম শাসন: রাজনৈতিক ক্ষমতা বনাম ধর্মীয় সহাবস্থান
উপমহাদেশে মুসলিম শাসনকে যারা “অন্য ধর্মের ওপর আগ্রাসন” হিসেবে চিত্রায়িত করতে চান, তারা মধ্যযুগের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চেপে যেতে চান। ভারতের স্বাধীনতার জন্য আজ পর্যন্ত যারা শহীদ হয়েছেন এর বড় একটি অংশ হচ্ছে মুসলিম যদিও অনেকের স্বীকার করতে চায় না। তাছাড়া মধ্যযুগে ভারতে যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে, তার ৯৯% ছিল ক্ষমতাসীন রাজন্যবর্গের সাথে সাম্রাজ্য বিস্তার বা রাজনৈতিক ক্ষমতার যুদ্ধ, সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়।
যদি মধ্যযুগের যুদ্ধগুলো ধর্মাশ্রয়ী বা হিন্দু-মুসলিম সংঘাত হতো, তবে ইতিহাস নিম্নোক্ত বাস্তবতার উত্তর দিতে পারে না:
- সম্মিলিত বাহিনী: মুসলিম বাদশাহদের প্রধান সেনাপতি এবং বহু সৈন্য ছিলেন হিন্দু। উদাহরণস্বরূপ, মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি ছিলেন রাজপুত রাজা মান সিংহ। আবার হিন্দু রাজা রানা সঙ্গ বা মহারাজা প্রতাপের পক্ষেও বহু মুসলিম সেনাপতি ও সৈন্য যুদ্ধ করেছেন।
- মুসলিম বনাম মুসলিম যুদ্ধ: ভারতে প্রধান প্রধান যুদ্ধগুলোর সিংহভাগই হয়েছে মুসলিম শাসকের সাথে মুসলিম শাসকের। জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ভারতে এসে আক্রমণ করেছিলেন মুসলিম শাসক ইব্রাহিম লোদীকে, কোনো হিন্দু রাজাকে নয়।
- প্রজাদের নিরাপত্তা: ইসলামে যুদ্ধের সময়ও সাধারণ নাগরিক, কৃষক, নারী, শিশু এবং উপাসনালয়ে থাকা ধর্মযাজকদের হত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে। ভারতের রাজা-বাদশাহরা এই নিয়ম মানতে বাধ্য ছিলেন, কারণ সাধারণ প্রজা ছিল তাদের রাজস্ব বা করের মূল উৎস।
৪. জনসংখ্যার ইতিহাস (Demography) ও অমুসলিমদের অধিকার
যদি মুসলিম সেনাপতি বা বাদশাহরা অমুসলিমদের ঢালাওভাবে হত্যা করতেন কিংবা জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করতেন, তবে ৮০০ বছরের দীর্ঘ মুসলিম শাসনের পর ভারতীয় উপমহাদেশে একজন অমুসলিম মানুষও অবশিষ্ট থাকার কথা ছিল না।
ক. জনসংখ্যার ভৌগোলিক বিন্যাস
৮০০ বছর মুসলিম শাসনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দিল্লির আশপাশ (উত্তর ভারত)। অথচ আধুনিক ইতিহাসেও দেখা যায়, সেই উত্তর ভারতেই অমুসলিম বা হিন্দু জনগোষ্ঠী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইসলাম ভারতে প্রসার লাভ করেছে তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে নয়; বরং খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ), হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর মতো অগণিত সুফি-সাধকদের ভালোবাসা, উদারতা, নৈতিকতা এবং মানবসেবার মাধ্যমে। তৎকালীন সময়ে হিন্দু সমাজের ভেদাভেদ ও অস্পৃশ্যতার শিকার নিম্নবর্ণের মানুষ সুফিদের সান্নিধ্যে এসে শান্তির ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
খ. অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও ইসলামি বিধান
ইসলামি শাসনামলে বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের ওপর কখনোই জোর করে ইসলাম চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। তাদের ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হতো এবং ‘জিযিয়া’ করের বিনিময়ে তাদের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হতো।
ইসলাম ধর্মে কোনো অমুসলিমকে হত্যা করা তো দূরের কথা, তার ওপর জুলুম করাকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহানবী (ﷺ) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককে (জিম্মি) হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুবাসও পাবে না।” (সহীহ বুখারী)সুতরাং, ইতিহাসে যদি কোনো ব্যক্তি বা রাজা নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে কারো ওপর অত্যাচার করে থাকেন, তবে তার দায় সেই ব্যক্তির; তা কখনোই ইসলামের বিধান বা নীতি হতে পারে না। তৎকালীন যুগে যেসব যুদ্ধ হয়েছিল, তা পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের অত্যাচারী শাসন এবং সামরিক আক্রমণ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে—কাউকে জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন করানোর জন্য নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাসকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিকৃত করে ইসলামকে একটি উগ্র বা হিংসাত্মক ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। মানবাভিযাত্রার সূচনালগ্ন থেকে শুরু হওয়া এই সত্যের বার্তা ১,৫০০ বছর আগে পূর্ণতা লাভ করেছে মাত্র। ভারতবর্ষসহ সমগ্র বিশ্বের ইতিহাস সাক্ষী দেয়, সামাজিক মেলবন্ধন ও সম্প্রীতি গড়ে উঠেছিল মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থান এবং ইসলামের সাম্য ও মানবিক আবেদনের মাধ্যমে।
অতএব, ঐতিহাসিক সত্য অনুধাবন না করে যারা অজ্ঞতাবশত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘তরবারির মাধ্যমে ইসলাম প্রচার’-এর কথা বলেন, তারা মূলত ইসলামের মহান ও ভাস্বর ইতিহাসকেই বিকৃত করেন। উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিকৃত ইতিহাস থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করাই আধুনিক ও বিবেকবান মানুষের মূল দায়িত্ব।
Subscribe to Updates
Get the latest creative news from FooBar about art, design and business.
